সিলিকন সিটিতে কিছু সময়—তুরাগের ওপারে গড়ে উঠছে আগামীর আধুনিক নগরসভ্যতার স্বপ্ন

0
29
পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিনোদন ও প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক জীবনের সমন্বয়ে বিশ্বমানের একটি আধুনিক শহর গড়ে তোলার সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।
শহর মানে শুধু ইট-পাথরের দালান, সুউচ্চ ভবন কিংবা প্রশস্ত সড়কের সমষ্টি নয়। একটি আদর্শ শহর হচ্ছে এমন একটি আবাসস্থল, যেখানে মানুষ নিরাপদে বসবাস করবে, শিশুরা আনন্দে বেড়ে উঠবে, তরুণেরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, প্রবীণেরা কাটাবেন স্বস্তির সময় এবং প্রতিটি নাগরিক উপভোগ করবেন আধুনিক জীবনের প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা। এমনই এক সম্ভাবনাময় নগরপরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত হতে সম্প্রতি ঘুরে এলাম সাভারে অবস্থিত সিলিকন সিটি।
তুরাগ নদের ওপারে প্রকৃতির কাছাকাছি গড়ে ওঠার প্রত্যাশায় এই নগরীকে ঘিরে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। ঢাকার ব্যস্ত ও জনবহুল নগরজীবনের বাইরে তুলনামূলক পরিকল্পিত, নান্দনিক ও আধুনিক আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার যে স্বপ্ন, সিলিকন সিটির পরিকল্পনায় তারই প্রতিফলন দেখতে পেলাম। তবে বর্তমানে গাড়িতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সাভারের আমিনবাজার হয়ে যেতে হয়। ভবিষ্যতে যোগাযোগব্যবস্থার আরও উন্নয়ন ঘটলে এই অঞ্চল ঢাকার নগরায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারিত কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিদর্শনে আমার সঙ্গে ছিলেন বাংলা টেলিভিশনের সাবেক সিও (চিফ অপারেটিং অফিসার) সোহেল হোসেন। আমরা সিলিকন সিটির বিভিন্ন পরিকল্পনা, অবকাঠামো, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আলোচনা করি। তাঁর কাছ থেকেও জানতে পারি এই নগরীকে ঘিরে বিভিন্ন উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ ভাবনার কথা।
শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো
একটি আধুনিক শহরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে মানসম্মত শিক্ষা। সিলিকন সিটির পরিকল্পনায় রয়েছে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১০টি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা রয়েছে। একই নগরীতে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যাতায়াতের ভোগান্তি কমবে এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টিও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। রয়েছে ১২টি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা। ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিসরের সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত নাগরিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে।
ক্রীড়া, বিনোদন ও সংস্কৃতির সমন্বয়
মানুষের জীবন শুধু কর্মব্যস্ততার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন খেলাধুলা, শরীরচর্চা, বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক চর্চা। সিলিকন সিটির পরিকল্পনায় রয়েছে তিনটি স্টেডিয়াম। পাশাপাশি থাকবে একাধিক বিনোদনকেন্দ্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্থান, শিশুদের জন্য বিভিন্ন পার্ক, সুইমিংপুল এবং অবসর কাটানোর নান্দনিক পরিবেশ।
বিশেষ করে শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ ও পার্ক একটি আধুনিক শহরের অপরিহার্য অংশ। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ, খেলাধুলার সুযোগ এবং প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। একইভাবে তরুণদের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ একটি সুস্থ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক নগরব্যবস্থা
আগামীর শহর হবে প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও নাগরিকবান্ধব। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা, উন্নত পানি ও পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা এবং সবুজায়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলে সিলিকন সিটি একটি আধুনিক নগরীর আদর্শ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
একটি বিশ্বমানের শহরের জন্য প্রয়োজন আধুনিক হাসপাতাল, জরুরি চিকিৎসাসেবা, ফায়ার সার্ভিস, নিরাপদ পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পার্কিং, গণপরিবহন, সিসিটিভি নিরাপত্তা, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন নাগরিক সেবা। এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে নগরবাসীর জীবনযাত্রায় আসবে স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য।
প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুরাগ নদের অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বিবেচনায় নদী, জলাধার, সবুজ এলাকা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। উন্নয়ন যেন প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পরিবেশের ক্ষতির কারণ না হয়, সেটিই হওয়া উচিত পরিকল্পিত নগরায়ণের অন্যতম অঙ্গীকার।
সোহেল হোসেনের মানবিক উদ্যোগ—মাদকাসক্তি নিরাময়ে আধুনিক হাসপাতাল
সিলিকন সিটি পরিদর্শনের সময় সোহেল হোসেনের একটি বিশেষ উদ্যোগের কথাও জানতে পারলাম। তিনি এখানে একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছেন। বিশেষভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, মানসিক পরিচর্যা, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি আধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় হাসপাতাল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন।
আমার বিবেচনায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক একটি পরিকল্পনা। মাদকাসক্তি আজ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাদকের কারণে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণের জীবন বিপন্ন হচ্ছে, পরিবার হারাচ্ছে শান্তি, সমাজ হারাচ্ছে কর্মক্ষম মানুষ। অথচ যথাযথ চিকিৎসা, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা, পারিবারিক সহযোগিতা এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে অনেক মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এ ধরনের একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু সিলিকন সিটির বাসিন্দারাই নন, আশপাশের অঞ্চলের মানুষও উপকৃত হতে পারেন। চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা, কাউন্সেলিং, পরিবারকে পরামর্শ প্রদান এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকলে প্রতিষ্ঠানটি সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।
সাংবাদিকদের জন্য আবাসন—একটি ব্যতিক্রমী ভাবনা
সোহেল হোসেনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিচয় হচ্ছে তিনি সংবাদপত্র প্রকাশনার সঙ্গেও সম্পৃক্ত। তাঁর উদ্যোগে প্রকাশিত হচ্ছে সরকারি অনুমোদন ও নিবন্ধনপ্রাপ্ত দুটি দৈনিক পত্রিকা—‘দৈনিক পত্রিকার পাতা’ এবং ‘দৈনিক উদ্যোক্তা’।
সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল ও চ্যালেঞ্জিং পেশা। প্রতিদিন সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান, সম্পাদনা ও জনস্বার্থে কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে আবাসনসংকট অনেক সাংবাদিকের জীবনকে কঠিন করে তোলে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় সোহেল হোসেন সাংবাদিকদের জন্য আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছেন। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে সাংবাদিক সমাজের জন্য তা হতে পারে একটি প্রশংসনীয় সংযোজন। পেশাজীবীদের আবাসন, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের চিন্তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
একটি শহর, একটি স্বপ্ন, একটি সম্ভাবনা
সিলিকন সিটির পরিকল্পনায় যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হলো এখানে শুধু আবাসন নয়, বরং শিক্ষা, চিকিৎসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিনোদন এবং সামাজিক জীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গকে এক জায়গায় সমন্বিত করার প্রত্যাশা রয়েছে।
একটি পরিকল্পিত শহরে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা, বাজারব্যবস্থা, সুপারশপ, রেস্তোরাঁ, গণপরিবহন এবং জরুরি সেবার সহজপ্রাপ্যতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রবীণদের জন্য হাঁটার পথ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো এবং নারীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থাও আধুনিক নগরপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে যেকোনো বড় পরিকল্পনার প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করে তার বাস্তবায়ন, পরিবেশগত ভারসাম্য, স্বচ্ছতা, মানসম্মত নির্মাণ এবং নাগরিক স্বার্থ সংরক্ষণের ওপর। সিলিকন সিটির ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি ভবিষ্যতে একটি আকর্ষণীয় ও আধুনিক নগরকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
তুরাগ নদের ওপারে সাভারের এই সিলিকন সিটি পরিদর্শন আমার কাছে ছিল আগামীর নগরজীবনের একটি সম্ভাবনাকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। একটি সুন্দর শহর গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি ভালোবাসা।
আমি বিশ্বাস করি, উন্নয়নের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন সেই উন্নয়ন মানুষের জীবনে স্বস্তি, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আনন্দ নিয়ে আসে। সিলিকন সিটির স্বপ্নও তেমনই হোক—যেখানে থাকবে আধুনিকতার ছোঁয়া, প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, শিক্ষার আলো, চিকিৎসার নিশ্চয়তা, সংস্কৃতির বিকাশ এবং মানবিক জীবনযাপনের পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ।
তুরাগের ওপারে গড়ে উঠুক এমন এক নগরী, যেখানে মানুষ শুধু বসবাস করবে না, স্বপ্ন দেখবে; শুধু ঘর তৈরি করবে না, তৈরি করবে আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ।
সিলিকন সিটির আগামীর যাত্রা সফল ও কল্যাণমুখী হোক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here