“ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় চট্টল গবেষক আবদুল হক চৌধুরী-

0
36
২৬ অক্টোবর, ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি-
ইতিহাসের কিছু মানুষ সময়ের সীমানা অতিক্রম করে বেঁচে থাকেন তাঁদের জ্ঞান, সাধনা ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। তাঁরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁদের কর্ম কখনো হারিয়ে যায় না। প্রখ্যাত চট্টল গবেষক আবদুল হক চৌধুরী তেমনই একজন মনীষী, যাঁর গবেষণায় সমৃদ্ধ হয়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ ও সংস্কৃতির অজানা অধ্যায়।
১৯৯৪ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন। আজ তাঁর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি এই মহান ইতিহাসসাধককে। আমার কাছে তিনি কেবল একজন গবেষক নন, তিনি জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভান্ডার, ইতিহাস অনুসন্ধানের এক অনন্য প্রেরণা।
২০১১ সালে আবদুল হক চৌধুরীকে মরণোত্তর একুশে পদকে সম্মানিত করার সংবাদ আমাকে গভীরভাবে আনন্দিত করেছিল। একজন গবেষণাপ্রেমী মানুষ হিসেবে মনে হয়েছিল, ইতিহাসের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা ও নিষ্ঠার যথার্থ স্বীকৃতি মিলেছে। এই সম্মান শুধু একজন গুণী মানুষের অর্জন নয়, বরং চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও গৌরব।
ব্যক্তিগত স্মৃতিতে আবদুল হক চৌধুরী
মরহুম এস এম জামাল উদ্দিনের মাধ্যমে আবদুল হক চৌধুরীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এবং তাঁকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে তাঁর গভীর চিন্তা, জ্ঞান ও অনুসন্ধিৎসা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমি নিজেকে ইতিহাসের একজন শিক্ষার্থী মনে করি। জ্ঞান আহরণের এই দীর্ঘ পথচলায় তাঁর গবেষণাগ্রন্থ আমার কাছে অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠেছে।
তাঁর লেখা থেকে আমি বারবার চট্টগ্রামের অতীত, জনপদের পরিচয়, মানুষের জীবনধারা এবং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের সন্ধান পেয়েছি। তাঁর বইয়ের পাতায় পাতায় রয়েছে ইতিহাসের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সত্য অনুসন্ধানের নিষ্ঠা এবং নিরলস পরিশ্রমের পরিচয়।
১৯৯৪ সালে তাঁর প্রয়াণের পর বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে মরহুম এস এম জামাল উদ্দিনের বঙ্গবন্ধু ভবনে আয়োজিত স্মরণসভার স্মৃতি আজও আমার মনে অমলিন। পরবর্তী সময়ে সুপ্রভাত রাউজান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানে আবদুল হক চৌধুরীর নামে সম্মাননা পুরস্কার লাভের সৌভাগ্যও আমার হয়েছিল। সেই সম্মান আমার কাছে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়েও বেশি, প্রিয় একজন গবেষকের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার স্মারক।
জীবন ও গবেষণার অনন্য অধ্যায়
আবদুল হক চৌধুরী ১৯২২ সালের ২৪ আগস্ট চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াজিসপুর গ্রামের ফতেনগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শরফুদ্দিন এবং মাতা মোমেনা খাতুন। শৈশবে পিতৃবিয়োগ ও নানা প্রতিকূলতার কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হলেও জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা কখনো থেমে থাকেনি।
পেশায় শিক্ষক হলেও গবেষণাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক নামের উৎস, প্রাচীন জনপদ, আরাকান, রোহিঙ্গা এবং বৃহত্তর বাংলার নানা ঐতিহাসিক বিষয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গে’ ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়। ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি’সহ তাঁর বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থ চট্টগ্রামের ইতিহাসচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
তাঁর গবেষণার বিশেষত্ব ছিল স্থানীয় ইতিহাসকে বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা। প্রাচীন জনপদ, মানুষের জীবনধারা, সমুদ্রবাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে তিনি চট্টগ্রামের অতীতকে তুলে ধরেছেন। তাঁর গবেষণাকর্ম আজও ইতিহাসপ্রেমী ও নতুন প্রজন্মের গবেষকদের জন্য মূল্যবান সম্পদ।
তিনি শুধু ইতিহাসের অনুসন্ধানী ছিলেন না, সমাজের প্রতিও ছিলেন দায়িত্বশীল। সদালাপী, ন্যায়নিষ্ঠ, অতিথিপরায়ণ ও সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটি জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি নিজ এলাকার সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও অবদান রেখেছেন।
ইতিহাস সংরক্ষণে আমাদের দায়িত্ব
একজন গবেষকের প্রকৃত সম্মান তাঁর কর্মকে সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আবদুল হক চৌধুরীর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনাবলি সংরক্ষণ, গবেষণাগ্রন্থ পুনর্মুদ্রণ, পূর্ণাঙ্গ জীবনী প্রণয়ন এবং তাঁর গবেষণাকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আমাদের বিশ্বাস, যেসব মনীষী তাঁদের জীবন জ্ঞান ও গবেষণায় উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানার সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। কারণ নিজের ইতিহাসকে জানা মানে নিজের শেকড়কে চেনা, নিজের ঐতিহ্যকে ভালোবাসা এবং ভবিষ্যতের জন্য আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করা।
আজ ৩২ বছর পরও আবদুল হক চৌধুরী আমাদের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি আমাদের বেদনা দেয়, কিন্তু তাঁর গবেষণার আলো আমাদের পথ দেখায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সত্যিকারের জ্ঞানসাধকের পরিচয় তাঁর পদবি কিংবা খ্যাতিতে নয়, তাঁর কর্মের স্থায়িত্বে।
আবদুল হক চৌধুরী আমাদের গৌরব, আমাদের প্রেরণা। তাঁর রেখে যাওয়া ইতিহাসের ভান্ডার যত দিন পাঠক ও গবেষকদের আলোকিত করবে, তত দিন তিনি বেঁচে থাকবেন চট্টলবাসীর হৃদয়ে।
পরিশেষে, এই মহান চট্টল গবেষকের স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর গবেষণার আলোয় আমাদের অতীত আরও সমৃদ্ধ হোক, নতুন প্রজন্ম ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জানার প্রেরণা লাভ করুক।
আপনি নেই, কিন্তু আপনার গবেষণা আছে; আপনি নীরব, কিন্তু আপনার লেখা আজও কথা বলে। ইতিহাসের পাতায় এবং চট্টলবাসীর হৃদয়ে আপনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
মো. কামাল উদ্দিন
লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক
মহাসচিব, বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here