আগাম টমেটো চাষ এখন কৃষকের গলার কাঁটা

0
110

পেশায় কৃষক মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন। গত বছর গুলিয়াখালি এলাকায় ৩২ শতক জমিতে সর্জন পদ্ধতিতে আগাম টমেটো চাষ করে তিনি প্রায় তিন লাখ টাকা আয় করেছিলেন। সেই সাফল্যের আশায় এবার আরও বেশি জমিতে আগাম চাষ করেন তিনি। কিন্তু লাভের আশায় করা সেই উদ্যোগ এখন তার জন্য বড় দুশ্চিন্তা। হঠাৎ ‘আরলি ব্লাইট’ রোগে আক্রান্ত হয়ে পুরো ক্ষেত পুড়ে যাচ্ছে। কীটনাশক বা বালাইনাশক কোনোটাই কাজে আসছে না। ক্ষেতের পরিচর্যায় অতিরিক্ত ব্যয় করতে করতে আলতাফ এখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত—একদিকে সংসারের চাপ, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি, যেন উভয় সংকট। আলতাফ জানান, সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর ও মুরাদপুর ইউনিয়নের হাজারো কৃষক একই রোগে একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকরা কৃষি নীতিমালা না মানায় এই সমস্যা হচ্ছে। একই জমিতে বছরের পর বছর একই ফসল রোপণ করলে রোগের প্রকোপ বাড়ে। তাছাড়া নিজের ধারণামতো কীটনাশক ব্যবহার করাও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে। অতিরিক্ত গরম ও গ্রীষ্মকালে অস্বাভাবিক বৃষ্টিও রোগ বৃদ্ধির কারণ। কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ড উপজেলার ১৫০ হেক্টর জমিতে আগাম টমেটো চাষ হয়েছে, যার মধ্যে সৈয়দপুর ও মুরাদপুর ইউনিয়নেই প্রায় ১৩০ হেক্টর। এর মধ্যে ১২০ হেক্টর জমির টমেটো ‘আরলি ব্লাইট’ রোগে নষ্ট হয়ে গেছে। গত বছর চাহিদা ও দামের কারণে হাইব্রিড শীতকালীন টমেটো খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু এবার রোগের কারণে কৃষকের মুখে আনন্দের বদলে দুশ্চিন্তা। সরেজমিনে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর টমেটোর পাইকারি দাম ছিল কেজি ৫০-৬০ টাকা, আর এবার ৮০-৯০ টাকা। পাইকাররা এখানকার টমেটো কিনে পুরো দেশে সরবরাহ করে, ফলে কৃষকরা সাধারণত ভালো দাম পায়। কিন্তু এবার লাভের আশা করেও ক্ষতির মুখে পড়েছেন অধিকাংশ কৃষক। কৃষকরা জানায়, আগাম চাষে শ্রমিক, বাঁশের কঞ্চি সবকিছুর দাম বেশি। সমতল জমিকে টমেটো চাষের উপযোগী করতে প্রতি শতকে খরচ হয় ৭-৮ হাজার টাকা। পরের বছর একই জমিতে চাষ করলে খরচ পড়ে ৪-৫ হাজার টাকা। এ হিসাবে ১২০ হেক্টর জমিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। কৃষক শাহাবুদ্দিন বলেন, “এক একর জমিতে আগাম টমেটো করেছি, পুরো ক্ষেত পুড়ে গেছে। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করেছি। সংসার আর ঋণের চাপে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে গেছে।” আরেক কৃষক মাসুদ বলেন, “আমার ক্ষেতেও একই অবস্থা। সব শেষ হয়ে গেছে।” মুরাদপুরের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, “উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে অনেক উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু এবার হঠাৎ রোগে দুই ইউনিয়নের কৃষকই বড় ক্ষতির মুখে।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিব উল্লাহ বলেন, “টমেটো শীতকালীন সবজি। আগাম চাষে সতর্ক থাকতে হয়। এবার গরম ও বৃষ্টির কারণে ক্ষতি বেশি হয়েছে। চারা তৈরি করতে গ্রাফটিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। একই জমিতে পরের বছর অন্য ফসল চাষ করতে হবে। আর রোগ দেখা দিলেই কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা জরুরি—নিজেদের ধারণামতো কীটনাশক ব্যবহার করলে ক্ষতি আরও বাড়ে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here