শিরোনাম
➤চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে নাগরিক ফোরামের ২৫ দফা স্মারকলিপি নাগরিক উদ্যোগকে স্বাগত কবীর ভূঁইয়ার, যানজট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান➤নদী আছে, শুধু নেই প্রাণ➤পুরো ঘটনা জেনে সালমান মুক্তাদিরের মন্তব্য করা উচিত ছিল: রাশেদ খান➤বিশেষ প্রতিবেদন দি টুরিস্ট ও চট্রল চিত্র বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের নতুন স্বপ্ন বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিতে চান তিনি কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন, চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে বঙ্গোপসাগর, কর্ণফুলী থেকে সিলেটের চা বাগান, পর্যটনকে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির শক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় মো. কামাল উদ্দিন ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রতিবছর এই দিবস পালিত হয়। পর্যটন যে শুধু মানুষের অবকাশযাপন কিংবা বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং একটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, বিশ্ব পর্যটন দিবস সেই বার্তাই সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব পর্যটন দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, দ্বীপ, হাওর, জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকসংস্কৃতি এবং মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তায় বাংলাদেশ একটি অসাধারণ পর্যটনভূমি। একদিকে কক্সবাজারের বিশাল সমুদ্রসৈকত, অন্যদিকে সুন্দরবনের গহিন অরণ্য। কোথাও পার্বত্য চট্টগ্রামের মেঘঢাকা পাহাড়, কোথাও সিলেটের সবুজ চা বাগান। কোথাও কুয়াকাটার সমুদ্র, কোথাও হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। আবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতার নানা নিদর্শন। এই বিশাল সম্ভাবনাকে আধুনিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিশ্বমানের সেবা এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বাংলাদেশের পর্যটনকে সেই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখতে চান। তাঁর পর্যটন ভাবনায় পর্যটন শুধু ভ্রমণ কিংবা বিনোদনের বিষয় নয়। পর্যটন হতে পারে কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দ্বার, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি সম্ভাবনাময় খাত এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচয় তুলে ধরার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। বিশ্ব পর্যটন দিবসে চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের পর্যটন ভাবনা চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের ভাবনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের পর্যটনকে প্রচলিত ধারণার সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে একটি আধুনিক, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, রুচিসম্মত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যটন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। একটি পর্যটনকেন্দ্র শুধু সুন্দর হলেই পর্যটন উন্নত হয় না। সেখানে যাওয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হতে হবে। পর্যটকের থাকার জন্য মানসম্মত আবাসন থাকতে হবে। নিরাপদ খাবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত স্যানিটেশন, জরুরি চিকিৎসা, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, দক্ষ গাইড, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সহজ ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একজন পর্যটক কোনো দেশে এসে কী অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত সেই দেশের পর্যটন ব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয় হয়ে ওঠে। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের নতুন উচ্চতায় নিতে হবে বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে কক্সবাজারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশাল সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি কক্সবাজারের রয়েছে পাহাড়, দ্বীপ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় সংস্কৃতি, রাখাইন ঐতিহ্য, স্থানীয় খাবার এবং মানুষের জীবনযাপনের বৈচিত্র্য। কক্সবাজারকে শুধু দেশীয় পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে রাখলে চলবে না। আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারেও কক্সবাজারের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরতে হবে। একজন বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে এসে শুধু সমুদ্রসৈকত দেখে ফিরে যাবেন না। তিনি যেন পাহাড়ে যেতে পারেন, দ্বীপ ভ্রমণ করতে পারেন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে পারেন এবং বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা অনুভব করতে পারেন, সেই ধরনের সমন্বিত পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা প্রয়োজন। কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা গেলে একজন পর্যটকের বাংলাদেশে অবস্থানের সময়ও বাড়ানো সম্ভব। চট্টগ্রাম হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম প্রবেশদ্বার বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের কথা বলতে গেলে চট্টগ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। চট্টগ্রাম একদিকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, অন্যদিকে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, দ্বীপ, উপকূল, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়। কর্ণফুলী নদী, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, সীতাকুণ্ড, চন্দ্রনাথ, মিরসরাইয়ের পাহাড় ও জলপ্রপাত, বাঁশখালীর উপকূল, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিস্তৃত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে সমন্বিত করে একটি বড় পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামকে শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের শহর হিসেবে নয়, বাংলাদেশের পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবেও নতুন করে ভাবতে হবে। কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা কর্ণফুলী শুধু একটি নদী নয়। এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই নদীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, নদীর তীরের সৌন্দর্যায়ন, সাংস্কৃতিক আয়োজন, স্থানীয় খাবার এবং চট্টগ্রামের ইতিহাসকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কর্ণফুলী নিজেই একটি আকর্ষণীয় পর্যটন পণ্যে পরিণত হতে পারে। একজন বিদেশি পর্যটক কর্ণফুলীতে নৌভ্রমণ করবেন, চট্টগ্রামের ইতিহাস জানবেন, বন্দর দেখবেন, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেবেন এবং পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। এমন একটি সমন্বিত পর্যটন অভিজ্ঞতা চট্টগ্রামের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে প্রকৃতি ও সংস্কৃতি পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদের অন্যতম বড় ভাণ্ডার। পাহাড়, মেঘ, ঝরনা, লেক, বন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, ঐতিহ্যবাহী খাবার, পোশাক, সংস্কৃতি ও উৎসব সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটন অঞ্চলে পরিণত করা সম্ভব। তবে পাহাড়ি পর্যটনের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে। পর্যটনের নামে পাহাড় ও প্রকৃতি ধ্বংস নয়, বরং প্রকৃতিকে রক্ষা করেই পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হবে। সুন্দরবন বাংলাদেশের অমূল্য পর্যটন সম্পদ সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। বাঘ, হরিণ, কুমির, পাখি, নদী, খাল, গাছপালা এবং জোয়ারভাটার অনন্য জীবন সুন্দরবনকে একটি অসাধারণ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে। সুন্দরবনে পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। পর্যটকের সংখ্যা, নৌযান চলাচল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সিলেটের চা বাগান ও হাওরেও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা সমুদ্র ও পাহাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সিলেটের চা বাগান, জাফলং, রাতারগুল এবং হাওরাঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অনন্য আকর্ষণ হতে পারে। বর্ষায় হাওরের বিশাল জলরাশি এবং শুষ্ক মৌসুমে তার পরিবর্তিত রূপ পর্যটকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। নৌভ্রমণ, স্থানীয় খাবার, লোকসংস্কৃতি এবং গ্রামীণ জীবনযাপনের সঙ্গে পর্যটকদের পরিচিত করা গেলে হাওরভিত্তিক পর্যটন একটি নতুন সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে বাংলাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার, জমিদারবাড়ি এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, বাগেরহাটসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্যাকেজের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। একজন বিদেশি পর্যটক শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা দেখতে চান না। তিনি জানতে চান সেই স্থাপনার ইতিহাস, নির্মাণের গল্প, মানুষের জীবন এবং সেই সভ্যতার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সম্পর্ক। তাই পর্যটনে গল্প বলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। স্থানীয় খাবারও হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ড বাংলাদেশের খাবারের বৈচিত্র্য বিশ্ব পর্যটনের একটি আকর্ষণীয় সম্পদ হতে পারে। চট্টগ্রামের মেজবানি, কালাভুনা, শুঁটকি ও সামুদ্রিক খাবার, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার, সিলেটের বিভিন্ন খাবার, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার, বাংলাদেশের মিষ্টি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় কৃষিপণ্যকে পর্যটনের অংশ করা সম্ভব। পর্যটক একটি দেশকে শুধু চোখ দিয়ে দেখেন না, অনেক সময় খাবারের স্বাদের মধ্য দিয়েও একটি দেশকে মনে রাখেন। তাই বাংলাদেশের স্থানীয় খাবারকে পরিচ্ছন্নতা, মান এবং নান্দনিক পরিবেশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা প্রয়োজন। পর্যটনের সুফল পৌঁছাতে হবে স্থানীয় মানুষের ঘরে পর্যটন উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো স্থানীয় জনগণকে এর অংশীদার করা। একটি পর্যটনকেন্দ্রে হোটেল তৈরি হলো, রাস্তা হলো, পর্যটক এলেন, কিন্তু স্থানীয় মানুষ যদি অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত না হন, তাহলে সেই পর্যটন উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গ অর্থে টেকসই হবে না। স্থানীয় তরুণদের পর্যটন গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় নারীদের হস্তশিল্প, খাবার, হোমস্টে এবং ক্ষুদ্র পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় কৃষক, জেলে, মাঝি, কারিগর এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটনের সুফল প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাবে। তরুণরাই হতে পারেন পর্যটনের নতুন দূত বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী পর্যটন শিল্পের বড় শক্তি। বিদেশি ভাষা, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, গাইডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফটোগ্রাফি, ভিডিও নির্মাণ এবং আতিথেয়তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের পর্যটন শিল্পে যুক্ত করা গেলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একজন দক্ষ পর্যটন গাইড শুধু একজন গাইড নন। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার একজন দূত। নারীর জন্যও খুলে যেতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের দরজা পর্যটন শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, হোমস্টে, পর্যটন গাইড, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, অনলাইন পর্যটন ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের যুক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের পর্যটনকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে পর্যটন শুধু অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখবে। পর্যটনকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় খাতে পরিণত করতে হবে আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, বিনোদনকেন্দ্র, নৌপর্যটন, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, ইকো ট্যুরিজম, ওয়েলনেস পর্যটন এবং সম্মেলন পর্যটনে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ প্রক্রিয়া, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা গেলে পর্যটন শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। ডিজিটাল পর্যটন হবে আগামী দিনের বাস্তবতা বিশ্বের পর্যটন ব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। বাংলাদেশকেও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসার আগেই যেন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে যাবেন, কোথায় খাবেন, কত খরচ হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে কোথায় যোগাযোগ করবেন, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডিজিটাল ম্যাপ, বহুভাষিক ওয়েবসাইট, পর্যটন অ্যাপ এবং ভার্চুয়াল পর্যটন নির্দেশনা বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও আধুনিক করতে পারে। নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাই পর্যটনের ভিত্তি পর্যটন যতই সুন্দর হোক, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার অভাব থাকলে পর্যটকের অভিজ্ঞতা পূর্ণতা পায় না। পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকবান্ধব আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধার ব্যবস্থা, তথ্য সহায়তা, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যটকের কাছে বাংলাদেশের সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের আচরণ ও সেবার মানও দেশের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠবে। পরিবেশ রক্ষা ছাড়া পর্যটনের ভবিষ্যৎ নেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ হচ্ছে প্রকৃতি। তাই পর্যটনের নামে পাহাড় কাটা, নদী দখল, বন ধ্বংস, সৈকত দূষণ কিংবা জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা যাবে না। পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতি থাকবে, পর্যটক আসবেন, স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একই সৌন্দর্য উপভোগ করবে, এমন ভারসাম্যপূর্ণ পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নদী ও জলভিত্তিক পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা নদীমাতৃক বাংলাদেশকে নদীভিত্তিক পর্যটনের দেশ হিসেবেও বিশ্বের সামনে তুলে ধরা সম্ভব। কর্ণফুলী, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কুশিয়ারা এবং দেশের অসংখ্য নদী ও জলাভূমিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন এবং স্থানীয় জীবনযাপনের সঙ্গে পর্যটকদের পরিচিত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের একটি আধুনিক নদী পর্যটন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে এটি দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। মেডিকেল, ওয়েলনেস ও সম্মেলন পর্যটনের সম্ভাবনা পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে মেডিকেল ও ওয়েলনেস পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ব্যবসায়িক সভা, প্রদর্শনী ও করপোরেট আয়োজনের সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করা সম্ভব। একজন ব্যবসায়ী বা সম্মেলনের অতিথি বাংলাদেশে এসে যদি একই সফরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সুন্দরবন কিংবা অন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্র ভ্রমণ করেন, তাহলে ব্যবসা ও পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে। পর্যটন সার্কিট গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশের পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে আন্তঃআঞ্চলিক পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার মধ্যে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার। কক্সবাজার থেকে বান্দরবান। বান্দরবান থেকে রাঙামাটি। চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই। খুলনা থেকে সুন্দরবন ও বাগেরহাট। সিলেট থেকে জাফলং, রাতারগুল ও হাওর। ঢাকা থেকে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। এভাবে একাধিক পর্যটনকেন্দ্রকে একটি প্যাকেজে যুক্ত করা গেলে পর্যটকের বাংলাদেশে অবস্থানের সময় বাড়বে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল ছড়িয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ে নতুন বাংলাদেশ বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে শুধু সস্তা পর্যটন গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে। এটি নদীর দেশ। এটি সমুদ্রের দেশ। এটি পাহাড়ের দেশ। এটি সুন্দরবনের দেশ। এটি হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দেশ। এটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির দেশ। এটি অতিথিপরায়ণ মানুষের দেশ। এই গল্পকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিশ্ব পর্যটন মেলার মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও বাড়াতে হবে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, তথ্যচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যটন সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে। কারণ স্থানীয় সাংবাদিকরা তাঁদের এলাকার প্রকৃতি, ইতিহাস, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে গভীরভাবে তুলে ধরতে পারেন। পর্যটন উন্নয়নে গবেষণা প্রয়োজন কোন দেশের পর্যটক বাংলাদেশে আসতে চান? তাঁরা কী দেখতে চান? কতদিন থাকতে চান? কত টাকা ব্যয় করতে আগ্রহী? কোন পর্যটনকেন্দ্র তাঁদের বেশি আকর্ষণ করে? কেন অনেক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসে অল্প সময়ের মধ্যে ফিরে যান? এসব প্রশ্নের উত্তর গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। পর্যটন উন্নয়নে নিয়মিত পর্যটক জরিপ, বাজার গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রবণতা বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। সামনে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের পর্যটন ভাবনায় একটি আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন রয়েছে। যেখানে কক্সবাজার হবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। সুন্দরবন হবে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র। পার্বত্য চট্টগ্রাম হবে প্রকৃতি, অ্যাডভেঞ্চার ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটনের অন্যতম ক্ষেত্র। সিলেট হবে চা, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অনন্য গন্তব্য। চট্টগ্রাম হবে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন্দর ও ঐতিহ্যের সমন্বিত পর্যটন প্রবেশদ্বার। দেশের প্রতিটি অঞ্চল তার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্ব পর্যটনের সামনে নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরবে। প্রয়োজন সম্মিলিত জাতীয় উদ্যোগ বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বেসরকারি বিনিয়োগকারী, পর্যটন ব্যবসায়ী, হোটেল রেস্তোরাঁ শিল্প, পরিবহন খাত, স্থানীয় জনগণ এবং গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ। পর্যটনের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। প্রয়োজন পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। প্রয়োজন পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয় বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের সম্পদ তৈরি করতে হবে না। প্রকৃতি আমাদের সম্পদ দিয়েছে। আমাদের রয়েছে সমুদ্র। আমাদের রয়েছে পাহাড়। আমাদের রয়েছে নদী। আমাদের রয়েছে সুন্দরবন। আমাদের রয়েছে দ্বীপ। আমাদের রয়েছে হাওর। আমাদের রয়েছে ইতিহাস। আমাদের রয়েছে ঐতিহ্য। আমাদের রয়েছে সংস্কৃতি। আমাদের রয়েছে জীববৈচিত্র্য। আর রয়েছে মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা। এখন প্রয়োজন এই সম্পদকে আধুনিক পরিকল্পনা, বিশ্বমানের অবকাঠামো, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত কর➤“বিশ্ব পর্যটন দিবস: চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের পর্যটনের নতুন দিগন্ত-➤হাটহাজারীতে বিদেশি পিস্তল ও ওয়ান শুটারগানসহ গ্রেপ্তার ১➤জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বাজারে বাড়ছে পণ্যের দাম, দুশ্চিন্তায় মানুষ➤চট্টগ্রাম রেঞ্জে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী অপরাধের অন্ধকারে আলোর সন্ধান, মাঠে নেমেই কঠোরতার বার্তা➤রাউজানে মানব কল্যাণে ধম্মকথার ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন➤বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি ৫৬ বছরের ঐতিহ্য, হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং বোয়ালখালীবাসীর প্রত্যাশা

― Advertisement ―

চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে নাগরিক ফোরামের ২৫ দফা স্মারকলিপি নাগরিক উদ্যোগকে স্বাগত কবীর ভূঁইয়ার, যানজট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মহানগরীর অসহনীয় যানজট নিরসন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন ও কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের...

“১০ বছরেও গ্যাস নেই—২ লাখের বেশি গ্রাহকের আর্তনাদ: ‘আর নয় বৈষম্য’ স্লোগানে চট্টগ্রামে বিস্ফোরক সংবাদ সম্মেলনঃ

Homeচট্টগ্রাম"১০ বছরেও গ্যাস নেই—২ লাখের বেশি গ্রাহকের আর্তনাদ: ‘আর নয় বৈষম্য’ স্লোগানে...

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
সকাল শুরু হয় গ্যাসের অনুপস্থিতিতে আর বিকাল গড়ায় অনিশ্চয়তার ধোঁয়ায়। চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহরগুলোতে দিনের পর দিন গ্যাস লোডশেডিং এখন আর ব্যতিক্রম নয় এটি এক ধরনের নীরব শাস্তি। রান্নাঘরে আগুন নেই অথচ রাষ্ট্রের নীতিকথার আগুনে কাগজ ভরে উঠছে। একদিকে পাইপলাইনে গ্যাস নেই অন্যদিকে সিলিন্ডার কোম্পানি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে মানুষ কার্যত জিম্মি। দাম বাড়ে নিয়ম ছাড়াই সংকট তৈরি হয় পরিকল্পনা করে আর ভুক্তভোগী হয় সাধারণ নাগরিক। দশ বছর ধরে গ্যাসহীন জীবন এখন আর ব্যতিক্রম নয় এটি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার এক ভয়াবহ স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। নিয়ম মেনে আবেদন, অর্থ জমা ও অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করার পরও দুই লাখের বেশি মানুষ গ্যাস সংযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। এটি নিছক জ্বালানির সংকট নয়, এটি নাগরিক অধিকারের প্রকাশ্য লঙ্ঘন। একদিকে উন্নয়নের গল্প অন্যদিকে ভূতুড়ে বাড়ি, দেউলিয়া পরিবার ও বেকার শ্রমিক—এই বৈপরীত্য রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যখন দিনের আলোয় লোডশেডিং চলে আর রাতের আঁধারে সিন্ডিকেট ফুলে ফেঁপে ওঠে তখন বোঝা যায় সমস্যাটি কারিগরি নয় এটি রাজনৈতিক নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন সেই নীরব যন্ত্রণার উচ্চারণ যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ রাখে না। জনগণের আর্তনাদ শোনার, দায়িত্ব পালনের এবং বৈষম্য দূর করার এখনই সময়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আবেদন, টাকা জমা, পাইপলাইন নির্মাণ ও সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ার বিরুদ্ধে এবার সরব হলেন সারাদেশের বঞ্চিত গ্রাহক ও ঠিকাদাররা। “আর নয় বৈষম্য—কেউ পাবে, কেউ পাবে না, তা হবে না”—এই দৃপ্ত শ্লোগানে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা অবিলম্বে গ্যাস সংযোগ চালু, চুলা বর্ধিতকরণ পুনরায় চালু এবং দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনের জোর দাবি জানান। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে নগরের ষোলশহর সিডিএ এভিনিউ সংলগ্ন ওমর আলী মার্কেটে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৫ সাল থেকে পেট্রোবাংলার অধীন ৬টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতায় সারাদেশে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার এবং শুধু চট্টগ্রামেই ২৫ হাজারের বেশি গ্রাহক গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন—যাদের অধিকাংশই বহু বছর আগেই ডিমান্ড নোট, নিরাপত্তা জামানত, সংযোগ ফি ও পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয় পরিশোধ করেছেন। সরকারি গেজেট অমান্য, সংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ১৮ আগস্ট ২০১৪ সালে প্রকাশিত সরকারি গেজেট ও সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের পর সর্বোচ্চ ১৮ কার্যদিবসের মধ্যেই গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গত ১০ বছর ধরে তা সম্পূর্ণভাবে অমান্য করে আসছে। বক্তারা বলেন, “একই রাষ্ট্রে বসবাস করেও কেউ গ্যাস পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে না—এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক সম-অধিকারকে পরিকল্পিতভাবে খর্ব করার শামিল।” গ্যাস সংকটে ‘ভূতুড়ে বাড়ি’, দেউলিয়ার পথে মধ্যবিত্ত সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে গ্যাস সংকটের ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। চট্টগ্রামসহ ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, ভোলা ও দেশের বিভিন্ন শহরে গ্যাস সংযোগ না থাকায় হাজার হাজার নির্মিত ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যা স্থানীয়দের ভাষায় ‘ভূতুড়ে বাড়ি’তে রূপ নিয়েছে। বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়া না পেয়ে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অনেকে ইতোমধ্যে দেউলিয়া হয়েছেন, অনেকে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ মানসিক ও আর্থিকভাবে চরম বিপর্যস্ত। চুলা বর্ধিতকরণ বন্ধে বাড়ছে নতুন বৈষম্য বিদ্যমান গ্যাস লাইনে চুলা বর্ধিতকরণ বন্ধ থাকায় নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। একই ভবনের নিচতলায় গ্যাস সংযোগ থাকলেও ওপরতলায় সম্প্রসারণ করা অংশে চুলা বসাতে না পারায় মালিকরা ভাড়া দিতে পারছেন না। বক্তারা একে “অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত” আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা চালুর দাবি জানান। ২৩০০ ঠিকাদার বেকার, হাজারো শ্রমিক কর্মহীন সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ২০১৫ সালে হঠাৎ করে বিনা নোটিশে গ্যাস সংযোগ কার্যক্রম বন্ধ রাখার ফলে সারাদেশে প্রায় ২৩০০ ঠিকাদার এবং তাদের অধীনে কর্মরত কয়েক হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে এসব পরিবার আজ মানবেতর জীবনযাপন করছে—যা উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়। এলপিজি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম বন্ধের দাবি পাইপলাইন গ্যাস বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এলপিজি নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। বক্তারা বলেন, এতে এক শ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা দাবি করেন, সরকারি ভর্তুকির আলোকে সহনীয় মূল্যে পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে এলপিজি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে। গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়, “আপনারাই জাতির বিবেক। আপনাদের লেখনী ও প্রচারের মাধ্যমেই এই বৈষম্যের চিত্র রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহলে পৌঁছাবে।” গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ প্রাপ্তিতে নাগরিকদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয়। নেতৃত্বের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন চৌধুরী, সভাপতি, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি. ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি। তিনি বলেন, “আমরা ভিক্ষা চাই না, আমরা আমাদের অধিকার চাই। বৈষম্য চলতে থাকলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।” সাধারণ সম্পাদক এ.কে.এম অলিউল্লা হক বলেন, “এই সংকট শুধু গ্যাসের নয়—এটি মানুষের জীবন, আবাসন ও অর্থনীতির সংকট।” সংবাদ সম্মেলন শেষে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকার মাধ্যমে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। প্রতিবেদকের মতামত- গ্যাস সংকট এখন আর কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রীয় অবহেলার নাম। গত এক দশক ধরে কর্ণফুলী গ্যাসসহ পেট্রোবাংলার আওতাধীন ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কার্যক্রমে যে বৈষম্য ও নিষ্ক্রিয়তা চলে আসছে, তা আজ স্পষ্টভাবে নাগরিক জীবনের মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আবেদন, অর্থ জমা, পাইপলাইন নির্মাণ—সবকিছু সম্পন্ন করার পরও লক্ষাধিক মানুষ গ্যাস সংযোগ থেকে বঞ্চিত থাকলে এটিকে আর প্রশাসনিক জটিলতা বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না; এটি সরাসরি দায়িত্বহীনতা। সাদা কালো মাল্টিমিডিয়া নিউজ হাউজের পক্ষ থেকে বিগত সময়ে চট্রল চিত্র, দি টুরিস্ট, সময়의 আলো ও দৈনিক ভোরের আওয়াজ—এই গণমাধ্যমগুলোতে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ ও ভিডিও নিউজ প্রচার করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গ্যাস সংকটের বাস্তব চিত্র, মানুষের আর্থিক বিপর্যয়, ভাঙতে বসা মধ্যবিত্ত স্বপ্ন এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্যের দলিল। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এত সংবাদ, এত তথ্য, এত মানুষের আর্তনাদ সত্ত্বেও সরকারের দায়িত্বশীল কোনো মহল কার্যকরভাবে বিষয়টি আমলে নেয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই আরও স্পষ্ট হয়েছে।একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের কাজ হলো রাষ্ট্রযন্ত্রকে সতর্ক করা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং নাগরিকদের পক্ষে কথা বলা। সেই দায়িত্ব গণমাধ্যম পালন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব পালন করেছে? গেজেট, সিটিজেন চার্টার, সংবিধানের সম-অধিকার—সবকিছু যখন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। গ্যাসের মতো মৌলিক জ্বালানি ছাড়া আবাসন ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ছে, বাড়ছে ব্যাংকঋণের বোঝা, তৈরি হচ্ছে ‘ভূতুড়ে বাড়ি’। এসবই নীরব এক সামাজিক বিপর্যয়ের লক্ষণ। আরও উদ্বেগজনক হলো, এই সংকটকে ঘিরে এলপিজি নির্ভরতা বাড়িয়ে একটি অসাধু সিন্ডিকেটের উত্থান। রাষ্ট্রীয় গ্যাস সরবরাহে নিষ্ক্রিয়তা কার স্বার্থ রক্ষা করছে—এই প্রশ্ন এখন আর অপ্রাসঙ্গিক নয়। জনগণের কষ্ট দীর্ঘায়িত হলে তার পেছনে অবহেলা ছাড়াও নীতিগত ব্যর্থতা ও স্বার্থান্বেষী যোগসাজশের সন্দেহ স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নেয়। আজকের সংবাদ সম্মেলন কেবল কিছু দাবির তালিকা নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে একটি শেষ সতর্কবার্তা। গণমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রতিবেদন যদি উপেক্ষিতই থেকে যায়, তবে নাগরিকদের মধ্যে যে ক্ষোভ জমছে, তা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সরকারকে বুঝতে হবে—গ্যাস সংকট এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়, এটি সমাধানের বিষয়। সময়মতো সিদ্ধান্ত না নিলে ইতিহাস একে ক্ষমা করবে না। এই মুহূর্তে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা। নচেৎ “উন্নয়ন” শব্দটি কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর বাস্তবে মানুষ বাঁচবে বৈষম্য আর বঞ্চনার আগুনে