মো. কামাল উদ্দিনঃ
সাংবাদিক, কলাম লেখক ও সমাজচিন্তক
সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। গণমানুষের কথা বলা, সমাজের অন্যায়-অবিচারের মুখোশ উন্মোচন করা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সাংবাদিকরা যুগে যুগে ছিলেন সমাজের অগ্রদূত। অথচ আজ, আমরা এমন এক ভয়ানক বাস্তবতার মুখোমুখি—যেখানে সাংবাদিকতার নামধারী কিছু দানব ‘প্রেস’ লেখা পরিচয়পত্রকে অস্ত্র বানিয়ে মানুষের গোপনীয়তা, মর্যাদা ও মানবাধিকারকে নির্লজ্জভাবে পদদলিত করছে। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে একটি গেস্ট হাউসে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক ঘটনা তার একটি নির্মম দৃষ্টান্ত। ঘটনার বিবরণ: চট্টগ্রামের গেস্ট হাউসে সাংবাদিক পরিচয়ের ‘অভিযান’
২০২৫ সালের ১৫ জুন দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি সংবাদে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। “হান্নান রহিম তালুকদার” নামের একজন ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় একটি গেস্ট হাউসে ক্যামেরা হাতে ঢুকে কক্ষে কক্ষে তল্লাশি চালান। শুধু তল্লাশি নয়, রীতিমতো জেরা, হুমকি, পরিচয় যাচাই, এমনকি দম্পতির বিয়ের প্রমাণ চাওয়ার মতো কাজও করেন তিনি। বিষয়টি একটি ১৫ মিনিটের ভিডিওতে ধরা পড়ে, যা তার ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করার পর মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিওতে দেখা যায়—এই ব্যক্তি কখনো রেজিস্ট্রার খাতা দেখছেন, কখনো দরজায় কড়া নাড়ে কক্ষে ঢুকছেন, কখনো দম্পতিকে মুখোমুখি বসিয়ে প্রশ্ন করছেন—”আপনারা কি স্বামী-স্ত্রী? প্রমাণ কী?”
এ যেন কোনো পুলিশি অভিযান নয়, বরং নোংরা voyeurism—অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে অবৈধ ও অনৈতিক অনুপ্রবেশ!সাংবাদিকতার মুখোশ পরা অসৎ চক্র
এই ঘটনা শুধু একজন ‘হান্নান’ নামক ব্যক্তির কাহিনি নয়, এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে উঁকি দেওয়া এক ভয়ানক ব্যাধির নাম। আজ দেশে এমন অসংখ্য ‘সাংবাদিক’ রয়েছে, যাদের কোনো মিডিয়া অফিস নেই, নেই কোনো সাংবাদিকতা শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড, নেই কোনো সম্পাদনা বোর্ড বা নিয়মিত সংবাদ প্রকাশনার ট্র্যাক রেকর্ড। আছে শুধু একটা প্রেস লেখা কার্ড, একটা ফেসবুক পেজ, কিছু ব্যানার পোস্টার আর দৃষ্টিকটূ ছবি—যার পেছনে লুকিয়ে আছে চাঁদাবাজি, দালালি, দেহব্যবসা, এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের গল্প।
ব্ল্যাকমেইলিং ও দেহব্যবসার ছত্রছায়ায় সাংবাদিকতার নাম
গেস্ট হাউস, হোটেল, ক্লাব, স্পা—এই সব জায়গায় এই চক্রের ‘তল্লাশি অভিযান’ বেশ পরিচিত দৃশ্য। তারা সাংবাদিক পরিচয়ে ঢুকে কক্ষে কক্ষে গিয়ে তরুণ-তরুণীদের ছবি তোলে, ভিডিও করে, তারপর সামাজিক সম্মান নষ্ট করার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করে। একরকম ‘সাংবাদিক-সোর্স-পুলিশ’ চক্র গড়ে উঠেছে, যেখানে পুলিশও অনেক সময় তাদের সহযোগী হয়।
এরা জানে কোথায় অবৈধ প্রেম চলছে, কোথায় ‘ম্যাচিউরড’ ক্লায়েন্ট, কোথায় দাম্পত্য সম্পর্ক প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। এসব গোপনীয়তা ভেঙে তারা টাকা কামায়। গেস্ট হাউস মালিকদের সঙ্গেও চলে আপোষ—যদি মাসোয়ারা না দেয়া হয়, তাহলে হানা, ক্যামেরা ও পুলিশ—সব চলে আসে।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের নাম ব্যবহার: সুনামহানির আরেক দিক
ঘটনাটির আরেকটি দুঃখজনক দিক হলো, অভিযুক্ত হান্নান নিজেকে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন—যা তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন—এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ব্যবহার করে এমন অপসাংবাদিকরা নিজেদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করার চেষ্টা করে। অথচ বাস্তবে তারা সাংবাদিকতার মানদণ্ডের ধারে কাছেও নেই।
একজন আসল সাংবাদিক যদি অনৈতিক কাজ করেন, সেটাও সমালোচনাযোগ্য। কিন্তু এরা তো সাংবাদিকই নন—সাংবাদিকতার নামে ‘বহুরূপী’ প্রতারক!
এই চক্রের কাজের ধরন
১. ফেসবুক পেজে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করে নিজেরাই ‘চেয়ারম্যান’, ‘সম্পাদক’, ‘বার্তা প্রধান’ হয়ে বসে।
২. মিডিয়ার পরিচয়পত্র প্রিন্ট করে বিভিন্ন স্থানে ঢুকে পড়ে।
৩. ভুয়া রিপোর্টিংয়ের নামে ছবি তোলে, ভিডিও করে, এবং জনসাধারণকে ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে।
৪. অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সহায়তা নেয়।
৫.গেস্ট হাউস, জুয়ার আসর, মাদকের আস্তানা এবং অবৈধ স্পাগুলোতেই এদের প্রবেশ বেশি।
৬.নিজেদের ‘সোর্স’ বলে পুলিশের কাজেও ঢুকে পড়ে, যেন আইনের চেয়ে উঁচুতে উঠে দাঁড়াতে পারে।
কীভাবে রক্ষা করা যাবে সাংবাদিকতার সুনাম?
আইনগত ব্যবস্থা:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত সাংবাদিক নামধারী এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। শুধুমাত্র ভিডিও ভাইরাল হলেই নয়, আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ চাইলে প্রেস কাউন্সিলের সহযোগিতা নিয়ে একযোগে অভিযান চালাতে পারে।
প্রেস কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হোক:
যে কেউ সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করতে চাইলে তাকে অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন ও ভেরিফিকেশন করতে হবে। নয়তো সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে ক্লিয়ার অবস্থান নিতে হবে:
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত প্রেস ক্লাবের নাম অপব্যবহারকারীদের তালিকা তৈরি করে প্রকাশ করা এবং জনসচেতনতা গড়ে তোলা।
মিডিয়া হাউসগুলোর নৈতিক অবস্থান প্রয়োজন:
কোনো গণমাধ্যম যেন এমন ভুয়া লোকদের ঠাঁই না দেয়। সম্পাদকরা যেন দায়বদ্ধ হন এবং সাংবাদিকতা পেশার আদর্শকে নষ্ট না করেন।
জনগণের সচেতনতা:
সাধারণ মানুষকেও বুঝতে হবে—প্রেস লেখা কার্ড দেখালেই সে সাংবাদিক নন। সন্দেহ হলে তথ্য যাচাই করা, ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ, এবং পুলিশে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।উপসংহার: সত্যিকারের সাংবাদিকতার প্রয়োজনে
আজ দরকার সাহসী কলম, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ হৃদয় এবং সাংবাদিকতার পবিত্রতাকে আগলে রাখা কিছু মানুষের প্রতিরোধ। গেস্ট হাউসে গিয়ে নারী-পুরুষের দাম্পত্য জীবনের প্রমাণ চাওয়া, তাদের নাম ধরে ধরে পরিচয় চাওয়া, ভিডিও করে সামাজিকভাবে হেয় করা—এটা পেশা নয়, বরং অপরাধ। আর যদি সেটি সাংবাদিক পরিচয়ে হয়, তবে সেটা শুধু ব্যক্তি অপরাধ নয়—পেশার বিরুদ্ধেও এক নির্মম ষড়যন্ত্র।
সাংবাদিকতা যদি সমাজের চেতনার বাতিঘর হয়, তবে এর আলো নিভিয়ে দেওয়া এমন ছায়াপুরুষদের চিনে ফেলতে হবে—আজ, এক্ষুণি।
লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাহিত্যিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।
(এই লেখার প্রতিটি শব্দ দেশের সকল সৎ সাংবাদিক, সত্য অন্বেষী যুবক এবং ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে এক বিবেকের উচ্চারণ।)
