আইএমএফের চাপে’ করের বোঝা বাড়ছে আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা

0
147

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই দেশের রাজস্ব ঘাটতি ১৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সংশোধনের নামে জনগণের ওপর আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত করের চাপ বাড়াচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থ বিভাগের বাজেট শাখা যেখানে মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে, সেখানে এনবিআর নিজ উদ্যোগে আরও ৫১ হাজার কোটি টাকা যোগ করে নতুন লক্ষ্যমাত্রা দাঁড় করিয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের দাবি—এই বাড়তি চাপ এসেছে আইএমএফের নির্দেশনার প্রভাবেই। এনবিআর সূত্র জানায়, ১০ নভেম্বর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির বৈঠকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরদিন অর্থ বিভাগের চিঠিতে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিভাজন প্রস্তুত করে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ৪ হাজার কোটি টাকার এই সীমা অতিক্রম করে এনবিআর ২০ নভেম্বর লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৫১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত যোগ করে চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা দাঁড় করায় ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। এই বাড়তি লক্ষ্যমাত্রার ৩৭ শতাংশ আয়কর ও ভ্যাট খাত থেকে, আর ২৬ শতাংশ সংগ্রহ করবে কাস্টমস। নতুন লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ে এনবিআরের গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিভাগের মহাপরিচালক মো. আবদুল হাকিম বলেন, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে অর্থ বিভাগের ৪ হাজার কোটি টাকার নির্দেশনার বিষয়ে তিনি অবগত নন। সূত্রগুলো বলছে, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ঘাটতির মধ্যেও এত বড় অঙ্কে অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রথম চার মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি—ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি। এত বড় ঘাটতির মধ্যেই কোনো নতুন উদ্যোগ ছাড়াই বাড়তি ৫৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকে অনেকেই অযৌক্তিক বলে মনে করছেন। আগের অর্থবছরেও এনবিআর দুই দফা লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েও ৪২ হাজার কোটি টাকা কম আদায় করেছিল। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থ বিভাগ যেখানে ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে এনবিআর কীভাবে নিজ থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে দিল—এটাই বড় প্রশ্ন। তিনি বলেন, “এই বাড়তি আদায়ের পেছনে কোনো নতুন করনীতি বা অর্থনৈতিক সামষ্টিক পরিবর্তন নেই। চার-পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মধ্যেই তো আমরা রয়েছি। তাই নীতিগতভাবে এমন লক্ষ্য বাড়ানোর ভিত্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন।” তার মতে, আইএমএফের চাপে এমন সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে, তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন ছিল এবং বাস্তব পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলার দায়িত্বও ছিল সরকারের। নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী— * কাস্টমস খাতে লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৪০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা। * স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। * আয়কর খাতেও একই পরিমাণে লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকায়। সব মিলিয়ে নতুন রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা—যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here