“মাটির ঘ্রাণে, সুরের টানে—লোকজ সংগীতের চিরায়ত যাত্রা সুরের ঝংকারের অনন্য মিলনমেলায়-

0
201

চট্রলচিত্র ডেস্কঃ
বাংলার লোকজ সংগীত কোনো নির্দিষ্ট সময় বা প্রান্তের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, আবেগ এবং ইতিহাসের এক প্রাণবন্ত দলিল। মাঠের আলের নরম আলো, নদীর ঢেউয়ের গর্জন, মাঝির বৈঠার সুর, কৃষকের ঘামের চুম্বন, সাধকের অন্তরের অনুসন্ধান, প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাস—এই সব মিলিয়ে যে সুর সৃষ্টি হয়, সেটিই আমাদের লোকজ গান। শতাব্দী ধরে বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি—সব ধরনের লোকগান আমাদের শিকড় ও ইতিহাসের সঙ্গে আঁটসাঁটভাবে জড়িয়ে আছে। আধুনিক সময়ে যখন শহর ও নগরায়নের ছোঁয়ায় লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন কিছু সংগঠন ও শিল্পীই একমাত্র প্রাণশক্তি হিসেবে দাঁড়াচ্ছে এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। সেই দায়িত্ববোধ থেকে সুরের ঝংকার আয়োজন করল এক অনন্য দ্বৈত লোকজ গানের আড্ডা, যা শ্রোতাদের কাছে পুরোনো মাটির ঘ্রাণ এবং সুরের মিলন উপহার দিল। গত ২০ জানুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায়, নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট গ্যালারি হল পরিণত হয় লোকজ সংগীতের এক পবিত্র মঞ্চে। আয়োজকের শ্লোগান ছিল ‘মাটির ঘ্রাণে, সুরের টানে—সুর মিলাবো লোকগানে’। এই শ্লোগানই যেন অনুষ্ঠানটি এক সুরের বন্ধন হিসেবে পরিণত করেছিল। দ্বৈত গানের আসরে অংশ নেন দেশের পরিচিত লোকশিল্পী শহীদুল ইসলাম এবং উদীয়মান কণ্ঠশিল্পী অজুফা আক্তার সাথী। শহীদুল ইসলামের কণ্ঠে আবহিত হয়েছিল গভীর জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিকতা। বাউল ও ভাটিয়ালির দর্শন তার কণ্ঠে মিশে গেছে শ্রোতারা যেন ফিরে যান নদী, গ্রাম, মাঠ আর মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মাটির কথায়। অন্যদিকে, অজুফা আক্তার সাথীর পরিবেশনায় ছিল তারুণ্যের দীপ্তি, স্বচ্ছ উচ্চারণ এবং লোকগানের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা। তার কণ্ঠে প্রতিটি সুর নতুন করে জীবন পায়, যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা লোকজ ধারাকে নতুন করে ছোঁয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুরের ঝংকারের পরিচালক মোহাম্মদ তাজউদ্দিন, যিনি বলেন, “লোকজ গান আমাদের অতীত ও বর্তমানের সংযোগ। যদি আমরা আমাদের শিকড়কে ভুলে যাই, তাহলে সংস্কৃতি ও জাতির আত্মা হারিয়ে যাবে।” প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রিয়াজ ওয়ায়েজ, যিনি বলেন, “লোকজ সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে বেঁধে রাখে।” অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সাউন্ড টার্চের কর্ণধার ইলিয়াস ইলু, যিনি বলেন, “লোকজ সংস্কৃতিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখাই আমাদের দায়িত্ব। এটি বাঁচালে দেশ ও সমাজের মূল্যবোধও বেঁচে থাকবে।” সঞ্চালনায় ছিলেন লিটন চৌধুরী, যিনি দক্ষতার সঙ্গে শিল্পী ও অতিথিদের পরিচয় ও অনুষ্ঠান প্রক্রিয়া উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানের আড্ডায় উপস্থিত বক্তারা তুলে ধরেন—কীভাবে লোকজ সংগীতের সংরক্ষণ, চর্চা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা যায়। বক্তব্য রাখেন: সংগীতশিল্পী আবদুর রহিম, কল্যাণী ঘোষ, শিমুল শীল, গীতা আচার্য্য সংগঠক জামাল আহমেদ, আবু তাহের চৌধুরী শিল্পী এড. কামরুল আজম চৌধুরী টিপু, সামশুল হায়দার তুষার, লেখক সাংবাদিক মো. কামাল উদ্দিন, সেলিম আকতার পিয়াল, আবছার উদ্দিন অলি বাউল মোজাহের লায়ন ডা. আর.কে. রুবেল, প্রবীর দত্ত সাজু, ইলিয়াস রিপন, আসিফ ইকবাল, জাহিদ তানসির, শাকিল আরাফাত তাদের বক্তব্যে উঠে আসে, লোকজ সংগীত কেবল বিনোদন নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত সঞ্চার। বক্তারা বলেন, “যতক্ষণ লোকগান বাঁচবে, ততক্ষণ বাংলার আত্মা বেঁচে থাকবে।” যন্ত্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে অনবদ্য পরিবেশনা দেন তবলায় সৌমেন ভট্টাচার্য্য বাঁশিতে সুমন কুমার নাথ কী-বোর্ডে উজ্জ্বল বড়ুয়া প্যাডে টিটু দাশ ঢোলে শিবু দাশ তাঁদের নিখুঁত সঙ্গীতপ্রয়াসে শ্রোতারা মুহূর্তে হারিয়ে যান সুরের জাদুতে। প্রতিটি তাল, প্রতিটি সুর যেন মাটির গভীরতার সঙ্গে মানুষের আবেগকে মেলাতে কাজ করে। শহীদুল ইসলামের আভিজাত্য এবং অজুফা আক্তারের স্বচ্ছ কণ্ঠ মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য সঙ্গম, যা লোকজ গানকে নতুন প্রাণ দেয়। সমগ্র আড্ডার পরিবেশ ছিল আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। শিল্পী, সংগঠক ও দর্শকের মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না। সবাই যেন একই সুরে, একই আবেশে আবদ্ধ। অনুষ্ঠানটি প্রমাণ করেছে যে—যদি লোকজ সংস্কৃতিকে যত্নে লালন করা যায়, তবে আধুনিকতার ভিড়েও তা হারাবে না। ‘মাটির ঘ্রাণে, সুরের টানে’ আড্ডার বিশেষত্ব হলো এটি শুধুই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। এটি ছিল শেকড়ের সঙ্গে সংলাপ, অতীত ও বর্তমানের সংযোগ, মাটির ঘ্রাণে ফিরে যাওয়ার আহ্বান। অনুষ্ঠানের শেষ হলেও সুরের রেশ দীর্ঘক্ষণ দর্শকের মনকে স্পর্শ করে রাখে। সুরের ঝংকার এই আয়োজনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে, আমাদের লোকজ গান ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্যও জীবন্ত থাকবে। শহীদুল ইসলাম ও অজুফা আক্তারের কণ্ঠ, দক্ষ যন্ত্রসঙ্গীত, প্রগাঢ় বক্তৃতা—সব মিলিয়ে দর্শকরা এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার অংশ হয়েছিলেন। আশা করা যায়, এমন আয়োজন আরও বিস্তৃত হবে, এবং বাংলার লোকজ গান চিরায়তভাবে বেঁচে থাকবে। ৩লোকজ গান কেবল সঙ্গীত নয়—এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘মাটির ঘ্রাণে, সুরের টানে’ আড্ডা তারই এক জীবন্ত উদাহরণ, যা আমাদের শিকড়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে আবারও সংযুক্ত করেছে। এই সন্ধ্যা প্রমাণ করল, লোকজ সংগীত বাঁচলে, বাংলার আত্মাও বেঁচে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here