চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিসে ঘুষের সাম্রাজ্য:-১ বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, দালাল–কর্মকর্তাদের অদৃশ্য সিন্ডিকেটে জিম্মি সাধারণ মানুষ-

0
176

– মো. কামাল উদ্দিন: রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট একটি মৌলিক সেবা। বিদেশে যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা কর্মসংস্থানের জন্য এটি অপরিহার্য একটি রাষ্ট্রীয় নথি। কিন্তু চট্টগ্রামের দুটি পাসপোর্ট অফিসে এই মৌলিক সেবাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, যা দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। অভিযোগ রয়েছে—সরকার পরিবর্তন হোক বা প্রশাসনিক রদবদল হোক, চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিসে ঘুষের সংস্কৃতি যেন অটুটই থেকে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত দালাল চক্র এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তা মিলেই এই ঘুষ বাণিজ্যের জাল বিস্তার করেছে। চট্টগ্রামের মুনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস এবং চান্দগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস—এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর প্রায় ৪০ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয় বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগ কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্র। বঙ্গবন্ধুর ঘুষবিরোধী আদর্শ বনাম বাস্তবতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আজীবন কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি প্রশাসনে সততা প্রতিষ্ঠার জন্য একাধিকবার কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন এবং ঘুষকে রাষ্ট্রের জন্য এক মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অনেক জায়গায় সেই ব্যাধি নির্মূল হয়নি। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে—সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিম্নপদস্থ কর্মচারী পর্যন্ত অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। এসব ঘটনা দেশের দুর্নীতির গভীরতা কতটা বিস্তৃত, তারই ইঙ্গিত দেয়। পাসপোর্ট অধিদপ্তরও এই বিতর্ক থেকে মুক্ত নয়। বরং বহু অভিযোগ রয়েছে যে, দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো চট্টগ্রামেও পাসপোর্ট অফিস ঘুষের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মুনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিস: প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ঘুষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মুনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ই-পাসপোর্ট আবেদন জমা পড়ে। তথ্য বলছে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০টি ই-পাসপোর্ট আবেদন জমা হয় এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি আবেদন দালালদের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয় অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ফাইলে গড়ে ১৬০০ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়। এর ফলে প্রতিদিন ঘুষের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সপ্তাহে (৫ কার্যদিবস): ৪৪ লাখ টাকা। মাসে (২২ কার্যদিবস): ১ কোটি ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বছরে কেবল এই একটি অফিস থেকেই ঘুষ আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৩ কোটি ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। চান্দগাঁও পাসপোর্ট অফিস: আরেকটি ঘুষের কেন্দ্র চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসেও প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। এখানে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০টি ই-পাসপোর্ট আবেদন জমা হয় এর মধ্যে ৩০০ থেকে ৩৫০টি আবেদন দালালদের মাধ্যমে আসে প্রতি ফাইলে গড়ে ১৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতিদিন ঘুষের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সপ্তাহে: ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। মাসে (২২ কার্যদিবস): প্রায় ৯৯ লাখ টাকা। এভাবে বছরে এই অফিস থেকে ঘুষ আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। দালালচক্রের সাংকেতিক ব্যবস্থা পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ বাণিজ্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এটি একটি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, দালালদের মাধ্যমে জমা দেওয়া প্রতিটি পাসপোর্ট ফাইলে একটি সাংকেতিক চিহ্ন থাকে। এই চিহ্ন সাধারণত আবেদনপত্রের ৭৭ নম্বর কলামে একটি নির্দিষ্ট ই-মেইল বা কোড হিসেবে দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিসে বিল্লাল-ইয়াহিয়ার রমরমা ঘুষ বানিজ্য | FT বাংলা | FT | The National Financial Portal
এই কোড দেখেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন: ফাইলটি দালালের মাধ্যমে এসেছে এবং এর সঙ্গে ঘুষের লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে অন্যদিকে সাধারণ আবেদনকারীরা যদি এই সাংকেতিক পদ্ধতি ব্যবহার না করেন, তবে তাদের নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হয়—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য দালালদের মাধ্যমে পরিচালিত ঘুষের হিসাব করলে দেখা যায় প্রায় ৩৫ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা সরাসরি দালালচক্রের মাধ্যমে আদায় করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন অজুহাতে আরও প্রায় ৫ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের এই দুটি পাসপোর্ট অফিস থেকে বছরে প্রায়— ৪০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য পরিচালিত হয়। সাধারণ মানুষের জন্য দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা পাসপোর্ট অফিসে প্রভাবশালী বা বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য আলাদা কাউন্টার থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তবতা ভিন্ন।
অনেক আবেদনকারী অভিযোগ করেন—দালাল ছাড়া অনেক সময় ফাইলের অগ্রগতি হয় না। সামান্য ভুল দেখিয়ে আবেদন আটকে দেওয়া হয় বা নতুন কাগজ পত্রের অজুহাত তৈরি করা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই দালালের শরণাপন্ন হন। এভাবে একটি রাষ্ট্রীয় সেবা ধীরে ধীরে নাগরিকদের জন্য দুর্বিষহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। ঘুষের এই চক্র ভাঙতে করণীয় এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, পাসপোর্ট অফিসের পুরো কার্যক্রমে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, দালালচক্র নির্মূল করতে একটি কার্যকর হটলাইন ও অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করা জরুরি। চতুর্থত, সৎ ও ঘুষবিরোধী কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত ও উৎসাহিত করা প্রয়োজন। পঞ্চমত, দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা: ঘুষমুক্ত সেবা কি সম্ভব? চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিসের এই চিত্র কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার বড় একটি বাস্তবতা তুলে ধরে। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে এই ঘুষের সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে। রাষ্ট্রের নাগরিকরা তাদের মৌলিক সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হবে—এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই এখন প্রয়োজন সাহসী পদক্ষেপ, স্বচ্ছ তদন্ত এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান।
কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার প্রশাসন সততা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের উপর দাঁড়িয়ে থাকে।
চলবে–

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here