সাহসী সাংবাদিক মিজানুর রহমান চৌধুরী : বন্ধুত্ব, রাজপথ ও স্মৃতির আড্ডা-

0
208

মো.কামাল উদ্দিনঃ
মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে যা কখনো ভোলা যায় না। কিছু বন্ধুত্ব থাকে, যা সময়ের ধুলো জমেও অমলিন থেকে যায়। আর কিছু মানুষ থাকে, যাদের সাহস, সততা ও সত্য বলার শক্তি যুগে যুগে অনুপ্রেরণার আলো হয়ে জ্বলে ওঠে। আমার কাছে সাংবাদিক মিজানুর রহমান চৌধুরী তেমনই একজন মানুষ। রাজপথের সংগ্রামী সারথী, আপোষহীন মনোভাবের প্রতীক, এবং নির্ভীক সাংবাদিকতার আলোকবর্তিকা।অনেক দিন পর আজ তার সাথে কাটানো আড্ডার স্মৃতিতে আমি যেন হারিয়ে গেলাম। সময়ের পরিক্রমায় আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি, বয়স বেড়েছে, চুলে রুপালি ছোঁয়া লেগেছে, শরীর হয়েছে দুর্বল। তবুও মন যে কতটা তরুণ, তা আজ আবারো অনুভব করলাম। তার অফিসে বসে যখন কথার ফুলঝুরি শুরু হলো, মনে হলো যেন আবারও আমরা ফিরে গেছি আশির দশকের সেই দিনগুলোয়, যখন তারুণ্যের শক্তিতে রাজপথ কাঁপিয়ে বেড়াতাম।আমার সাথে মিজান ভাইয়ের পরিচয় হয়েছিল আশির দশকের শেষ প্রান্তে—১৯৮৮ সালে। তখন আমরা দু’জনই তারুণ্যের তেজে ভরপুর। চারদিকে ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাজপথে চলছিল গণআন্দোলনের ঢেউ। দেশ ছিল সংকটময় সময়ে, আর আমরা ছিলাম রাজপথে সক্রিয়। রাজনীতি, আন্দোলন, সত্য প্রকাশ—এসবের ভেতর দিয়েই আমাদের বন্ধুত্বের সূচনা। সেই বন্ধুত্ব আজও টিকে আছে অটুটভাবে, সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে।
আমি যতবার মিজান ভাইয়ের সাথে থেকেছি, ততবারই দেখেছি তার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য—তিনি কখনো আপোষ করেননি। অন্যায় বা মিথ্যার কাছে মাথা নত করা তার স্বভাবে নেই। সাংবাদিক হিসেবে তার কাজ শুধু খবর প্রকাশ নয়, বরং সত্যকে আলোকিত করা। আর বন্ধু হিসেবে তার অবস্থান সবসময়ই ছিল দৃঢ় ও অকপট।আজকের দিনটা আমার কাছে বিশেষ। সকালে শরীর ভালো ছিল না, তাই হাঁটতে বের হতে পারিনি। কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি ও হতাশা ভুলিয়ে দিয়ে বিকেলে যখন মিজান ভাইয়ের অফিসে গেলাম, তখন মনে হলো, এ যেন জীবনের আরেক রকম উচ্ছ্বাস। সাথে ছিলেন ছোট ভাই সাংবাদিক সাইফুল, ফলে আড্ডার রঙ আরও গাঢ় হলো। কথার শুরুটা হয়েছিল শৈশবের স্মৃতি দিয়ে। কতদিন পর সেই শৈশব-কৈশোরের দুষ্টুমি ভরা দিনগুলোকে মনে করলাম আমরা! মনে পড়লো কাদামাটিতে গড়াগড়ি খাওয়ার কথা, মেঠোপথের জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো, পুকুরে ডুব দিয়ে মুখ ভরে পানি পান করার ভয়ের স্মৃতি। মনে পড়লো কীভাবে মাটির মার্বেল বানিয়ে আগুনে পুড়িয়ে পাখি শিকার করতাম। লুঙ্গি উঁচিয়ে স্কুল মাঠে দৌড় প্রতিযোগিতা, কিংবা টিউবওয়েলের পানি নিয়ে খুনসুটি—এসব স্মৃতিই যেন আমাদের আড্ডাকে জীবন্ত করে তুলেছিল।
আমরা বলছিলাম খালি পেটে পড়াশোনার কষ্টের কথা, নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন বোনার কথা, আর দারিদ্র্যের মাঝেও আনন্দ খুঁজে পাওয়ার কথা। এসব স্মৃতি হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে ছোটখাটো, কিন্তু আমাদের কাছে তা মহামূল্যবান।
তবে শুধু শৈশবের স্মৃতিই নয়, মিজান ভাইয়ের জীবনও আলোচনায় এল। তিনি শুধু সাংবাদিক নন, তিনি এক সাহসী কণ্ঠস্বর। আমাদের দেশে সাংবাদিকতা অনেক সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে প্রচার আর তথ্যে, কিন্তু মিজান ভাই সাংবাদিকতাকে করেছেন প্রতিবাদের হাতিয়ার। সত্য প্রকাশের জন্য তার কলম কখনো থেমে থাকেনি। তিনি কখনো কারো তোষামোদ করেননি, কখনো আপোষ করেননি অন্যায়ের সাথে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে তিনি অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু কখনো পিছপা হননি। মিজান ভাই জানেন—সত্য বলা সহজ নয়, কিন্তু সেটিই সাংবাদিকের প্রকৃত দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন অনেকেই আছেন যারা নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে নীরব থেকেছেন। কিন্তু মিজান ভাইয়ের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ছিলেন নির্ভীক, আপোষহীন, আর স্পষ্টভাষী। তার কাছে সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, বরং নৈতিক দায়বদ্ধতা।
বন্ধুত্ব নিয়ে যত কিছু লেখা হয়েছে, তাতে একটি সত্য সবসময় একই থাকে—সত্যিকারের বন্ধুত্ব সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে। আমার আর মিজান ভাইয়ের সম্পর্ক তারই উদাহরণ। আমরা একসাথে কাটিয়েছি আন্দোলনের দিন, সংগ্রামের দিন, আবার হাসি-আনন্দে ভরা দিনও।
আজকের আড্ডায় ফিরে এলাম সেই সব দিনগুলোর স্মৃতিতে। কিন্তু আমরা দু’জনই জানি, সব কথা কখনো বলা যায় না। অনেক কিছুই থেকে যায় মনের ভেতর, যেগুলো হয়তো আর কখনো বলাও হবে না। তবে যেটুকু আমরা ভাগ করেছি, সেটুকুই আমাদের কাছে যথেষ্ট।
আজকের আড্ডার শেষে মিজান ভাই আমাকে বললেন—এ নিয়ে কিছু লিখতে। তিনিই আমার লেখার ভক্ত, তিনিই চান আমাদের বন্ধুত্বের স্মৃতি শব্দে ধরা পড়ুক। আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম লিখবো। সেই প্রতিশ্রুতির ফলই এই লেখা।
আজ খুলশী গোল্ডেন স্পুন রেস্তোরাঁয় বসে, আমার নাতনির জন্মদিনের আনন্দঘন মুহূর্তের ফাঁকেই লিখছি এ লেখাটি। হয়তো সময় নিয়ে লিখলে আরও বিস্তৃত, আরও গভীর লেখা সম্ভব হতো। কিন্তু তবুও আজকের অনুভূতিগুলো শব্দে বন্দি করতে চাই। মানুষের জীবন স্মৃতির সুতায় গাঁথা। আর বন্ধুত্ব হলো সেই সুতার সবচেয়ে দৃঢ় বাঁধন। মিজান ভাই শুধু আমার বন্ধু নন, তিনি আমার জীবনের এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তার মতো সাহসী, স্পষ্টভাষী, সত্যবাদী মানুষ পাশে থাকা মানেই জীবনে আলো যোগ হওয়া।
আজকের আড্ডা শুধু কিছু স্মৃতি চারণ নয়, বরং এটি এক জীবন্ত উদাহরণ—কীভাবে শৈশব, তারুণ্য আর পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা মিলেমিশে গড়ে তোলে এক অমূল্য সম্পর্ক। আমার কাছে আজকের দিনটি হয়ে থাকলো অমর স্মৃতি, এক অন্তরের খোরাক। আর মিজান ভাইয়ের মতো মানুষকে পাশে পেয়ে আমি গর্বিত। তিনি শুধু সাংবাদিক নন, তিনি বাংলাদেশের নির্ভীক আত্মার প্রতীক, সত্য ও সাহসের এক অবিনাশী বাতিঘর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here