সূর্য সেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার-কে সন্ত্রাসী বলা—পাকিস্তানপন্থী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ইতিহাসের জাগ্রত প্রতিবাদ”

0
131

মো. কামাল উদ্দিন
ইতিহাস কখনো নিছক অতীত নয়—এটি জাতির বিবেক, আত্মপরিচয় এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। সেই ইতিহাসকেই যখন বিকৃত করার চেষ্টা করা হয়, তখন নীরব থাকা মানে সত্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। আজ আমরা সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, যখন পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে একটি পাকিস্তানপন্থী সংগঠন আমাদের অগ্নিযুগের দুই অমর বিপ্লবী—সূর্য সেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার—কে “সন্ত্রাসী” বলে আখ্যায়িত করেছে। এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ নয়—এটি ইতিহাসের প্রতি চরম অবজ্ঞা, জাতির আত্মমর্যাদার প্রতি অবমাননা, এবং স্বাধীনতার ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক গভীর ষড়যন্ত্র। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: কোথা থেকে শুরু ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন ছিল শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের এক নির্মম অধ্যায়। অর্থনৈতিক লুণ্ঠন, সাংস্কৃতিক অপমান, রাজনৈতিক দমন—সব মিলিয়ে একটি জাতিকে নিঃস্ব করে দেওয়ার পরিকল্পিত প্রয়াস চলছিল। এই পরিস্থিতিতে জন্ম নেয় প্রতিরোধ, গড়ে ওঠে আন্দোলন—কখনো অহিংস, কখনো সশস্ত্র। এই সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন সূর্য সেন—যিনি “মাস্টারদা” নামে পরিচিত। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, সংগঠক এবং দূরদর্শী নেতা। তাঁর নেতৃত্বেই সংঘটিত হয় ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন।
এই অভিযানে শুধু অস্ত্র দখলই হয়নি—চট্টগ্রামকে কার্যত ব্রিটিশ শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। রেললাইন বিচ্ছিন্ন, টেলিগ্রাফ লাইন ধ্বংস, প্রশাসনিক কাঠামো অচল—এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবী অভ্যুত্থান। কয়েকদিনের জন্য হলেও চট্টগ্রাম স্বাধীন হয়েছিল—এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, এটি ইতিহাসের বাস্তবতা। নারী জাগরণের অগ্নিশিখা এই আন্দোলনের আরেক উজ্জ্বল অধ্যায়—প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তিনি শুধু একজন নারী বিপ্লবী নন—তিনি ছিলেন একটি যুগের প্রতীক। যখন সমাজ নারীদের ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করে রাখতে চেয়েছিল, তখন তিনি হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য।

পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব—যেখানে লেখা ছিল “Dogs and Inians not allowed”—সেই অপমানের প্রতীককে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছিলেন তিনি। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত আক্রমণ শুধু একটি সামরিক অভিযান ছিল না; এটি ছিল আত্মমর্যাদার পুনরুদ্ধার, একটি জাতির সম্মানের প্রতিশোধ। আত্মাহুতির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া যায়, কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া যায় না। অপপ্রচারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আজ যারা সূর্য সেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার-কে “সন্ত্রাসী” বলছে, তারা আসলে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট অংশকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করছে। তারা ভুলে যাচ্ছে—ব্রিটিশবিরোধী এই আন্দোলনগুলোই ছিল উপমহাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটার ফলে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। অর্থাৎ, এই বিপ্লবী সংগ্রাম না হলে পাকিস্তানের অস্তিত্বই তৈরি হতো না। আর পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেই ১৯৭১ সালে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। অতএব, সূর্য সেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার-এর সংগ্রামকে অস্বীকার করা মানে— বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকেই অস্বীকার করা। ইতিহাস বনাম অপপ্রচার ইতিহাস কখনো আবেগ দিয়ে নয়—তথ্য ও ত্যাগ দিয়ে নির্মিত হয়। সূর্য সেন-এর ফাঁসি, তাঁর নির্যাতন, তাঁর আত্মত্যাগ—এসব কোনো সন্ত্রাসীর গল্প নয়; এটি এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর কাহিনি। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার-এর আত্মাহুতি কোনো অপরাধ নয়; এটি এক জাতির জাগরণের প্রতীক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন বিপ্লবীদের “ফ্রিডম ফাইটার” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অথচ আমরা নিজেদের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করছি—এটি আত্মপরিচয়ের সংকট ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের করণীয়
আজ আমাদের দায়িত্ব— ইতিহাসকে সঠিকভাবে তুলে ধরা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া নতুন প্রজন্মকে সত্য জানানো
এবং স্পষ্টভাবে বলা—আমাদের বীরদের অপমান আমরা সহ্য করব না সূর্য সেন—তিনি অগ্নিপুরুষ, যিনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার—তিনি অগ্নিকন্যা, যিনি আত্মাহুতির মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে চিরঞ্জীব করেছেন।
তাদের সন্ত্রাসী বলা মানে— সত্যকে অস্বীকার করা, ইতিহাসকে অপমান করা, এবং নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
ইতিহাস কখনো মিথ্যার কাছে মাথা নত করে না। আজ যারা অপপ্রচার চালাচ্ছে, কাল তারাই ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে।
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। সত্য ইতিহাস অম্লান থাকুক। সূর্য সেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার চিরজাগ্রত থাকুক বাঙালির চেতনায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here