চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের উপর বর্বর হামলা : গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব-

0
284

মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম – যে শহর সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি জোগায়, সেই শহরের মাটিতে সাংবাদিকদের ওপর এমন নৃশংস হামলা ঘটবে — ভাবতেই শিউরে ওঠে বিবেকবান মানুষ। জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো, আমাদের সংবাদকর্মীরা এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় কাজ করছেন। গত সপ্তাহে বেসরকারি টেলিভিশনের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হোসাইন জিয়াদ ও তার সহকর্মী ক্যামেরাপার্সন পারভেজ রহমান যখন দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন, তখন তাদের ওপর নেমে আসে সন্ত্রাসীদের হামলা। ক্যামেরা ভাঙা, সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া, পরিচয়পত্র ও মানিব্যাগ চুরি — এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকদের প্রতি এক গভীর অবমাননা প্রকাশ পেয়েছে। সাংবাদিক মানে কেবল সংবাদ পরিবেশক নয় — তিনি সমাজের সত্য অনুসন্ধানী। তিনি এমন এক সৈনিক, যিনি অস্ত্র ছাড়াই অন্ধকারকে আলোয় আনেন। অথচ এই সৈনিকের ওপর যখন হামলা হয়, তখন সেটি গোটা জাতির ওপর আঘাত বলে গণ্য হয়। জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে আগের রাতে সংঘর্ষে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হওয়ার পর সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে কিছু চিহ্নিত দাগি সন্ত্রাসী তাদের ঘিরে ধরে বর্বরোচিতভাবে মারধর করে। স্থানীয়রা কেউ কেউ এগিয়ে এলেও সন্ত্রাসীরা তাদের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস (সিএমইউজ) দ্রুত ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন — “এই হামলা কেবল দুই সাংবাদিকের ওপর নয়, এটি পুরো সাংবাদিক সমাজের প্রতি চ্যালেঞ্জ।” তাঁরা প্রশাসনকে আহ্বান জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সিএমইউজ সভাপতি মো. শাহনওয়াজ ও সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান বলেন, “জঙ্গল সলিমপুর বহুদিন ধরে দাগি আসামিদের আশ্রয়স্থল। প্রশাসন যদি সময়মতো পদক্ষেপ নিত, তাহলে আজ এমন ঘটনা ঘটত না।” তাঁরা আরও বলেন, সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। চট্টগ্রামের মানুষ জানে — জঙ্গল সলিমপুর বহুদিন ধরে একটি নিয়ন্ত্রণহীন এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেখানে ভূমিদস্যুতা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, এমনকি মাদক কারবারও চলে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই দুষ্টচক্র এখন সমাজের জন্য ভয়াবহ হুমকি। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদকর্মীরা সেখানে গিয়ে সত্য অনুসন্ধান করতে চাইলে হামলা হওয়াটাই যেন নিয়মে পরিণত হচ্ছে। অথচ সংবাদমাধ্যমই একমাত্র শক্তি, যা এই দুষ্টচক্রকে উন্মোচন করতে পারে।
আমরা প্রশ্ন রাখি — প্রশাসন কোথায় ছিল? যদি কোনও এলাকায় সন্ত্রাসীদের আধিপত্য এমন পর্যায়ে যায় যে সাংবাদিকরা সেখানে ঢুকলেই আক্রান্ত হন, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠবেই। একজন সাংবাদিক যখন ঘটনাস্থলে যান, তিনি নিজের জন্য নয়, জনসাধারণের জন্য খবর সংগ্রহ করেন। তাই তাঁর নিরাপত্তা মানে জনগণের তথ্যের নিরাপত্তা। সাংবাদিকদের উপর হামলা মানে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। কারণ, গণমাধ্যম হচ্ছে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। অন্য তিন স্তম্ভের মতোই এটি রাষ্ট্রকে ভারসাম্যে রাখে। যদি এই স্তম্ভ দুর্বল হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন গণমাধ্যম, সাংবাদিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজ একত্রিত হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। অনেকেই বলেছেন — এখন সময় এসেছে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় বিশেষ আইন ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রবণতা বেড়েছে। কোথাও সত্য সংবাদ প্রকাশের জন্য হুমকি, কোথাও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার, আবার কোথাও সরাসরি প্রাণনাশের ভয়। এই অবস্থায় সাংবাদিকতা টিকে থাকবে কীভাবে? রাষ্ট্রের করণীয় স্পষ্ট:

১. সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সুরক্ষা সেল গঠন করতে হবে।
২. বিপজ্জনক এলাকায় সংবাদকর্মীদের সহায়তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে
বাধ্যতামূলকভাবে সহযোগিতা দিতে হবে।
৩. হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৪. সাংবাদিকদের ওপর হামলা হলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এই ঘটনার পর হোসাইন জিয়াদ চিকিৎসাধীন। তাঁর মুখে ক্ষতের চিহ্ন, চোখে আতঙ্কের ছায়া, কিন্তু কণ্ঠে দৃঢ়তা — “সত্য প্রকাশ বন্ধ হবে না।” এই মনোবলই সাংবাদিকতার আসল শক্তি। চট্টগ্রামের মানুষ গর্ব করে বলে — “আমরা চট্টলার সন্তান, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করি না।” আজ এই শহরের সাংবাদিকরা আবার সেই সাহস দেখালেন। তারা আহত, কিন্তু পরাজিত নয়। চট্টলার চিত্রের সম্পাদকীয় হিসেবে আমাদের স্পষ্ট অবস্থান:সাংবাদিকদের উপর হামলার সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের বিচার না হলে আমরা নীরব থাকব না। প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে হবে। সাংবাদিকরা যদি নিরাপদ না হন, তবে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি রক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়বে। শেষ কথা, চট্টগ্রাম শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের শহর নয় — এটি মুক্তচিন্তার শহর। এই শহরে সাংবাদিকতার ঐতিহ্য দীর্ঘ দিনের। সেই ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।আমরা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই—“সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়ে তোলাই হোক আগামী দিনের অঙ্গীকার।”
লেখকঃ নির্বাহী সম্পাদক, চট্রল চিত্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here