ছয় বছর পর আবারও দস্যুর দাপট: সুন্দরবনে সক্রিয় ২০ বনদস্যু বাহিনী

0
149

সুন্দরবন দস্যুমুক্ত ঘোষণার ছয় বছর পর আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুরা। অন্তত ২০টি দস্যু বাহিনীর সক্রিয় তৎপরতায় অশান্ত হয়ে উঠেছে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। পুরোনো আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের অংশ ও নবগঠিত গ্রুপ মিলিয়েই এসব বাহিনী গড়ে উঠেছে। জেলেদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়সহ নানা অপরাধে আবার ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। এতে সুন্দরবন ও উপকূলজুড়ে বিরাজ করছে থমথমে পরিবেশ, বিশেষ করে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে দস্যুদের আধিপত্য বেশি। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আত্মসমর্পণকারী ৩২ বাহিনীর ৩২৮ সদস্যকে অস্ত্রসহ গ্রহণ করেছিল র‌্যাব। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা দেয়। কিন্তু দীর্ঘ শান্তির পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের অভিযোগ— সরকার পরিবর্তনের পর তারা কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। ব্যবসা শুরু করেও চাঁদাবাজির শিকার হন এবং ‘সাবেক দস্যু’ পরিচয়ে সামাজিকভাবে হেয় হন। ফলে অনেকে ফের অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান জাহাঙ্গীর, দাদা ভাই ও মানজুর বাহিনীর নেতারা। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সক্রিয় বাহিনীগুলোর মধ্যে আছে জাহাঙ্গীর, মানজুর, দাদা ভাই, করিম শরীফ, আসাবুর, দয়াল, রবি, দুলাই ভাই, রাঙা, সুমন, আনারুল, হান্নান ও আলিফ বাহিনীসহ ২০টির বেশি গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপে ১৫-৪০ জন পর্যন্ত সদস্য এবং তাদের হাতে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র। মরাভোলা, আলীবান্দা, ধনচেবাড়িয়া, দুধমুখী, শ্যালা, নারকেলবাড়িয়া, তেঁতুলবাড়িয়া, টিয়ারচর, পশুর, আন্দারমানিক ও শিবসা অঞ্চলে তাদের শক্ত ঘাঁটি। গত এক বছরে তিন শতাধিক জেলে অপহৃত হয়েছেন; শুধু সেপ্টেম্বরের পর এক মাসেই অপহৃত হয়েছেন শতাধিক। নৌকাপ্রতি ২০-৩০ হাজার টাকা এবং অপহৃত জেলেদের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, বনসংলগ্ন এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এখনো গডফাদার হিসেবে দস্যুদের সহায়তা করে। তারা জিম্মি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ সংগ্রহ করেন। দস্যুদের দেওয়া টোকেন থাকলে মাছ ধরায় নিরাপত্তা মেলে বলেও অভিযোগ রয়েছে। জেলে ও ব্যবসায়ীরা জানান, দস্যুদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। আড়ত ও জেলে পল্লির আশপাশে দস্যুদের সোর্স থাকায় তথ্য ফাঁস হলে বনে গেলে নির্যাতন বাড়ে। বহু জেলে এখন আর বনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। ‘সেভ দ্য সুন্দরবন’ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র সমন্বয়কারী নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দস্যুরা শুধু মানুষ নয়, বনের জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় হুমকি—বাঘ, হরিণ শিকার ও কাঠ পাচার বেড়েছে। গডফাদারদের দমন ছাড়া সুন্দরবন রক্ষা সম্ভব নয়। মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার লে. কমান্ডার আবরার হাসান জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দস্যুত্ব বাড়লেও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। গত এক বছরে ২৭টি সফল অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৪ দস্যু, উদ্ধার হয়েছে ৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭০ রাউন্ড গুলি ও শতাধিক দেশীয় অস্ত্র। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৪৮ জেলে। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও রেজাউল করীম চৌধুরী জানান, বনরক্ষীদের টহল জোরদার করা হয়েছে এবং দস্যুদের অবস্থান শনাক্তে কাজ চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযান দ্রুত আরও জোরদার হবে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সুন্দরবন দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর ও ব্যাপক অভিযান চালানো এখন সময়ের দাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here