চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার: অতীতের গৌরব, বর্তমানের দৃ

0
125

মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম কারাগার নিয়ে লিখতে বসলে মনে পড়ে বহু স্মৃতির ভিড়। সময়টা ছিল ১৯৯৭-৯৮ সাল। তখন জেল সুপার আজিজ সাহেব এবং জেলার আক্কাস আলী আখন্দ সাহেব দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময়েই আমি নিয়মিতভাবে লিখতাম দৈনিক খবরে—ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছি কারাগারের অব্যবস্থা, বন্দিদের মানবাধিকার পরিস্থিতি, এবং একটি আধুনিক, মানবিক কারাগার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা। সে সময়ের সেই লেখালেখি কেবল তৎকালীন প্রশাসনকে নাড়া দেয়নি, বরং সমাজে কারা ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জোরালো করেছিল।
আজকের যে উন্নত, পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ চট্টগ্রাম কারাগার—তার পেছনে নিঃসন্দেহে বহু মানুষের শ্রম রয়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সেই সময়ে আমার নিরলস কলমযুদ্ধ, জনমত তৈরি ও প্রতিবেদনধর্মী লেখার একটি বিশেষ অবদান রয়েছে এই অগ্রগতির ভিত রচনায়। আজ যিনি জেলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি ২০০৬ সালের ১/১১ সংকটময় সময়েও জেলার হিসেবে ছিলেন চট্টগ্রাম কারাগারে। তখন পরিস্থিতি ছিল কঠিন, রাজনৈতিকভাবে অস্থির। তবু তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে। এখন, আবার এক নতুন কঠিন সময় চলছে, তবে একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়—তিনি অত্যন্ত শৃঙ্খলিত ও মানবিকভাবে কারাগার পরিচালনা করছেন। চট্টগ্রাম কারাগারের এই দীর্ঘ পথচলায় একসময় যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আজ তা অনেকটাই বাস্তব রূপ পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে কিছু স্মৃতি ও বিশ্লেষণ তুলে ধরতে চাই—কারণ ইতিহাস শুধু স্মরণ করার জন্য নয়, ভবিষ্যতের পথনির্দেশও বটে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারাগার, যা চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থলে কোতোয়ালী থানার লালদীঘির পূর্ব পাশে অবস্থিত। বন্দির সংখ্যার দিক থেকে এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কারাগার হিসেবে পরিচিত। এটি শুধু একটি বন্দী রাখার স্থান নয়, বরং একটি পুনর্বাসন ও সংশোধনমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কারাগারটির যাত্রা শুরু হয় ১৮৮৫ সালে, যখন এটি “চট্টগ্রাম জেলা কারাগার” নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে, ১৯৯৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এটিকে “চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার” হিসেবে উন্নীত করা হয়। এ কারাগার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী, বিশেষত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন এবং তার সহযোদ্ধা তারকেশ্বর দস্তিদারকে এই কারাগারেই ফাঁসি দেওয়া হয়, যা ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।
বর্তমানে এই কারাগার পরিচালিত হচ্ছে অভিজ্ঞ ও দক্ষ একজন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন-এর নেতৃত্বে, যিনি ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে সিনিয়র জেল সুপার হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি এর আগে ১/১১ সময়কালে এই কারাগারে জেলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অভিজ্ঞতা, নিষ্ঠা ও মানবিক নেতৃত্বে তিনি কারাগারটিকে একটি মডেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কারাগারের মূল নীতিবাক্য “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ”—এই দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে প্রতিটি উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারটি ১৬.৮৭ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ভূমি ১১.৫৫ একর এবং বহিঃস্থ ভূমি ৫.৩২ একর। কারাভ্যন্তরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ:পাঁচতলা বিশিষ্ট কয়েদী ব্যারাক: ৬টি,কনডেম সেল: ২টি মহিলা ব্যারাক (সাজাপ্রাপ্ত ও হাজতীদের জন্য পৃথক) শিশু-কিশোর ব্যারাক ১০০ শয্যার হাসপাতাল রান্নাঘর, বাথিং প্ল্যাটফর্ম, ওয়ার্কশেড, লাইব্রেরি, কেইস টেবিল ইত্যাদি,কারা চত্বরের বাইরে: ডিআইজি প্রিজন্স অফিস ও বাসভবন সিনিয়র জেল সুপারের বাসভবন একতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন
স্কুল, মসজিদ, দরবার হল, রিক্রিয়েশন হল
রান্নাঘর, গুদাম, পুরাতন অফিস ও কিছু পরিত্যক্ত স্থাপনা, বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ও পাম্প হাউজ, কারাগারে মোট অনুমোদিত পদসংখ্যা ৩৪৩ জন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদসমূহ হলো: সিনিয়র জেল সুপার: ১ জন,জেলার ও ডেপুটি জেলার: ৬ জন,কারারক্ষী: ২৮৪ জন,মহিলা কারারক্ষী: ১০ জন,চিকিৎসা, হিসাব, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সহায়তাকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ।চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের অনুমোদিত বন্দী ধারণক্ষমতা ১৭১৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৫৬৮ জন এবং মহিলা ১৪৫ জন।–এই কারাগারে কয়েদীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বিভিন্ন উৎপাদন কার্যক্রম চালু রয়েছে। কয়েদীরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন করে থাকেন:
কয়েদীদের ব্যবহারের কাপড়,বাঁশ ও প্লাস্টিকের তৈরি মোড়া, ঝুড়ি, ঢাকন নকশী কাঁথা সহ বিভিন্ন হস্তশিল্প –কারা বাগানে বন্দীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে মৌসুমি শাকসবজি ও ফসল উৎপাদন করা হয়, যেমন: লাউ, বেগুন, শালগম, মূলা, ফুলকপি, বাধাকপি, পালংশাক, ডাটা শাক, কপি ইত্যাদি,চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার শুধু ইতিহাসের একটি নিদর্শন নয়, বরং একটি আধুনিক, মানবিক ও সংস্কারমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন-এর অভিজ্ঞ নেতৃত্বে এই প্রতিষ্ঠানটি বন্দীদের শুধু নিরাপদে রাখছে না, বরং আলোর পথে পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে একটি দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছে। দেশের কারা ব্যবস্থায় এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here