
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহননের অভিযোগ; অপপ্রচারকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার চরনদ্বীপ ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আক্কাস খানের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে পরিকল্পিত অপপ্রচার, আপত্তিকর মন্তব্য এবং তাঁর পরিবারের সম্মানহানির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিজের, পরিবারের সদস্যদের সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বোয়ালখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১৮১, তারিখ ৪ নভেম্বর ২০২৬) করেছেন তিনি।
আক্কাস খানের অভিযোগ, ‘মহানগর যুবদল’ ও ‘সোনার বাংলা’ নামের দুটি ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর পোস্ট, মন্তব্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য তাঁর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের সুনাম নষ্ট করা। বিষয়টি নজরে আসার পর তিনি বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট আইডিগুলোর পেছনে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। তবে সফল না হওয়ায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
জিডিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, তাঁর পরিবার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ও সম্মানিত। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা ভুয়া ফেসবুক আইডির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর লেখা, পোস্ট ও মন্তব্য করে তাঁর এবং পরিবারের অপূরণীয় সামাজিক ক্ষতিসাধনের চেষ্টা করছেন। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও তিনি জিডিতে উল্লেখ করেছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিচিত মুখ আক্কাস খান
মোহাম্মদ আক্কাস খান চরনদ্বীপ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি চরনদ্বীপ ইউনিয়নের সি-ব্লকের নির্বাচিত সদস্য (মেম্বার) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচিতি দীর্ঘদিনের। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও দীর্ঘকাল ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এখনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
আক্কাস খানের রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে মামলা, হামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে এলাকায় মাদক, সন্ত্রাস, অন্যায়-অবিচার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তাঁর সমর্থকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছেন। এ কারণে চরনদ্বীপের একটি অংশের মানুষের মধ্যে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাঁকে চেয়ারম্যান পদে দেখতে চাওয়ার আলোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে বিতর্ক
আক্কাস খানের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় কিছু ব্যক্তি নতুন করে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, সংগ্রাম ও পরীক্ষিত ভূমিকার পরিবর্তে কেউ কেউ সুসময়ের রাজনৈতিক বন্ধু পরিচয়ে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও তিনি মনে করেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে যারা অন্যায়, অনিয়ম, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানুষদের বিরোধিতা করেছে, তাদের কেউ কেউ এখন সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পশ্চিম চরনদ্বীপের একটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আসছে। অতীতে ওই পরিবারের বিরুদ্ধে এলাকায় অন্যায়-অত্যাচার ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল বলে তিনি দাবি করেন। এসব বিষয়ে চরনদ্বীপের মানুষের অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
আক্কাস খানের বক্তব্য: অপপ্রচারকারীদের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে
এ বিষয়ে মোহাম্মদ আক্কাস খান বলেন,
“আমি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। চরনদ্বীপ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ইউনিয়নের সি-ব্লকের মেম্বার হিসেবেও মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। রাজনৈতিক জীবনে অনেক প্রতিকূলতা, মামলা, হামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু অন্যায়, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান থেকে কখনো সরে আসিনি।
আজ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে দেখতে হচ্ছে, কিছু অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে আমাকে এবং আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মিথ্যা, আপত্তিকর ও মানহানিকর প্রচারণা চালাচ্ছে। একটি পরিবারের সম্মান শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় নয়, এর সঙ্গে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সামাজিক মর্যাদা জড়িত। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার কারণে কোনো পরিবারকে অপমান করার অধিকার কারও নেই।
আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে আমাকে মানুষের কাছে ছোট করা যাবে না। যারা এসব ভুয়া আইডির আড়ালে থেকে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাদের পরিচয় প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চরনদ্বীপবাসীর প্রতি আহ্বান: গুজবে নয়, সত্যের পক্ষে থাকুন
আক্কাস খান চরনদ্বীপের সর্বস্তরের জনগণ, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো লেখা, ছবি কিংবা মন্তব্য দেখেই যেন কেউ বিভ্রান্ত না হন। কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে শেয়ার করা কিংবা মন্তব্যের মাধ্যমে অপপ্রচারকে ছড়িয়ে দেওয়া থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “চরনদ্বীপ আমাদের সবার। এখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু কারও ব্যক্তিগত সম্মান, পারিবারিক মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে মিথ্যাচার গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যারা প্রকৃত অর্থে এলাকার উন্নয়ন চান, তাঁদের উচিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকা।”
পুলিশের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
বোয়ালখালী থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরিতে আক্কাস খান সংশ্লিষ্ট ফেসবুক আইডিগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত, প্রকৃত ব্যবহারকারীদের পরিচয় শনাক্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বাধীনতা কখনোই কারও ব্যক্তিগত সম্মানহানি, মিথ্যা তথ্য প্রচার কিংবা পরিবারের সদস্যদের হেয়প্রতিপন্ন করার লাইসেন্স হতে পারে না। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলে তার মোকাবিলা হওয়া উচিত যুক্তি, আদর্শ ও গণতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমে; ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে অপপ্রচারের মাধ্যমে নয়।
চরনদ্বীপের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা যেন ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, অপপ্রচার ও সামাজিক বিভাজনে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সচেতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আক্কাস খান।
এখন দেখার বিষয়, সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে পুলিশি তদন্তে এসব ফেসবুক আইডির প্রকৃত ব্যবহারকারীদের পরিচয় কত দ্রুত শনাক্ত হয় এবং অভিযোগের সত্যতা কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়।
অভিযোগের বিচার হোক নিরপেক্ষ তদন্তে, অপপ্রচারের অবসান হোক সত্যের শক্তিতে—এটাই প্রত্যাশা চরনদ্বীপের সচেতন মানুষের।

