
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
কাজী নজরুল ইসলাম-কে আমরা সাধারণত বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, সাম্যের কবি কিংবা সংগীতস্রষ্টা হিসেবেই বেশি স্মরণ করি। কিন্তু তাঁর জীবনের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো সাংবাদিকতা। নজরুলের সাংবাদিকতা ছিল কেবল সংবাদপত্রে লেখা নয়; বরং তা ছিল শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে অবস্থান, সমাজ পরিবর্তনের ডাক এবং এক জাগ্রত বিবেকের সাহসী উচ্চারণ। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় ছিল রাজনৈতিক উত্তেজনা, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভে উত্তাল। সেই সময়েই নজরুলের কলমে জন্ম নেয় বিদ্রোহী ভাষা। সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন শেষে তিনি কলকাতায় এসে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সংবাদপত্রকে তিনি জনগণের চেতনা জাগানোর শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। ‘নবযুগ’: সাংবাদিক নজরুলের প্রথম শক্তিশালী পদচারণা নবযুগ পত্রিকায় নজরুলের কাজ ছিল তাঁর সাংবাদিক জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এই পত্রিকায় তিনি সম্পাদকীয় লেখা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, সমাজসংস্কারমূলক ভাবনা এবং জনমানুষের দুর্দশা নিয়ে তীক্ষ্ণ ভাষায় লিখতেন। তাঁর ভাষা ছিল প্রাণবন্ত, কাব্যিক, কিন্তু প্রতিবাদে দৃঢ়। সাধারণ মানুষের ভাষায় জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। নজরুল বিশ্বাস করতেন—সাংবাদিকতার কাজ কেবল ক্ষমতাবানদের বক্তব্য ছাপানো নয়; বরং অন্যায়, শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করা। সে কারণে তাঁর লেখায় ইংরেজ শাসনের সমালোচনা যেমন ছিল, তেমনি ছিল সমাজের কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ। ‘ধূমকেতু’: আগুনঝরা সাংবাদিকতার প্রতীক ধূমকেতু ছিল নজরুলের সাংবাদিকতার সবচেয়ে উজ্জ্বল ও বিপ্লবী অধ্যায়। ১৯২২ সালে প্রকাশিত এই সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি নিজেই। ‘ধূমকেতু’ নামের মধ্যেই যেন ছিল বিদ্রোহের ইঙ্গিত—আকাশ চিরে ছুটে যাওয়া এক আগুনময় বার্তা। এই পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়, কবিতা ও প্রবন্ধে নজরুল সরাসরি ব্রিটিশবিরোধী বক্তব্য দেন। তিনি জনগণকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষা ছিল বজ্রকণ্ঠের মতো—কখনো তীব্র, কখনো আবেগময়, আবার কখনো গভীর মানবিকতায় পূর্ণ। বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কবিতাটিকে তারা বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিল। ফলস্বরূপ নজরুলকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু কারাগারে থেকেও তাঁর মনোবল ভাঙেনি। বরং তিনি অনশন করেন, প্রতিবাদ জানান এবং লেখনীর মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান বজায় রাখেন। ‘লাঙ্গল’: শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর লাঙ্গল পত্রিকায় নজরুল শ্রমিক, কৃষক ও বঞ্চিত মানুষের কথা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত স্বাধীনতা সম্ভব নয়। তাঁর সাংবাদিকতায় তাই দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রাম, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নের প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে। তিনি কেবল রাজনীতির সাংবাদিক ছিলেন না; ছিলেন মানবতার সাংবাদিক। মানুষের কষ্ট, ক্ষুধা, শোষণ এবং বৈষম্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিত। নজরুলের সাংবাদিকতার ভাষা ও বৈশিষ্ট্য নজরুলের সাংবাদিকতার ভাষা ছিল অনন্য। তিনি কঠিন রাজনৈতিক বক্তব্যও সাহিত্যিক সৌন্দর্যে লিখতে পারতেন। তাঁর সম্পাদকীয় পড়লে মনে হয় যেন গদ্যের মধ্যে কবিতা প্রবাহিত হচ্ছে। শব্দচয়ন ছিল আবেগময়, অথচ যুক্তিনির্ভর। তাঁর সাংবাদিকতার কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল— বিদ্রোহী চেতনা: অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান। মানবতাবাদ: ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদার পক্ষে কথা বলা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের আহ্বান। সাহিত্যিক গদ্য: সম্পাদকীয় ও প্রবন্ধে কবিত্বময় ভাষার ব্যবহার। জনগণের সাংবাদিকতা: অভিজাতদের নয়, সাধারণ মানুষের পক্ষে অবস্থান। সাংবাদিক নজরুলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজকের ভাষায় বলা যায়, নজরুল ছিলেন “অ্যাক্টিভিস্ট সাংবাদিক” বা আন্দোলনমুখী সাংবাদিকতার এক অগ্রদূত। তিনি সংবাদপত্রকে ব্যবসা বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর কাছে কলম ছিল অস্ত্র, সংবাদপত্র ছিল সংগ্রামের মঞ্চ। এই কারণেই নজরুল কেবল একজন কবি নন, একজন সাহসী সম্পাদক, প্রতিবাদী সাংবাদিক এবং বিবেকবান জনবুদ্ধিজীবী হিসেবেও ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর সাংবাদিকতা আমাদের শেখায়—সত্য বলা কখনো সহজ নয়, কিন্তু সত্য বলার সাহসই একজন প্রকৃত সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

