মো. কামাল উদ্দিনঃ
ধানমন্ডির শান্ত সড়ক। গাছপালায় ঢাকা রোদেলা বিকেল। অথচ এই প্রশান্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে বেদনার অগ্নিঝরা ইতিহাস—যা একদিন কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো জাতিকে। ৩২ নম্বর রোডের সেই বাড়ি, একসময় যার ঠিকানা ছিল ৬৭৭ নম্বর, এখন পরিচিত—বাড়ি নং ১০, রোড নং ১১, ধানমন্ডি। বুলডোজারের আঘাতে এবং আগুনে দগ্ধ এক ধ্বংস করস বাড়ী- এটি ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’ ছিল। কিন্তু এই বাড়ি কেবল একটি স্থাপনা নয়। এটি একটি জাতির লড়াই, স্বপ্ন, জয় এবং অবর্ণনীয় বেদনার নীরব সাক্ষী। শুরু—একটি পরিবারের ঘর হয়ে ওঠা-১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রী থাকাকালে তাঁর একান্ত সচিব নূরুজ্জামান, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অনুরোধে ধানমন্ডিতে জমির জন্য আবেদনপত্র জমা দেন। ১৯৫৭ সালে ছয় হাজার টাকায় এক বিঘা জমি বরাদ্দ হয়। প্রথমে দুই কক্ষবিশিষ্ট একতলা বাড়ি নির্মাণ, পরে দোতলা। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। প্রথমদিকে নিচতলার একটি কক্ষে ছিলেন তিনি ও বঙ্গমাতা; পাশের কক্ষে হাসিনা-রেহানা। শেখ কামাল ও শেখ জামাল থাকতেন লাগোয়া কক্ষে। ছোট্ট ড্রয়িং রুম ছিল অতিথিদের জন্য, আর একটি কক্ষ ধীরে ধীরে পরিণত হয় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে—যা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্মস্থান। এই বাড়ি যেন হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ১৯৬২ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন—সবকিছুর পরিকল্পনা হয়েছিল এখানেই।
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন এখানেই। ৭ মার্চের ভাষণের পর প্রতিদিন এই বাড়ি থেকে জাতির প্রতি দিকনির্দেশনা যেতো।
২৫ মার্চ ১৯৭১—রাত তখন সাড়ে ১২টা। পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন সার্চলাইট শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর গ্রন্থাগার থেকে ফোনে ঘোষণা দেন—
“যার যা কিছু আছে, নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর!”
এরপর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় অন্ধকার বন্দিশালায়। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। বাড়িটি তখন যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নে বিদ্ধ—গুলির দাগ, ভাঙা দেওয়াল, পোড়া দরজা। মেরামতের পর সরকারি বাসায় না উঠে তিনি ফিরলেন নিজের এই বাড়িতে—কারণ এটি তাঁর জীবনের পরম আশ্রয়, তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রতীক। ১৫ আগস্ট—রক্তের ভোর-১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ভোরের নরম আলো ফোটার আগেই গর্জে উঠল বন্দুক। মুহূর্তের মধ্যে লাল-সবুজ পতাকার তলদেশ ভেসে গেল রক্তে। এক এক করে প্রাণ হারালেন—বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব,শেখ কামাল,শেখ জামাল,শেখ রাসেল,শেখ আবু নাসের,সুলতানা কামাল খুকু,পারভীন জামাল রোজী সেই ভোরে নিহত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর পরিবারসহ মোট ৩৩ জন। দেয়াল, সিঁড়ি, মেঝে—সব জায়গায় জমে ছিল রক্তের স্রোত। ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মর্মন্তুদ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এই বাড়ি। হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ১০ জুন পর্যন্ত এই বাড়ি সামরিক কর্তৃপক্ষের দখলে ছিল। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু পরিবারের কাউকেই প্রবেশ করতে দেননি। ১৭ মে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেও বাড়ির গেট তাঁর জন্য খোলেনি। তিনি সামনের চত্বরে বসে মিলাদ পড়েন পরিবারের জন্য। পরে বকেয়া ১২ হাজার টাকার কিস্তি শোধ করে বাড়ি ফেরত নেন। তবুও তাঁর নিজের থাকার জায়গা ছিল না—কেউ বাসা ভাড়া দিত না, আত্মীয়েরাও অনেকেই দ্বার বন্ধ রাখতেন। শেষ পর্যন্ত মহাখালীতে একটি সরকারি কোয়ার্টার পান, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক কাজ চালু থাকে ৩২ নম্বর থেকেই। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ঘোষণা করেন—এই বাড়ি আর শুধু তাঁদের নয়, পুরো জাতির। কিন্তু বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে জাদুঘর গড়ার কাজ এগোয় ধীরে। সুফিয়া কামাল, সাংবাদিক বেবী মওদুদ, ভাষাসৈনিক গাজীউল হক, ফটোসাংবাদিক পাভেল রহমানসহ অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট, বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে উদ্বোধন করেন বাড়িটি। বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের মাধ্যমে এর দেখভাল শুরু হয়। বাড়িটি বুঝে পাওয়ার পরও এর দেয়ালে শুকিয়ে থাকা রক্তের দাগ রয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা নিজ হাতে সঙ্গীদের নিয়ে পরিষ্কার করেন, তবু সেই দাগের গন্ধ যেন আজও বাতাসে ভাসে। প্রতিটি ইট যেন ফিসফিস করে বলে—
“আমরা জানি, এই মাটিতে কত স্বপ্ন আর জীবন মিলেমিশে আছে।” ২০১১ সালের ২০ আগস্ট উত্তরে একটি নতুন ছয়তলা ভবন উদ্বোধন হয়, যেখানে ২৬টি পর্বে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম, সাফল্য ও আত্মত্যাগের ইতিহাস সচিত্রভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এই বাড়ি শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়—এটি এক জাতির আত্মার প্রতীক। এখানেই শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু, আর বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন জাতির পিতা। এখানেই তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীনতার, আর এখানেই তিনি তা রক্ষা করতে সপরিবারে জীবন দিয়েছিলেন।
যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থাকবে ইতিহাসের বুকের ওপর খোদাই হয়ে—এক অনন্ত কালের সাক্ষী হয়ে। ৩২ নম্বর ধানমন্ডির সেই ঐতিহাসিক বাড়িটি আজ আর আগের মতো নেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড—সব ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এই বাড়ি। অথচ আজ সেটি আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলার পর, বুলডোজারের দাঁত বসিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এক সময় যে বাড়ির দেয়াল, সিঁড়ি, দরজা-জানালায় বঙ্গবন্ধুর পদচারণার স্মৃতি লেগে ছিল, আজ সেখানে কেবল ভস্ম, ধূলা আর শূন্যতা। ইতিহাসের আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই বাড়ি, যা জাতির পিতার জীবন ও সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়কে ধারণ করেছিল, তাকে মুছে ফেলা হয়েছে নির্মমভাবে। ধ্বংসের পর আর রইল না সেই বারান্দা, যেখানে বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন; রইল না সেই ঘর, যেখানে তিনি নেতাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কৌশল আলোচনা করতেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া কাঠের গন্ধ, বুলডোজারের গর্জনে ভেঙে পড়া দেয়ালের শব্দ—সবই মিলে যেন এক শোকগাথা রচনা করেছে। আজ সেখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাস খুঁজতে গেলে, পাওয়া যায় কেবল ধ্বংসস্তূপ আর হারানো স্মৃতির বেদনা। এই ধ্বংস কেবল একটি বাড়ির নয়, এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতি ও চেতনার উপর আঘাত। যেভাবে এই বাড়িকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, ঠিক সেভাবেই ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিলকেও মুছে ফেলা হয়েছে। সেই ধ্বংসের ধুলো এখনো বাতাসে ভাসে, যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—আমরা নিজের হাতেই নিজেদের ইতিহাসকে ধ্বংস করেছি।
