
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
সকাল শুরু হয় গ্যাসের অনুপস্থিতিতে আর বিকাল গড়ায় অনিশ্চয়তার ধোঁয়ায়। চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহরগুলোতে দিনের পর দিন গ্যাস লোডশেডিং এখন আর ব্যতিক্রম নয় এটি এক ধরনের নীরব শাস্তি। রান্নাঘরে আগুন নেই অথচ রাষ্ট্রের নীতিকথার আগুনে কাগজ ভরে উঠছে। একদিকে পাইপলাইনে গ্যাস নেই অন্যদিকে সিলিন্ডার কোম্পানি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে মানুষ কার্যত জিম্মি। দাম বাড়ে নিয়ম ছাড়াই সংকট তৈরি হয় পরিকল্পনা করে আর ভুক্তভোগী হয় সাধারণ নাগরিক। দশ বছর ধরে গ্যাসহীন জীবন এখন আর ব্যতিক্রম নয় এটি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার এক ভয়াবহ স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। নিয়ম মেনে আবেদন, অর্থ জমা ও অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করার পরও দুই লাখের বেশি মানুষ গ্যাস সংযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। এটি নিছক জ্বালানির সংকট নয়, এটি নাগরিক অধিকারের প্রকাশ্য লঙ্ঘন। একদিকে উন্নয়নের গল্প অন্যদিকে ভূতুড়ে বাড়ি, দেউলিয়া পরিবার ও বেকার শ্রমিক—এই বৈপরীত্য রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যখন দিনের আলোয় লোডশেডিং চলে আর রাতের আঁধারে সিন্ডিকেট ফুলে ফেঁপে ওঠে তখন বোঝা যায় সমস্যাটি কারিগরি নয় এটি রাজনৈতিক নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন সেই নীরব যন্ত্রণার উচ্চারণ যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ রাখে না। জনগণের আর্তনাদ শোনার, দায়িত্ব পালনের এবং বৈষম্য দূর করার এখনই সময়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আবেদন, টাকা জমা, পাইপলাইন নির্মাণ ও সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ার বিরুদ্ধে এবার সরব হলেন সারাদেশের বঞ্চিত গ্রাহক ও ঠিকাদাররা। “আর নয় বৈষম্য—কেউ পাবে, কেউ পাবে না, তা হবে না”—এই দৃপ্ত শ্লোগানে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা অবিলম্বে গ্যাস সংযোগ চালু, চুলা বর্ধিতকরণ পুনরায় চালু এবং দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনের জোর দাবি জানান। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে নগরের ষোলশহর সিডিএ এভিনিউ সংলগ্ন ওমর আলী মার্কেটে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৫ সাল থেকে পেট্রোবাংলার অধীন ৬টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতায় সারাদেশে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার এবং শুধু চট্টগ্রামেই ২৫ হাজারের বেশি গ্রাহক গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন—যাদের অধিকাংশই বহু বছর আগেই ডিমান্ড নোট, নিরাপত্তা জামানত, সংযোগ ফি ও পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয় পরিশোধ করেছেন। সরকারি গেজেট অমান্য, সংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ১৮ আগস্ট ২০১৪ সালে প্রকাশিত সরকারি গেজেট ও সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের পর সর্বোচ্চ ১৮ কার্যদিবসের মধ্যেই গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গত ১০ বছর ধরে তা সম্পূর্ণভাবে অমান্য করে আসছে। বক্তারা বলেন, “একই রাষ্ট্রে বসবাস করেও কেউ গ্যাস পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে না—এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক সম-অধিকারকে পরিকল্পিতভাবে খর্ব করার শামিল।” গ্যাস সংকটে ‘ভূতুড়ে বাড়ি’, দেউলিয়ার পথে মধ্যবিত্ত সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে গ্যাস সংকটের ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। চট্টগ্রামসহ ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, ভোলা ও দেশের বিভিন্ন শহরে গ্যাস সংযোগ না থাকায় হাজার হাজার নির্মিত ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যা স্থানীয়দের ভাষায় ‘ভূতুড়ে বাড়ি’তে রূপ নিয়েছে। বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়া না পেয়ে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অনেকে ইতোমধ্যে দেউলিয়া হয়েছেন, অনেকে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ মানসিক ও আর্থিকভাবে চরম বিপর্যস্ত। চুলা বর্ধিতকরণ বন্ধে বাড়ছে নতুন বৈষম্য বিদ্যমান গ্যাস লাইনে চুলা বর্ধিতকরণ বন্ধ থাকায় নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। একই ভবনের নিচতলায় গ্যাস সংযোগ থাকলেও ওপরতলায় সম্প্রসারণ করা অংশে চুলা বসাতে না পারায় মালিকরা ভাড়া দিতে পারছেন না। বক্তারা একে “অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত” আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা চালুর দাবি জানান। ২৩০০ ঠিকাদার বেকার, হাজারো শ্রমিক কর্মহীন সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ২০১৫ সালে হঠাৎ করে বিনা নোটিশে গ্যাস সংযোগ কার্যক্রম বন্ধ রাখার ফলে সারাদেশে প্রায় ২৩০০ ঠিকাদার এবং তাদের অধীনে কর্মরত কয়েক হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে এসব পরিবার আজ মানবেতর জীবনযাপন করছে—যা উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়। এলপিজি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম বন্ধের দাবি পাইপলাইন গ্যাস বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এলপিজি নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। বক্তারা বলেন, এতে এক শ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা দাবি করেন, সরকারি ভর্তুকির আলোকে সহনীয় মূল্যে পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে এলপিজি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে। গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়, “আপনারাই জাতির বিবেক। আপনাদের লেখনী ও প্রচারের মাধ্যমেই এই বৈষম্যের চিত্র রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহলে পৌঁছাবে।” গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ প্রাপ্তিতে নাগরিকদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয়। নেতৃত্বের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন চৌধুরী, সভাপতি, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি. ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি। তিনি বলেন, “আমরা ভিক্ষা চাই না, আমরা আমাদের অধিকার চাই। বৈষম্য চলতে থাকলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।” সাধারণ সম্পাদক এ.কে.এম অলিউল্লা হক বলেন, “এই সংকট শুধু গ্যাসের নয়—এটি মানুষের জীবন, আবাসন ও অর্থনীতির সংকট।” সংবাদ সম্মেলন শেষে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকার মাধ্যমে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। প্রতিবেদকের মতামত- গ্যাস সংকট এখন আর কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রীয় অবহেলার নাম। গত এক দশক ধরে কর্ণফুলী গ্যাসসহ পেট্রোবাংলার আওতাধীন ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কার্যক্রমে যে বৈষম্য ও নিষ্ক্রিয়তা চলে আসছে, তা আজ স্পষ্টভাবে নাগরিক জীবনের মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আবেদন, অর্থ জমা, পাইপলাইন নির্মাণ—সবকিছু সম্পন্ন করার পরও লক্ষাধিক মানুষ গ্যাস সংযোগ থেকে বঞ্চিত থাকলে এটিকে আর প্রশাসনিক জটিলতা বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না; এটি সরাসরি দায়িত্বহীনতা। সাদা কালো মাল্টিমিডিয়া নিউজ হাউজের পক্ষ থেকে বিগত সময়ে চট্রল চিত্র, দি টুরিস্ট, সময়의 আলো ও দৈনিক ভোরের আওয়াজ—এই গণমাধ্যমগুলোতে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ ও ভিডিও নিউজ প্রচার করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গ্যাস সংকটের বাস্তব চিত্র, মানুষের আর্থিক বিপর্যয়, ভাঙতে বসা মধ্যবিত্ত স্বপ্ন এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্যের দলিল। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এত সংবাদ, এত তথ্য, এত মানুষের আর্তনাদ সত্ত্বেও সরকারের দায়িত্বশীল কোনো মহল কার্যকরভাবে বিষয়টি আমলে নেয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই আরও স্পষ্ট হয়েছে।একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের কাজ হলো রাষ্ট্রযন্ত্রকে সতর্ক করা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং নাগরিকদের পক্ষে কথা বলা। সেই দায়িত্ব গণমাধ্যম পালন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব পালন করেছে? গেজেট, সিটিজেন চার্টার, সংবিধানের সম-অধিকার—সবকিছু যখন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। গ্যাসের মতো মৌলিক জ্বালানি ছাড়া আবাসন ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ছে, বাড়ছে ব্যাংকঋণের বোঝা, তৈরি হচ্ছে ‘ভূতুড়ে বাড়ি’। এসবই নীরব এক সামাজিক বিপর্যয়ের লক্ষণ। আরও উদ্বেগজনক হলো, এই সংকটকে ঘিরে এলপিজি নির্ভরতা বাড়িয়ে একটি অসাধু সিন্ডিকেটের উত্থান। রাষ্ট্রীয় গ্যাস সরবরাহে নিষ্ক্রিয়তা কার স্বার্থ রক্ষা করছে—এই প্রশ্ন এখন আর অপ্রাসঙ্গিক নয়। জনগণের কষ্ট দীর্ঘায়িত হলে তার পেছনে অবহেলা ছাড়াও নীতিগত ব্যর্থতা ও স্বার্থান্বেষী যোগসাজশের সন্দেহ স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নেয়। আজকের সংবাদ সম্মেলন কেবল কিছু দাবির তালিকা নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে একটি শেষ সতর্কবার্তা। গণমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রতিবেদন যদি উপেক্ষিতই থেকে যায়, তবে নাগরিকদের মধ্যে যে ক্ষোভ জমছে, তা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সরকারকে বুঝতে হবে—গ্যাস সংকট এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়, এটি সমাধানের বিষয়। সময়মতো সিদ্ধান্ত না নিলে ইতিহাস একে ক্ষমা করবে না। এই মুহূর্তে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা। নচেৎ “উন্নয়ন” শব্দটি কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর বাস্তবে মানুষ বাঁচবে বৈষম্য আর বঞ্চনার আগুনে


