শিরোনাম
“৮৪০ ঘণ্টার আলোকযাত্রা : সোনারগাঁও থানার ওসি গোলাম সরোয়ার, কিছু স্মৃতি, কিছু মানুষ এবং এক অনন্য বিকেলের গল্প-আজ ১৩ জুন কক্সবাজার সফরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী: উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার নতুন দিগন্ত কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডের উষ্ণ স্বাগত ও শুভেচ্ছা বার্তা-মে মাসে ৬১৩ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬২২, আহত ১,৬৫২ : যাত্রী কল্যাণ সমিতিনেপালের রাষ্ট্রপতিসহ বিশিষ্টজনদের আম উপহার দিল বাংলাদেশরাউজানে আন্তঃ এমপি গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬ এর শুভ উদ্বোধনঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করার স্বপ্নে এক প্রবাসীর রাজনৈতিক অভিযাত্রা | বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ইকরামুল হক খানের মুখোমুখি-দেশের বাজারে কত দামে স্বর্ণ ও রুপা বিক্রি হচ্ছেডিফেন্ডারের জায়গায় মিডফিল্ডার নিয়ে বড় চমক আনচেলত্তিরসিংগাইরে ডাকাতির অভিযোগে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যুসীমান্তের ১১ জেলায় বিজিবির সঙ্গে দায়িত্বে আনসার-ভিডিপি সদস্যরা

― Advertisement ―

“৮৪০ ঘণ্টার আলোকযাত্রা : সোনারগাঁও থানার ওসি গোলাম সরোয়ার, কিছু স্মৃতি, কিছু মানুষ এবং এক অনন্য বিকেলের গল্প-

-মো. কামাল উদ্দিনঃ জীবনের দীর্ঘ পথচলায় কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় দায়িত্বের সূত্রে, কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় পেশার কারণে, আর কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয়...

“৮৪০ ঘণ্টার আলোকযাত্রা : সোনারগাঁও থানার ওসি গোলাম সরোয়ার, কিছু স্মৃতি, কিছু মানুষ এবং এক অনন্য বিকেলের গল্প-

Homeঢাকা"৮৪০ ঘণ্টার আলোকযাত্রা : সোনারগাঁও থানার ওসি গোলাম সরোয়ার, কিছু স্মৃতি, কিছু...

-মো. কামাল উদ্দিনঃ
জীবনের দীর্ঘ পথচলায় কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় দায়িত্বের সূত্রে, কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় পেশার কারণে, আর কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটে হৃদয়ের ভেতরে। সময়ের স্রোত বয়ে যায়, পদ-পদবি বদলায়, অবস্থান পরিবর্তিত হয়, কিন্তু কিছু সম্পর্ক থেকে যায় অমলিন। সোনারগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ গোলাম সরোয়ারকে নিয়ে লিখতে বসে আমার ঠিক সেই অনুভূতিটাই ফিরে আসছে। অনেকেই হয়তো জানেন না, গোলাম সরোয়ারের সঙ্গে আমার পরিচয় আজকের নয়। বহু বছর আগে চট্টগ্রামের মাটিতে আমাদের পরিচয়ের শুরু। সেই সময়ের নানা স্মৃতি আজও আমার মনে ভাসে। দায়িত্বের জায়গা ভিন্ন ছিল, সময় ভিন্ন ছিল, কিন্তু মানুষটি একই ছিলেন—সৌম্য, ভদ্র, কর্মনিষ্ঠ এবং দায়িত্ববোধে দৃঢ়। সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে একদিন খবর পেলাম, তিনি নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক জনপদ সোনারগাঁও থানার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৩৫ দিনের মাথায় জেলার সেরা ওসি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। খবরটি শুনে ভালো লাগার পাশাপাশি কৌতূহলও জাগলো। মানুষটিকে তো আমি অনেক আগে থেকেই চিনি। কিন্তু নতুন দায়িত্বে তিনি কীভাবে কাজ করছেন, সেটি নিজের চোখে দেখার আগ্রহ থেকেই এক বিকেলে রওনা হলাম সোনারগাঁওয়ের পথে। সঙ্গে ছিলেন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু আরিফুল ইসলাম চৌধুরী, জহির ভাই এবং মাসুম আলী। ঢাকা শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে চললাম ইতিহাসের জনপদের দিকে। সোনারগাঁও—যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার গৌরব, ঐতিহ্য এবং সভ্যতার অসংখ্য গল্প। থানার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো এক ব্যস্ত পরিবেশ। মানুষের আনাগোনা, পুলিশের চলাচল, গাড়ির শব্দ—সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছিল, এখানে সময় থেমে থাকে না। দায়িত্বের ঘড়ি এখানে চব্বিশ ঘণ্টাই সচল। অফিস কক্ষে প্রবেশ করতেই পরিচিত সেই হাসিমাখা মুখ। গোলাম সরোয়ার উঠে দাঁড়িয়ে এমন আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন, যেন বহুদিনের আপনজন ফিরে এসেছে।
মানুষকে প্রথম দেখায় বিচার করা কঠিন। কিন্তু কিছু মানুষের উপস্থিতিতেই এক ধরনের ইতিবাচক শক্তি অনুভূত হয়। গোলাম সরোয়ার তাদেরই একজন। পদমর্যাদার অহংকার নেই, কৃত্রিমতা নেই, আছে সহজ সরল মানবিক আচরণ। আড্ডা শুরু হলো। চা এলো। কথার পর কথা এগিয়ে চললো। কিন্তু সেই আড্ডার মধ্যেও আমি লক্ষ্য করছিলাম তিনি যেন এক মুহূর্তের জন্যও দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নন। ফোন বেজে উঠছে, কর্মকর্তারা রিপোর্ট দিচ্ছেন, কোথাও অভিযান চলছে, কোথাও নতুন তথ্য আসছে। মাত্র ৩৫ দিনের দায়িত্বকাল। হিসাব করলে ৮৪০ ঘণ্টা। সময়ের হিসাবে খুব বেশি নয়। কিন্তু এই ৮৪০ ঘণ্টার ভেতরে তিনি যে কর্মদক্ষতা দেখিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। জেলার অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সেরা ওসি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে নিরলস পরিশ্রম, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং একটি কার্যকর নেতৃত্ব। সোনারগাঁওয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের একাধিক সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। বহুদিন ধরে এলাকাবাসীর আতঙ্ক হয়ে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে একজন সাংবাদিক হিসেবে আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা। আমরা যখন গল্প করছি, ঠিক তখনই একের পর এক পুলিশ সদস্য থানায় প্রবেশ করছেন। কেউ অভিযান শেষে ফিরছেন। কেউ নতুন গ্রেফতারের খবর দিচ্ছেন। কখনো ডাকাত, কখনো ছিনতাইকারী, কখনো বা গুরুতর মামলার আসামিকে থানায় আনা হচ্ছে। মনে হচ্ছিল, এটি যেন কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য নয়; বরং বাস্তব জীবনের এক চলমান যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে একদল মানুষ। সেদিন আরও একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করলাম—একজন ওসি একা কোনো থানাকে সফল করতে পারেন না। এর পেছনে থাকে একটি সুসংগঠিত, দক্ষ এবং নিবেদিতপ্রাণ টিম। সেই টিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেন থানার ওসি (তদন্ত) জামাল হোসেন। অল্প সময়ের পরিচয়েই ছেলেটির প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা জন্মেছে। অত্যন্ত বিনয়ী, মার্জিত এবং কর্মঠ একজন কর্মকর্তা। থানার ব্যস্ততম পরিবেশেও তাকে দেখেছি অবিচলভাবে দায়িত্ব পালন করতে। আজকের সময়ে পদমর্যাদা দিয়ে নয়, আচরণ দিয়েই মানুষ বড় হয়। জামাল হোসেনের মধ্যে আমি সেই বড় হওয়ার গুণটি দেখেছি। খুব বেশি কথা বলেন না। নিজের কাজের প্রচারও করেন না। কিন্তু তার কাজই তার পরিচয় বহন করে। তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা, মামলা তদারকি এবং অপরাধ দমন অভিযানে তিনি যে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন, তা সহজেই চোখে পড়ে। গোলাম সরোয়ারের নেতৃত্বে পরিচালিত সাফল্যের পেছনে জামাল হোসেনের মতো কর্মকর্তাদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। সেদিনের আরেকটি দৃশ্য এখনও চোখে ভাসে।
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক ডিআইজি শৈবাল চৌধুরী পরিবার-পরিজন নিয়ে থানায় এসেছিলেন। ওসি গোলাম সরোয়ার যেভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের স্বাগত জানালেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বাংলার ঐতিহ্যে অতিথিপরায়ণতা একটি মহৎ গুণ। দায়িত্বের কঠোর পরিবেশের মধ্যেও সেই মানবিক সৌন্দর্যের প্রকাশ দেখেছিলাম সেদিন। আমাদের জন্যও আন্তরিক আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু খাবার বা আপ্যায়নের চেয়েও বেশি মূল্যবান ছিল মানুষের প্রতি সেই আন্তরিক সম্মান। দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এলো গোলাম সরোয়ারের কর্মজীবনের নানা অভিজ্ঞতা। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, চাঁদনাইশ এবং কুমিল্লার দেবীদ্বারে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন, তার গল্প শুনছিলাম। বিভিন্ন সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো—তিনি নিজের অর্জন নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না। বারবার সহকর্মীদের কথা বলছিলেন। বারবার থানার সদস্যদের কৃতিত্ব তুলে ধরছিলেন। এই বিনয়ই একজন প্রকৃত নেতার সবচেয়ে বড় পরিচয়। কারণ প্রকৃত নেতৃত্ব নিজের সাফল্যের গল্প বলে না; বরং দলের সাফল্যকে সামনে নিয়ে আসে। আজকের সমাজে পুলিশকে ঘিরে নানা সমালোচনা আমরা প্রায়ই শুনি। কোথাও অনিয়ম, কোথাও ব্যর্থতা, কোথাও বিতর্ক। কিন্তু সেইসব আলোচনার আড়ালে অনেক ইতিবাচক কাজ চাপা পড়ে যায়। সোনারগাঁও থানায় কাটানো কয়েক ঘণ্টা আমাকে সেই ইতিবাচক দিকগুলো নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে। আমি দেখেছি দায়িত্ববোধ। আমি দেখেছি জবাবদিহিতা। আমি দেখেছি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক নিরন্তর চেষ্টা। আমি দেখেছি এমন কিছু পুলিশ সদস্যকে, যারা প্রচারের আলো খোঁজেন না, কিন্তু মানুষের নিরাপত্তার জন্য দিন-রাত কাজ করে চলেছেন।
গোলাম সরোয়ারকে দেখে আমার মনে হয়েছে, তিনি পুলিশি দায়িত্বকে কেবল একটি চাকরি হিসেবে দেখেন না। তিনি এটিকে জনসেবার একটি মহান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তার চোখে আমি দেখেছি কর্তব্যের দীপ্তি। তার কথায় শুনেছি মানুষের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার। তার কর্মব্যস্ততায় দেখেছি একজন রাষ্ট্রকর্মীর নিষ্ঠা। আর থানার পরিবেশে দেখেছি একটি কর্মমুখর, গতিশীল এবং মানবিক পুলিশ প্রশাসনের প্রতিচ্ছবি। থানা থেকে বেরিয়ে যখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নিভে আসছিল, তখন আমার মনে হচ্ছিল—এই দেশ এখনও ভালো মানুষের হাতে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা হয়তো টেলিভিশনের পর্দায় আসেন না। তারা হয়তো প্রতিদিন সংবাদ শিরোনাম হন না। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রচার করেন না। কিন্তু তারা কাজ করেন। নীরবে। নিভৃতে। অবিরাম। আর সেই কাজই একসময় তাদের প্রকৃত পরিচয় হয়ে ওঠে। সোনারগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ গোলাম সরোয়ার সেই মানুষদেরই একজন। মাত্র ৩৫ দিনের ৮৪০ ঘণ্টায় তিনি যে কর্মদক্ষতা, নেতৃত্ব এবং দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তার পাশে রয়েছেন ওসি (তদন্ত) জামাল হোসেনসহ একদল নিবেদিতপ্রাণ পুলিশ সদস্য। আমি বিশ্বাস করি, এই টিম যদি একই নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, তবে সোনারগাঁওয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে, সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং পুলিশের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও আরও সুদৃঢ় হবে। সেদিনের বিকেলটি আমার কাছে শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না। সেটি ছিল কর্মের গল্প শোনার বিকেল। মানুষকে নতুন করে চেনার বিকেল। দায়িত্ব ও মানবিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন দেখার বিকেল। আর তাই সাংবাদিক জীবনের অসংখ্য স্মরণীয় বিকেলের ভিড়ে সোনারগাঁও থানায় কাটানো সেই বিকেলটি আমার কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে। কারণ সেদিন আমি শুধু একজন ওসিকে দেখিনি। আমি দেখেছিলাম একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রকর্মীকে। দেখেছিলাম একজন মানবিক মানুষকে। দেখেছিলাম কর্তব্যের প্রতি অবিচল এক কর্মযোদ্ধাকে।