
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম—একটি শহর, যার প্রতিটি সকাল শুরু হয় সম্ভাবনার আলো নিয়ে, আবার প্রতিটি সন্ধ্যায় জমা হয় সংগ্রামের দীর্ঘশ্বাস। এই শহর শুধু বন্দরনগরী নয়, এটি অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, মানুষের স্বপ্নের ভরসাস্থল। অথচ সেই শহরই একসময় নেমে গিয়েছিল এক গভীর অনিশ্চয়তায়—আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অপরাধচক্রের বিস্তার, ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা, আর সর্বোপরি পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা। এই অন্ধকার সময়েই দায়িত্ব নেন একজন নীরব অথচ দৃঢ়চেতা কর্মকর্তা—হাসিব আজিজ। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল এক ভাঙা ব্যবস্থাকে দাঁড় করানোর এক কঠিন যুদ্ধের সূচনা। সংকটের প্রেক্ষাপট: এক দিশাহারা সময় হাসিব আজিজ যখন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। রাস্তায় বিশৃঙ্খলা, অপরাধে দুঃসাহসিকতা, প্রভাবশালীদের প্রভাব, এবং পুলিশের অভ্যন্তরে মনোবলহীনতা—সব মিলিয়ে একটি বিপর্যস্ত অবস্থা। মানুষ তখন প্রশ্ন করছিল—পুলিশ কোথায়? আইন কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় তাঁর কাজ। নীরব বিপ্লব: ভেতর থেকে পরিবর্তনের সূচনা একজন দক্ষ প্রশাসকের মতোই তিনি বুঝেছিলেন—পরিবর্তন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; এটি ভেতর থেকে গড়ে তুলতে হয়। তাই তিনি প্রথমেই মনোযোগ দেন পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে। দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা নিয়মিত তদারকি শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম বৃদ্ধি এই পদক্ষেপগুলো ছিল হয়তো চোখে পড়ার মতো বড় কোনো ঘোষণা নয়, কিন্তু এগুলোই ছিল পরিবর্তনের ভিত্তি। ধীরে ধীরে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ফিরে আসে কর্মস্পৃহা। যে বাহিনী একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল, সেই বাহিনী আবার সক্রিয় হতে শুরু করে। আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান পরিবর্তন: বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে কাজ চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা কোনো সহজ কাজ ছিল না। এখানে ছিল সন্ত্রাসী কার্যক্রম চাঁদাবাজি মাদক ব্যবসা ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা কিন্তু হাসিব আজিজ এই সমস্যা গুলোর মোকাবিলা করেছেন ধাপে ধাপে, পরিকল্পিত ভাবে। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশার বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণে তাঁর উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত সাহসী। এই বিষয়টি বহুদিন ধরে আলোচিত হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তিনি সেই জায়গায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং বাস্তবায়ন করেছেন। ফলাফল? রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরে আসতে শুরু করে জনদুর্ভোগ কমে ট্রাফিক ব্যবস্থায় একটি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি ছিল নেতৃত্বের দৃঢ়তার প্রতিফলন। জনবান্ধব পুলিশ: আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়াস একটি রাষ্ট্রে পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়—মানুষের আস্থা। দীর্ঘদিন ধরে সেই আস্থার জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মানুষ পুলিশকে ভয় পেত, দূরে থাকত। হাসিব আজিজ এই বাস্তবতাকে বদলানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি বুঝেছিলেন “আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের হৃদয়ে জায়গা তৈরি করতে হবে।” তাই তাঁর সময়কালে দেখা গেছে পুলিশের আচরণে পরিবর্তন সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি দায়িত্ব পালনে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এই পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে পুলিশের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে শুরু করে। দুই বন্ধুর গল্প: সংগ্রাম, অবহেলা ও অর্জন হাসিব আজিজ ও আহসান হাবিব পলাশ—দুই বন্ধু, দুই সহযোদ্ধা। ১৯৯৫ সালে ১৫তম বিসিএস ব্যাচের মাধ্যমে তারা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু তাদের পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘ বছর ধরে তারা পদোন্নতি বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। যখন তাদের অনেক জুনিয়র দ্রুত উচ্চপদে পৌঁছে গেছে, তখন তারা নীরবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তারা কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় নেননি, কোনো অনৈতিক পথে হাঁটেননি। তারা বিশ্বাস করেছেন—যোগ্যতার মূল্য একদিন মিলবেই। আজ তারা সেই মূল্যায়ন পেয়েছেন। একজন অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে এপিবিএনের নেতৃত্বে অন্যজন র্যাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীতে দায়িত্বে এই অর্জন শুধু তাদের নয়—এটি সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের জন্য এক অনুপ্রেরণা। বদলি: অবমূল্যায়ন নয়, উত্তরণের ধাপ আজ কিছু মহল বলছে—হাসিব আজিজের বদলি নাকি তাঁর ব্যর্থতার প্রতিফলন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশাসনে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে যখন একজন কর্মকর্তা উচ্চতর দায়িত্বে যাচ্ছেন, তখন এটি একটি স্বীকৃতি হিসেবেই বিবেচিত হয়। ইতিহাস বলছে পুলিশ কমিশনার পদ থেকে অনেকেই আইজিপি হয়েছেন র্যাব থেকেও দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ার নজির রয়েছে সুতরাং, এই পরিবর্তনকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। অপপ্রচার: কেন এবং কার জন্য? প্রশ্ন উঠতে পারে—কেন এই অপপ্রচার? উত্তরটি সহজ, কিন্তু কঠিন বাস্তবতা বহন করে। যে ব্যক্তি আপসহীন সৎ নিয়মের বাইরে যায় না তিনি অনেকের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। আর তখনই শুরু হয় অপপ্রচার। হাসিব আজিজ সেই বাস্তবতার শিকার। কিন্তু ইতিহাস কখনো অপপ্রচারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, ইতিহাস দাঁড়ায় সত্যের ওপর। ভবিষ্যতের সম্ভাবনা: আইজিপি হওয়ার দিগন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হাসিব আজিজের এখনো চাকরির বয়স রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বগুণ এবং সংকট মোকাবেলার দক্ষতা বিবেচনায়, তিনি ভবিষ্যতে দেশের সর্বোচ্চ পুলিশ পদ—আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন। এটি কোনো কল্পনা নয় এটি বাস্তব সম্ভাবনা। চট্টগ্রাম একদিন উপলব্ধি করবে… আজ হয়তো সবকিছু স্পষ্ট নয়। সমালোচনা আছে, বিভ্রান্তি আছে।
কিন্তু সময়ই সত্যের সবচেয়ে বড় বিচারক। একদিন চট্টগ্রামের মানুষ ফিরে তাকাবে এবং বুঝবে কে কঠিন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিল কে নীরবে কাজ করে গিয়েছিল কে পুলিশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল পরিশেষ: নেতৃত্বের প্রকৃত সংজ্ঞা নেতৃত্ব মানে শুধু পদ নয়। নেতৃত্ব মানে— সাহস সততা দায়িত্ববোধ মানুষের প্রতি অঙ্গীকার হাসিব আজিজ সেই নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার সাময়িক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, কিন্তু তাঁর কাজই তাঁর আসল পরিচয় হয়ে থাকবে। এটি কোনো বিদায় নয়, এটি এক নতুন যাত্রার শুরু। এটি কোনো অবনমন নয়, এটি এক মর্যাদার উত্তরণ। হাসিব আজিজ—একটি নাম, একটি সময়, একটি দৃষ্টান্ত। যে দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে—সততা কখনো হারায় না, সময়মতো সে তার আলো ছড়ায়।

