
মো. কামাল উদ্দিনঃ বাংলাদেশের জন্মকাহিনি শুধু একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়—এটি এক অনন্য মানবিক জাগরণের দলিল, যেখানে একটি নির্যাতিত জাতি তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল। এই ইতিহাসে যেমন রয়েছে বাঙালির বীরত্ব, তেমনি রয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং মানবিক দায়িত্ববোধের এক জটিল সমন্বয়। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ভূমিকা, বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী Indira Gandhi-এর অবদান—চিরস্মরণীয়, গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক এবং ইতিহাসের পাতায় অম্লান। আজকের প্রজন্মের একটি অংশ কিংবা কিছু মহল যখন প্রশ্ন তোলে—ভারত কেন, কীভাবে এবং কতটুকু ভূমিকা রেখেছিল—তখন ইতিহাসের নিরপেক্ষ দলিল আমাদের সামনে এক অনস্বীকার্য সত্য তুলে ধরে। সেই সত্য হলো, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে ভারতের ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক—মানবিক, কূটনৈতিক, সামরিক এবং নৈতিক। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরেই বিভক্তির সূচনা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্তান—এই দুই রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান গঠিত হয় ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দুটি অংশ নিয়ে—পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তান। কিন্তু এই রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর সংকট।
Muhammad Ali Jinnah ১৯৪৮ সালে সতর্ক করে বলেছিলেন—যদি প্রাদেশিক পরিচয়কে অবজ্ঞা করা হয় এবং জনগণের ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করা হয়, তবে এই রাষ্ট্র টিকে থাকবে না। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর বৈষম্য আরোপ করে—অর্থনীতি, প্রশাসন, সামরিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম সুসংগঠিত প্রতিবাদ। বাঙালি তরুণরা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করে, যা পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদের বীজকে শক্ত ভিত্তি দেয়। বঙ্গবন্ধুর আবির্ভাব: বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ১৯৬০-এর দশকে Sheikh Mujibur Rahman পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। তাঁর ছয় দফা দাবি ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। এই আন্দোলন শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোড়ন সৃষ্টি করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে দমন করতে ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে, যেখানে ভারতের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা। কিন্তু ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই ষড়যন্ত্রকে ভেঙে দেয়। জনগণের চাপে মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার এবং শেখ মুজিব মুক্তি পান—যা তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭০-এর নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের অস্বীকৃতি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এটি ছিল একটি গণতান্ত্রিক রায়, যা অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু Yahya Khan এবং Zulfikar Ali Bhutto ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা প্রকাশ করেন। এর ফলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে একটি সর্বাত্মক সংঘর্ষের দিকে গড়ায়।
২৫ মার্চ: গণহত্যার সূচনা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে—যা ইতিহাসে Operation Searchlight নামে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধিজীবী মহল, ছাত্র-যুবক—কেউই এই বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়, অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হয়, এবং গ্রাম-শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
এই অবস্থায় Sheikh Mujibur Rahman স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ঘটে। শরণার্থী সংকট: ভারতের ওপর মানবিক চাপ গণহত্যার ফলে প্রায় এক কোটি মানুষ জীবন বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নেয়। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো—পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম—অভূতপূর্ব মানবিক সংকটে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে Indira Gandhi এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। একদিকে দেশের অর্থনীতি, অন্যদিকে মানবিক দায়িত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রতিদিন হাজার হাজার শরণার্থীর খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা সবকিছুর দায়িত্ব নিতে গিয়ে ভারতের অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ পড়ে। তবুও ভারত মানবতার প্রশ্নে আপস করেনি। ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক অভিযান
ইন্দিরা গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন—শুধু সামরিকভাবে নয়, আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি ইউরোপ ও আমেরিকা সফর করে বিশ্ব নেতাদের কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। বিশেষ করে Richard Nixon-এর সঙ্গে বৈঠকে তিনি প্রত্যাশিত সমর্থন পাননি। যুক্তরাষ্ট্র তখন পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। তিনি বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যান, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের পক্ষে একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। ভারতের সংসদ ও জনমতের অবস্থান ভারতের সংসদে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে। ইন্দিরা গান্ধী সংসদে বলেন— “গণতন্ত্রের নামে যা পাকিস্তানে ঘটছে, তা মানবতার পরিপন্থী।” এই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং একটি নৈতিক অবস্থানও ছিল।
মুক্তিযুদ্ধ ও ভারতের সামরিক সহায়তা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারত মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং কৌশলগত সহায়তা প্রদান করে। এটি ছিল একটি সুসংগঠিত সহযোগিতা, যা মুক্তিযুদ্ধকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। অবশেষে পাকিস্তানের আগ্রাসনের জবাবে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারত সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়—যা Indo-Pakistani War of 1971 নামে পরিচিত। স্বীকৃতি ও বিজয়ের মুহূর্ত ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভারতের সেনাপ্রধান Sam Manekshaw-এর নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে—যা Surrender of Pakistani forces in Dhaka নামে পরিচিত। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন ও কৃতজ্ঞতা
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি Sheikh Mujibur Rahman স্বদেশে ফিরে আসেন। দিল্লিতে তাঁকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানানো হয়।
তিনি ভারতের জনগণ এবং Indira Gandhi-এর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন—যা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ১৯৭২ সালের ১১ই মার্চ ভারতের সৈনিক ফেরত নেন- ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে ইন্দিরা গান্ধী স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতের প্রধান মন্ত্রী হিসেবে ১৫ ই মার্চ বাংলাদেশ সফরে আসেন। ভারতের নীতি: মানবতা, সহনশীলতা ও সাহস
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের ভূমিকা ছিল তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো— মানবিকতা, কূটনীতি এবং সামরিক সহায়তা। ভারত শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি মানবিক শক্তি হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছিল।
উপসংহার: ইতিহাসের নিরপেক্ষ সত্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ভারতের ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে Indira Gandhi-এর নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা এবং সাহসিকতা আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাস কখনো পক্ষপাত করে না—সে শুধু সত্যকে তুলে ধরে। আর সেই সত্য হলো—বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের অবদান চিরস্মরণীয়। লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।

