
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
গণভোটে সরকারের প্রচার, আইনি সীমা ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা- গণভোট বা ‘হ্যাঁ–না’ ভোট গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের সরাসরি মতামত প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে এই প্রক্রিয়া তখনই বিশ্বাসযোগ্য ও বৈধ হয়ে ওঠে, যখন তা নিরপেক্ষ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কোনো পক্ষপাতমূলক ব্যবহার সেখানে স্থান পায় না। বাংলাদেশের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রে তাই গণভোটের প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা, আইনি সীমারেখা এবং নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব—এই তিনটি বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। গণতান্ত্রিক রীতিতে সরকার একটি নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোনো গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে পারে। এটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার। সরকার জনগণের সামনে তার প্রস্তাবের যুক্তি তুলে ধরতে পারে, নীতিগত ব্যাখ্যা দিতে পারে এবং গণভোটের বিষয়টি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই প্রচার যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারে রূপ নেয়—যেমন সরকারি অর্থ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করা—তাহলে তা আর গণতান্ত্রিক প্রচার থাকে না; বরং তা গণভোটের ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাংলাদেশে গণভোট বিষয়ে এখনো পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ কোনো আইন নেই। তবে নির্বাচন ও ভোটসংক্রান্ত বিদ্যমান আইনসমূহ—বিশেষ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, নির্বাচন কমিশন আইন এবং সরকারি সম্পদের ব্যবহার সংক্রান্ত নীতিমালা—এই ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা দেয়। এসব আইনের মূল দর্শন হলো সমান সুযোগ, নিরপেক্ষ পরিবেশ এবং অবাধ মতপ্রকাশ নিশ্চিত করা। ফলে গণভোট যদি নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়, তবে নির্বাচনকালীন আচরণবিধির মৌলিক নীতিগুলোই সেখানে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারি পদাধিকারীরা যদি গণভোটের প্রচারে অংশ নেন, তবে তা ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে স্পষ্ট থাকা জরুরি—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব হিসেবে নয়। গণভোটের পুরো প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের দায়িত্ব কেবল ভোট গ্রহণ আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করা। নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে—সরকার, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ—সব পক্ষই সমানভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে। সরকারি প্রচার যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যায় বা একতরফা প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে কমিশনের দায়িত্ব হবে সেই প্রচার নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজন হলে নির্দেশনা বা বিধিনিষেধ আরোপ করা।
এ ছাড়া গণভোটের প্রশ্ন প্রণয়ন, ব্যালট পেপারের ভাষা, ভোটারদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর পদ্ধতি—সবকিছুই স্বচ্ছ ও সহজবোধ্য হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহার যেন কোনো পক্ষের পক্ষে কাজ না করে, সে বিষয়েও নির্বাচন কমিশনকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। অন্যথায় গণভোট একটি নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না হয়ে ক্ষমতাসীনদের প্রচারণার অংশে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, বহু গণতান্ত্রিক দেশে সরকার গণভোটে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেও নির্বাচন কমিশন বা সমমানের সংস্থা সেখানে ভারসাম্য রক্ষার ভূমিকা পালন করে। সরকার যুক্তি উপস্থাপন করবে, কিন্তু প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ থাকবে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের হাতে—এটাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণতান্ত্রিক মানদণ্ড। সবশেষে বলা যায়, গণভোটে সরকারের প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়, তবে তা অবশ্যই কঠোর আইনি ও নৈতিক সীমার মধ্যে থাকতে হবে। সরকার হবে নীতির ব্যাখ্যাকারী, নির্বাচন কমিশন হবে প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ অভিভাবক, আর জনগণ হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা। এই ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে গণভোট গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে নতুন বিতর্ক ও অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। গণভোটের সাফল্য তাই নির্ভর করে—কতটা সংযমের সঙ্গে সরকার প্রচার চালায় এবং কতটা দৃঢ়ভাবে নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে—তার ওপরই। গণভোট ও ‘হ্যাঁ–না’ ভোট: সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন গণতন্ত্রের মৌলিক দর্শন হলো—রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ। সেই জনগণের মতামত সরাসরি জানার একটি পদ্ধতি হলো গণভোট বা ‘হ্যাঁ–না’ ভোট। কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, আইন কিংবা সাংবিধানিক প্রশ্নে জনগণের সরাসরি সম্মতি নেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে বিশ্বের বহু দেশে গণতন্ত্রের পরিপূরক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনি কাঠামোর ভেতরে গণভোটের অবস্থান কোথায়? এটি কি সাংবিধানিকভাবে বৈধ, না কি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ? বাংলাদেশের সংবিধানে ‘গণভোট’ বা Referendum শব্দটি সরাসরি উল্লেখ নেই। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত সংসদীয় গণতন্ত্রভিত্তিক, যেখানে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের একমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষ হলো জাতীয় সংসদ। সংবিধানের ৫৬ থেকে ৬৫ অনুচ্ছেদে সংসদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। ফলে জনগণের মতামত সরাসরি কোনো আইন বা সিদ্ধান্তে পরিণত হয় না; তা সংসদের মাধ্যমে আইনি রূপ পেতে হয়। তবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭-এ বলা হয়েছে—“প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।” এই ঘোষণা গণভোটের নৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। অর্থাৎ জনগণের মতামত রাষ্ট্র পরিচালনার মূল উৎস হলেও, সেই মতামত বাস্তবায়নের সাংবিধানিক পথ নির্ধারিত হয়েছে প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে। এখানে গণভোট নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাধ্যতামূলকও নয়। বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে রাজনৈতিক বা নীতিগত উদ্যোগ হিসেবে। জনগণের মতামত নেওয়া যেতে পারে কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। কিন্তু সেই ভোটের ফলাফল তখনই সাংবিধানিক বৈধতা পায়, যখন জাতীয় সংসদ সেই ফলাফলকে গ্রহণ করে আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে কার্যকর করে। অন্যথায় গণভোট কেবল একটি পরামর্শমূলক বা রাজনৈতিক নির্দেশনা হিসেবেই থেকে যায়। যদি কোনো গণভোটকে বাধ্যতামূলক করতে হয়—অর্থাৎ বলা হয়, নির্দিষ্ট বিষয়ে জনগণের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না—তাহলে বিদ্যমান সংবিধান কাঠামো যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২ অনুযায়ী সংশোধন প্রয়োজন হবে, যার জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আবশ্যক। পাশাপাশি একটি পৃথক গণভোট আইন প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে গণভোটের পদ্ধতি, আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষ, ভোটার তালিকা, ফলাফলের বাধ্যবাধকতা—সবকিছু স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেখা যায়, গণভোটের সাংবিধানিক অবস্থান দেশভেদে ভিন্ন। সুইজারল্যান্ডে গণভোট বাধ্যতামূলক ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যম। ফ্রান্সে রাষ্ট্রপতির আহ্বানে অনুষ্ঠিত গণভোট সাংবিধানিকভাবে কার্যকর। আবার যুক্তরাজ্যে গণভোট আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষা করা কঠিন—ব্রেক্সিট তার বড় উদাহরণ। বাংলাদেশের অবস্থান বাস্তবে যুক্তরাজ্যের মডেলের কাছাকাছি। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিষ্কার—সংবিধানই সর্বোচ্চ আইন। কোনো গণভোট যদি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তা বাতিলযোগ্য। জনগণের মতামত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সবশেষে বলা যায়, গণভোট বাংলাদেশের সংবিধানে নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু তা এখনো সাংবিধানিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেনি। জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে সেই অংশগ্রহণকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট আইন, সাংবিধানিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নচেৎ গণভোট কেবল একটি আবেগঘন স্লোগান হয়েই থেকে যাবে, রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠবে না।
বাংলাদেশের ইতিহাসে যত গণভোট-স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল প্রশাসনিক এবং একটি সাংবিধানিক গণভোট। গণভোট এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ করে ব্যালটে ‘হ্যাঁ’অথবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে মতামত দেয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনমত যাচাই করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এই গণভোট। চলুন, এবার জেনে আসি বাংলাদেশের তিনটি গণভোটের ইতিহাস। সেইসঙ্গে জানব এবারের গণভোট প্রস্তাবের আদ্যোপান্ত। প্রথম গণভোট-বাংলাদেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকাজের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য। ভোটের মাধ্যমে দেশের জনগণ জানান, রাষ্ট্রপতি এবং তার নীতি ও কর্মসূচির প্রতি তারা আস্থা রাখেন কি না। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল গণভোটের ঘোষণা দেন জিয়াউর রহমান। দেশের ২১ হাজার ৬৮৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তখন দেশের মোট ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৪ লাখ। ফলাফলে দেখা যায়, ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পড়ে। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ‘না’ ভোট ছিল মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। দ্বিতীয় গণভোট-দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির বৈধতা যাচাইয়ের জন্য ছিল এই গণভোট। আস্থা থাকলে জেনারেল এরশাদের ছবিসহ ‘হ্যাঁ’ বাক্সে এবং আস্থা না থাকলে ‘না’ বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ভোটার অংশগ্রহণের হার ছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তৃতীয় গণভোট গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরপর পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস হয়। সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর ওই বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, তা নির্ধারণে ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংসদীয় প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোটার ‘না’ ভোট দেন। আবারও গণভোট -২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারা সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করলে গণভোটের বিষয়টি সামনে আসে। রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোটের প্রস্তাব দেয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের পক্ষ থেকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের সুপারিশমালা হস্তান্তর করা হয়। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর খসড়ায় বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে এই আদেশ এবং এর তফসিলে সন্নিবেশিত জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইন প্রণয়ন করা হবে। গণভোটের ব্যালটে প্রশ্ন থাকবে—আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং এর তফসিল-১ এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন? ভোটারদের এই প্রশ্নের উত্তরে ব্যালট পেপারে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে নির্ধারিত বাক্সে প্রদান করতে হবে। তফসিল-১-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কমিশনের আলোচনায় নেওয়া সংবিধানের ৪৮টি সংশোধন প্রস্তাব।নআরও ইতিহাসে আলোচিত যত গণভোট- গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে এসব সংশোধনী বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত সংযোজিত থাকলেও চূড়ান্ত তফসিলে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বাস্তবায়ন আদেশ জারির পর জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত হবে। একইসঙ্গে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদও গঠন করা হবে, যা সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ প্রয়োগ করার অধিকার রাখবে। কমিশন জানিয়েছে, বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত গণভোটে যদি ইতিবাচক সম্মতি পাওয়া যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার বিলটি সংবিধান সংস্কার পরিষদকে তার দায়িত্ব পালনে সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যদি সংস্কার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান সংস্কার বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।অন্যদিকে কমিশনের আলোচনায় নেওয়া সংবিধানের ৪৮টি সংশোধনের মধ্যে কোনো একটি বিষয়ে যদি সমর্থন থাকে বা না থাকে, তবে গণভোটে আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। আরেকটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারির মাধ্যমে গণভোটে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের ব্যবস্থা থাকবে। তবে এক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে ‘পূর্ণাঙ্গ খসড়া বিল’ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বাদ রাখা হয়েছে। ২৭০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতাও দ্বিতীয় বিকল্পে রাখা হয়েছে। ঐকমত্য কমিশন প্রণীত আদেশে গণভোট কীভাবে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের গঠন ও কার্যাবলি তুলে ধরা হয়েছে। খসড়া আদেশে বলা হয়েছে, ‘এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে যথোপযুক্ত সময়ে অথবা উক্ত নির্বাচনের দিন এই আদেশ অনুসারে গণভোট অনুষ্ঠান করা হইবে।’ আদেশে বলা থাকবে, ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে এই আদেশ এবং ইহার তফসিল-১ এ সন্নিবেশিত জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হইবে।’ খসড়া আদেশে বলা হয়, গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ইতিবাচক বা হ্যাঁ সূচক হইলে এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হইবে, যাহা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গাঠনিক ক্ষমতা (কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার) প্রয়োগ করিতে পারিবে। ‘উক্ত নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একইসঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করিবেন।’ ‘পরিষদ উহার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এই আদেশের তফসিল-১ এ বর্ণিত জুলাই জাতীয় সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করিবে এবং তাহা সম্পন্ন করিবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হইবে।’ জাতীয় সংসদের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ করবেন, এমন বিধান খসড়া আদেশে রেখেছে ঐকমত্য কমিশন। তাদের শপথবাক্যও নির্ধারণ করা হয়েছে আদেশের দ্বিতীয় তফসিলে। সম্পর্কিত বিষয়:
গণভোট, আমি একজন লেখক হিসেবে আমার স্বাধীন মতামত- গণভোট: গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি, না সাংবিধানিক পরীক্ষা? বাংলাদেশের নির্বাচন ও নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা ও অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি—গণভোট আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে কখনোই নিয়মিত গণতান্ত্রিক চর্চা হিসেবে বিকশিত হয়নি। বরং এটি ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক মুহূর্তে, যখন ক্ষমতার বৈধতা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন কিংবা বড় ধরনের সংস্কারের প্রশ্ন সামনে এসেছে। ফলে গণভোটকে নিছক ‘হ্যাঁ–না’ ভোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বরাবরই ক্ষমতা, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের পারস্পরিক সম্পর্ক যাচাইয়ের একটি জটিল মাধ্যম হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের গণভোট বিশ্লেষণ করলে আমি দেখতে পাই—এই দুটি আয়োজন মূলত শাসনক্ষমতার বৈধতা প্রদর্শনের প্রয়াস ছিল। বিপুল ‘হ্যাঁ’ ভোট থাকা সত্ত্বেও ভোটার অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে শিখিয়েছে, সংখ্যার আধিক্য সবসময় গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয় না। বরং এগুলো আমাদের জন্য সতর্কবার্তা—গণভোট সহজেই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠতে পারে। ১৯৯১ সালের গণভোটকে আমি ব্যতিক্রম হিসেবে দেখি। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে অনুষ্ঠিত এই গণভোট একটি স্পষ্ট সাংবিধানিক লক্ষ্য সামনে রেখে আয়োজিত হয়েছিল। যদিও ভোটার উপস্থিতি কম ছিল, তবু এর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমার দৃষ্টিতে, এই গণভোট প্রমাণ করে—গণভোট তখনই কার্যকর ও অর্থবহ হয়, যখন তা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের পথে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বর্তমান সময়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও সংবিধান সংস্কার বিষয়ে প্রস্তাবিত গণভোট আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এখানে গণভোটকে কেবল জনমত যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ প্রয়োগের উৎস হিসেবে বিবেচনার যে ধারণা উঠে এসেছে, তা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এক নতুন ও সংবেদনশীল অধ্যায়। কারণ এতদিন সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; গণভোট ছিল তার রাজনৈতিক অনুমোদনের প্রতীক মাত্র। একজন গবেষক হিসেবে আমার কাছে দুটি প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, একক প্রশ্নে বহু—এ ক্ষেত্রে ৪৮টি—সংবিধান সংশোধনী একত্রে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটে উপস্থাপন করা হলে জনগণের প্রকৃত মতামত কতটা প্রতিফলিত হবে? সংবিধান সংশোধনের মতো গভীর ও বহুস্তরবিশিষ্ট বিষয়ে জনগণের সূক্ষ্ম মত প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত—এ বিশ্বাস থেকে আমি এই পদ্ধতি নিয়ে দ্বিধা অনুভব করি। দ্বিতীয়ত, গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধনের বিধান সংসদের ভূমিকা ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। আমি মনে করি, গণভোট নিঃসন্দেহে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার এক শক্তিশালী প্রতীক। তবে ইতিহাস আমাকে শিখিয়েছে—এই শক্তি তখনই গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করে, যখন তা স্পষ্ট আইন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সংযমের মধ্য দিয়ে প্রয়োগ করা হয়। অন্যথায় গণভোট গণতন্ত্রের পরিপূরক না হয়ে ক্ষমতা বৈধ করার একটি কৌশলগত উপায়ে রূপ নিতে পারে। এই কারণে আমার স্বাধীন মত হলো বাংলাদেশের জন্য গণভোট কোনো আবেগী বা প্রতীকী সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এটি একটি গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পছন্দের প্রশ্ন। যদি ভবিষ্যতে গণভোটকে রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো, সাংবিধানিক সীমারেখা এবং জনগণের মত প্রকাশের বাস্তব ও অর্থবহ সুযোগের মধ্যে আনতে হবে। অন্যথায় গণভোট আমাদের ইতিহাসে আবারও একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হবে—গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তি হিসেবে নয়।
লেখকঃ ডেপুটি এডিটর দি টুরিস্ট ও নির্বাহী সম্পাদক চট্রল চিত্র-

