“লোকজ সুরের সিংহাসনে দুই রানী, মাঝখানে আমি এক ভক্তের রাজা-

0
174

থিয়েটার হলের ভেতরে তখন আলো–আঁধারির মায়াবী পরিবেশ। মঞ্চে লোকজ গানের সুর ভেসে আসছে—মাটির গন্ধে ভেজা, নদী–পাহাড়–মানুষের দীর্ঘশ্বাসে গড়া সেই চিরায়ত ধারা। চট্টগ্রামের সংস্কৃতিমনা সুধীজন, শিল্পী–সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও নানা শ্রেণি–পেশার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল এক অনাবিল আনন্দের মিলনমেলা। লোকজ সংগীত যেন সেদিন কেবল শোনা হয়নি—অনুভব করা গেছে হৃদয়ের গভীরতম স্তরে। ঠিক সেই আবহেই সাংবাদিক আশিফ ক্যামেরা তুলে নিলেন একটি মুহূর্ত—যে মুহূর্ত আজ একটি ছবির চেয়েও বেশি কিছু। কারণ এই ছবির ভেতরে বন্দি হয়ে আছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আর গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবনের নীরব ইতিহাস। ছবির এক পাশে কল্যাণী ঘোষ—যাঁর কণ্ঠে লোকজ গানের আত্মা কথা বলে। তাঁর গানে আছে গ্রামবাংলার পথঘাট, উৎসবের ঢোল, আর নারীর অব্যক্ত শক্তি। অন্য পাশে গীতা আচার্য—যাঁর সুরে আছে পাহাড়ি হাওয়া, নদীর টান, আর আঞ্চলিক গানের গভীর আবেগ। এই দুই শিল্পী কেবল জনপ্রিয় নন, তারা লোকজ সংগীতের দুই অনন্য রানী—দর্শক-শ্রোতার হৃদয়ে যাঁদের আসন বহু আগেই পাকা হয়ে গেছে। আমি তাদের চিনি বহু বছর ধরে। সেই পরিচয় শুধু ভক্তের নয়—বরং সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা এক আত্মিক সম্পর্ক। বাংলা টিভিতে আমার উপস্থাপনায় ‘কিছু কথা কিছু গান’ অনুষ্ঠানে একাধিকবার তারা অংশ নিয়েছেন। কখনো গান গেয়ে, কখনো গল্প বলে, কখনো আবার জীবনের না-বলা কথাগুলো খুলে দিয়ে। সেই সব পর্বে গানের আড়ালে ফুটে উঠেছে শিল্পীর মানুষ হয়ে ওঠার গল্প, সংগ্রাম, আনন্দ আর দায়বদ্ধতা। সেখান থেকেই আমাদের সম্পর্ক ছড়িয়ে গেছে সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও টেলিভিশন উপস্থাপনার পরিসর পেরিয়ে এক আন্তরিক সাংস্কৃতিক বন্ধনে। গতকালের এই লোকজ সংগীতের আসরেও আমরা সবাই—শিল্পী, দর্শক, শ্রোতা—একসঙ্গে ডুবে গিয়েছিলাম আনন্দে। কারো মধ্যে ছিল না দূরত্ব, ছিল না ভেদরেখা। ছিল কেবল গান, হাসি, চোখের উজ্জ্বলতা আর একে অন্যকে আপন করে নেওয়ার সুখ। এই দুই রানীর মাঝখানে বসে থাকা মানুষটি আমি। তারা গানের রানী—এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। আর আমি? গানের রাজা নই, কিন্তু নিঃসন্দেহে ভক্তের রাজা। কারণ ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার রাজত্বে কোনো মুকুট লাগে না—লাগে কেবল গভীর অনুভব। সেই অনুভব নিয়েই আমি বসে আছি এই দুই শিল্পীর পাশে—গর্বে নয়, কৃতজ্ঞতায়। এই ছবিতে ধরা পড়েছে এক নিঃশব্দ রোমান্টিকতা—যেখানে কোনো প্রেমের ঘোষণা নেই, তবু ভালোবাসা ভরপুর। শিল্পের প্রতি, মানুষের প্রতি, আর লোকজ সংস্কৃতির প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার রোমান্টিকতা। সময় একদিন এই সন্ধ্যাকে পেছনে ফেলে যাবে, অনুষ্ঠান শেষ হবে, আলো নিভবে—কিন্তু এই মুহূর্ত, এই ছবি, এই স্মৃতি থেকে যাবে হৃদয়ের ভেতরে, লোকজ সুরের মতোই—চিরকাল জীবন্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here