যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার হত্যাকাণ্ড রাউজান রক্তাক্ত জনপদ—আর কত খুন হলে রাষ্ট্র জাগবে?

0
244

চট্রলচিত্র ডেস্ক রাউজান
রাউজান একটি জনপদের নাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নামটি যেন আতঙ্ক, রক্তপাত আর রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া, নির্দ্বিধায় গুলি, নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে রাউজান আজ রাষ্ট্রের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কসংকেত। এই রক্তাক্ত বাস্তবতার সর্বশেষ শিকার যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার (৪৮)। তাঁর মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সহিংস রাজনৈতিক আধিপত্যের আরেকটি নির্মম অধ্যায়। প্রকাশ্য গুলিতে হত্যা: আইনের ভয়হীনতা প্রকাশ্যে সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট এলাকার সিকদার পাড়া গ্রামে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, অলিমিয়াহাট বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাড়ির নিকটবর্তী স্থানে পৌঁছালে মুখোশ পরিহিত তিনজন মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্ত জানে আলম সিকদারকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই তিনি গুরুতর আহত হন। হামলার পর দুর্বৃত্তরা কোনো বাধা ছাড়াই দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল (এভারকেয়ার) এ নিয়ে যান। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। একটি প্রাণ ঝরে গেল। একটি পরিবার নিঃস্ব হলো। আর রাউজানের রক্তাক্ত তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি নাম। কে ছিলেন মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার নিহত জানে আলম সিকদার ছিলেন রাউজান উপজেলা যুবদলের সদস্য এবং পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি প্রয়াত গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত ছিলেন এবং এলাকায় রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। তাঁর হত্যাকাণ্ড স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাসী বলয়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে এনেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। হত্যার নেপথ্য নিয়ে গোপন অনুসন্ধান এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত—সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো আসেনি। তবে একাধিক গোপন ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডটি সরাসরি না হলেও পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে ইউসুফ তালুকদার নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে।সূত্রগুলো বলছে, হত্যাকাণ্ডে ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করা হয়েছে, যাদের একটি অংশ ইউসুফ তালুকদারের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে পরিচিত, তারা বর্তমানে কদলপুর পাহাড়সহ আশপাশের দুর্গম এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, নিহত জানে আলম সিকদার ও ইউসুফ তালুকদার দুজনেই একই রাজনৈতিক ধারার অনুসারী ছিলেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, মাটির ব্যবসা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধের জেরেই দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে। গোপন সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, ইউসুফ তালুকদার গুজরা, বাগোয়ান, পাহাড়তলীসহ একাধিক এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, বালু ও মাটির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। যদিও এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং বিষয়গুলো তদন্তাধীন। অতীত হত্যাকাণ্ড ও আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সংঘটিত কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পাহাড়তলী, জিয়া নগর ও কদলপুর পাহাড় এলাকায় অবস্থান করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াধীন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি। আমাদের প্রতিনিধিদের কাছে প্রাপ্ত কিছু স্থিরচিত্র ও তথ্যও বর্তমানে যাচাই করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) ও রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান
“হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট কারও বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।” রাউজান: বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে রাউজানে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ১৭–২০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনায় এখনো দৃশ্যমান বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
শেষ কথা রাউজান আজ আর শুধু একটি উপজেলার নাম নয় এটি রাষ্ট্রের জন্য এক প্রশ্ন, এক বিব্রতকর আয়না।
আইন যদি কথা না বলে, ন্যায় যদি দৃষ্টান্ত না হয়,
তবে এই রক্তের দায় ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না।
রাষ্ট্রকে জাগতেই হবে। আইনকে কার্যকর হতেই হবে।
আর রাউজানকে ফিরিয়ে দিতে হবে মানুষের জন্য নিরাপদ জনপদ হিসেবে। অনুসন্ধান চলমান। সত্য উদঘাটিত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here