কারাগারে সত্য, বন্দি বিবেক : আনিস আলমগীর ও বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক কঠিন আত্মজিজ্ঞাসা

0
287

– মো.কামাল উদ্দিন
বাংলাদেশের গণমাধ্যম ইতিহাসে কিছু নাম কেবল পেশাগত পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না—তারা হয়ে ওঠেন সময়ের সাক্ষী, বিবেকের কণ্ঠস্বর। সাংবাদিক আনিস আলমগীর তেমনই এক নাম। টেলিভিশন সাংবাদিকতা, সংবাদ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন পেশাদারিত্ব, সাহস ও নৈতিকতার স্পষ্ট ছাপ। অথচ আজ সেই মানুষটিই কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই কারাগারে। প্রশ্ন জাগে এটা কি একজন ব্যক্তির বন্দিত্ব, নাকি সত্য বলার শাস্তি? শৈশব, শিক্ষা ও মূল্যবোধ বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া আনিস আলমগীর বেড়ে উঠেছেন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের আলো–বাতাসে। শৈশব থেকেই সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজবাস্তবতার প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল। উচ্চশিক্ষায় যোগাযোগ ও গণমাধ্যম বিষয়ে অধ্যয়ন তাকে সাংবাদিকতার তাত্ত্বিক ও নৈতিক ভিত্তি দেয়। পরিবার, শিক্ষা ও ইতিহাস—এই তিনের সম্মিলনে গড়ে ওঠে তার দৃঢ় মূল্যবোধ, যেখানে সত্যের সঙ্গে আপসের কোনো জায়গা নেই। প্রিন্ট থেকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া : পেশাগত উত্থান প্রিন্ট মিডিয়ায় লেখালেখির মাধ্যমে আনিস আলমগীরের সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। খুব অল্প সময়েই তার বিশ্লেষণধর্মী লেখা ও অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি পাঠকের দৃষ্টি কাড়ে। পরবর্তীতে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এসে তিনি রিপোর্টিং, সম্পাদনা ও সংবাদ বিশ্লেষণে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যান। সংবাদকে তিনি কখনোই চমক বা প্রোপাগান্ডার মোড়কে উপস্থাপন করেননি—বরং তথ্য, প্রেক্ষাপট ও দায়িত্ববোধের ভারসাম্য বজায় রেখেছেন।যুদ্ধক্ষেত্রের সাংবাদিক : ইরাক–কুয়েত রণাঙ্গনের স্মৃতি আনিস আলমগীর শুধু স্টুডিওর সাংবাদিক নন—তিনি রণাঙ্গনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ইরাক–কুয়েত যুদ্ধে ‘আজকের কাগজ’-এর আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি হিসেবে তিনি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। বোমা, ধ্বংসস্তূপ আর মৃত্যুভয়ের মাঝেও তিনি পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা তার স্মৃতিময় বই সাহসী সাংবাদিকতার এক অনন্য দলিল—যা আমি নিজে পাঠ করেছি গভীর শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ে। একুশে টেলিভিশন ও সংবাদ ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দীর্ঘদিন একুশে টেলিভিশন (ETV)-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে আনিস আলমগীর একসময় বার্তা প্রধান (Head of News) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে সংবাদ বিভাগে শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা নতুন মাত্রা পায়। সংবাদ নির্বাচন থেকে উপস্থাপন—সবখানেই ছিল তার দৃঢ় সম্পাদকীয় নীতি। পরবর্তীতে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন-এ যুক্ত হয়ে তিনি সংবাদকে আরও কাঠামোবদ্ধ, তথ্যনির্ভর ও দর্শকবান্ধব করে তোলেন। কলাম, চিন্তা ও নৈতিক অবস্থান আনিস আলমগীর একজন প্রভাবশালী কলাম লেখক। গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় নীতি, ক্ষমতার কাঠামো ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে তার লেখা যুক্তিনির্ভর ও স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করেন—সাংবাদিকতা ক্ষমতার সেবা নয়, জনস্বার্থের পাহারা। আজকের বাস্তবতা : কারাগারে একজন সাংবাদিক চট্টগ্রামের সন্তান, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের এই সাহসী সাংবাদিক আজ মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক। এটি শুধু দুঃখজনক নয়—এটি ভয়ংকর একটি নজির। কারণ আজ আনিস আলমগীর, কাল হয়তো অন্য কেউ। তার মুক্তির দাবিতে দেশ–বিদেশের সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক সংগঠন সোচ্চার। আমি নিজেও পেন ইন্টারন্যাশনাল-এর একজন সদস্য হিসেবে কলম ধরেছি—কারণ লেখক ও সাংবাদিকের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই আমার বিশ্বাসের অংশ। নোবেলজয়ী ইউনুস স্যারের প্রতি প্রত্যাশা মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক সুরক্ষার প্রতীক। তিনি নিজেই একসময় বলেছিলেন “আমার বিরুদ্ধে লিখতে পারো, আমি লেখার পথে বাধা হব না।” আজ তাই একজন সাংবাদিক হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন রাখি আনিস আলমগীরের বন্দিত্ব কি সেই ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আমি বিশ্বাস করি, ড. ইউনুস স্যার এই বিষয়টির গভীরতা অনুধাবন করবেন এবং ন্যায়বিচারের পথে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। বিবেকের মুক্তি চাই আনিস আলমগীরের মুক্তি মানে শুধু একজন মানুষের মুক্তি নয় এটি সত্য, বিবেক ও সাংবাদিকতার মুক্তি। কারাগারে যদি সত্য বন্দি থাকে, তবে মুক্ত সমাজ কেবল কাগজে-কলমেই বেঁচে থাকে। আজ তাই একজন সাংবাদিক হিসেবে, কলম হাতে আমি একটাই দাবি জানাই আনিস আলমগীরকে মুক্তি দিন। সত্যকে মুক্তি দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here