
ঢাকা, বাংলাদেশ –
আজ, ১৩ই নভেম্বর, ২০২৫। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা – আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে, “জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫” অনুমোদনের মধ্য দিয়ে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য গণভোটের পথও প্রশস্ত হলো।
গত আগস্টের “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের” পর গঠিত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তিনটি প্রধান দায়িত্ব ছিল। প্রথমত, অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন। এবং তৃতীয়ত, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।
সরকার জানিয়েছে, এই তিনটি ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দ্রুতই তাদের প্রথম রায় দিতে যাচ্ছে। এছাড়াও, কয়েকটি মামলার বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ ফৌজদারি আদালতগুলোতেও জুলাইয়ের ঘটনা সম্পর্কিত কিছু বিচার কাজ শুরু হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে গুমের মতো নৃশংস অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে প্রথমবার ঘটলো।
সংস্কারের দিকে তাকালে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাড়ানো, বিচার ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা আনা, স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, ডিজিটালকরণ সম্প্রসারণ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ। কিছু সংস্কার এখনও চলছে, তবে সরকার আশা করছে এগুলো সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখবে। আগামী নির্বাচিত সরকার সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে এই সংস্কারগুলো গ্রহণ করবে বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মনে করে।
সবচেয়ে বড় খবর হলো “জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫” এর অনুমোদন। এই আদেশটি এখন গেজেট নোটিফিকেশনের অপেক্ষায় আছে। এটি জুলাই সনদে বর্ণিত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোটের ব্যবস্থা করেছে। এই প্রস্তাবগুলোর ওপর রাজনৈতিক দলগুলো ৯ মাস ধরে কাজ করার পর অনেকটাই ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
এই ঐতিহাসিক গণভোটটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, অনুষ্ঠিত হবে। ভোটারদের কাছে চারটি প্রধান বিষয়ে একটিমাত্র প্রশ্নে তাদের মতামত জানতে চাওয়া হবে।
প্রথমত, নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী গঠিত হবে। দ্বিতীয়ত, একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন করা হবে। জাতীয় নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ থাকবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে এই উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন লাগবে। তৃতীয়ত, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দলের ভূমিকা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং স্থানীয় সরকার বিষয়ক ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে। সবশেষে, জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
যদি গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হয়, তাহলে নতুন সংসদ বসার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদ তাদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে।
অর্থনৈতিকভাবেও, সরকার জানিয়েছে যে অভ্যুত্থান-পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো তারা গত ১৫ মাসে সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং রিজার্ভ সহ অর্থনীতির সকল সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরে এসেছে। ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে নানা পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগ কমার প্রবণতা থাকলেও, বাংলাদেশে অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম বছরে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) ১৯.১৩% বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরও একটি বড় খবর হলো, আগামী সপ্তাহে ডেনমার্কের ম্যারস্ক গ্রুপের মালিকানাধীন এপিএম টার্মিনালস বি.ভি. এর সঙ্গে লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের জন্য ৩০ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। ইউরোপীয় এই কোম্পানিটি এতে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে, যা বাংলাদেশে ইউরোপের সর্বোচ্চ একক বিনিয়োগ। লালদিয়া হবে দেশের প্রথম বিশ্বমানের গ্রিন পোর্ট।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানিয়েছে যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ এবং মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে তারা যেন দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থ ও চাওয়াকে প্রাধান্য দেয়। একটি সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে সকল দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

