হাইকোর্টের ছায়ায় এক মানবিক যোদ্ধা: আবুল হাশেমের চার দশকের আইন, জীবন ও ন্যায়ের দীর্ঘ পথচলা”

0
7

–মো.কামাল উদ্দিন
হাইকোর্টের ভেজা আঙিনায় বৃষ্টির নীরব সুর বাজে,
মেঘলা ঢাকার আকাশে স্মৃতিরা ধীরে ধীরে সাজে।
ন্যায়ের পথে হেঁটে চলা এক নাম—আবুল হাশেম,
মানবতার দীপ্ত আলোয় গড়া এক অদম্য সমর্পণ।
আইনের পাতায় পাতায় তারই সংগ্রামের লেখা রয়ে যায়,
সময়ের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তিনি আজও সত্যের দিশারি হয়ে থাকেন।ঢাকার আজ সকালটা ছিল এক অনন্য আবহে মোড়া। আকাশজুড়ে ভারী মেঘ, মাঝেমধ্যে থেমে থেমে বৃষ্টি—শহরের ব্যস্ততাকে যেন কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে দিয়েছিল প্রকৃতি নিজেই। সেই ভেজা নীরবতার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল বাংলাদেশ হাইকোর্ট—রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ প্রতীক, যেখানে ন্যায় ও আইনের ইতিহাস প্রতিদিন নতুন করে লেখা হয়। হাইকোর্টের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সময় যেন থমকে গিয়েছিল। চারপাশের গাছপালা, ভেজা পাথরের সিঁড়ি, আর আদালতের গম্ভীর স্থাপত্য—সবকিছু মিলে তৈরি করেছিল এক গভীর, চিন্তাশীল পরিবেশ। সেই পরিবেশেই জন্ম নেয় এক দীর্ঘ আলাপ, কিছু স্মৃতি, কিছু অভিজ্ঞতা, আর এক জীবনের বিস্তৃত গল্প। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন মানুষ—আবুল হাশেম। তিনি শুধু একজন আইনজীবী নন—তিনি এক দীর্ঘ সময়ের সাক্ষী, এক মানবিক চেতনার ধারক, এবং ন্যায়বিচারের এক নিরব সৈনিক। শুরুটা ছিল ভিন্ন পথে—শিক্ষার আলো থেকে আইনের পথে আবুল হাশেমের জীবন শুরু হয়েছিল আইন দিয়ে নয়, বরং শিক্ষার আলো দিয়ে। তিনি ছিলেন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছোট ছোট শিশুদের হাতে প্রথম অক্ষর তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়েই তিনি জীবনের প্রথম দায়িত্ব পালন করেন। এই পর্যায়েই তিনি বুঝতে শেখেন—মানুষ গড়ার কাজই সবচেয়ে বড় কাজ। শিক্ষকতার এই অভিজ্ঞতা তাকে ভেতর থেকে গড়ে তোলে। পরে তিনি যুক্ত হন চন্দনাইশ অঞ্চলের সাতবাড়িয়া দায়মিয়া কলেজে শিক্ষকতা পেশায়, যা বর্তমানে কর্নেল অলি আহমেদ বীর বিক্রম কলেজ নামে পরিচিত। সেখানে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি নিজেও শিখেছেন সমাজ, বাস্তবতা ও মানুষের জীবনসংগ্রাম। আইনের পথে প্রবেশ: অধ্যবসায় ও সংগ্রামের শুরু ১৯৮৫ সালে তিনি এলএলবি সম্পন্ন করেন। সেই অর্জন ছিল তার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। পরের বছর, ১৯৮৬ সালে তিনি বার কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনজীবী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন।
১৯৮৭ সালে তিনি অধ্যাপনার জীবন ছেড়ে পুরোপুরি আইন পেশায় নিজেকে নিবেদন করেন। চট্টগ্রাম জজ আদালতে তিনি যুক্ত হন প্রখ্যাত আইনজীবী বদিউল আলম-এর জুনিয়র হিসেবে। এই সময়টি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকাল। আদালতের প্রতিটি মামলা, প্রতিটি যুক্তি, প্রতিটি প্রমাণ তাকে গড়ে তোলে এক দক্ষ আইনজ্ঞ হিসেবে। তিনি শিখেছিলেন—আইন শুধু বইয়ের ভাষা নয়, এটি মানুষের জীবনের বাস্তব সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। হাইকোর্টে অভিজ্ঞতার বিস্তার

 

পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টে কাজ করার সুযোগ পান ব্যারিস্টার কামাল উল আলম-এর অধীনে। এই অধ্যায় তার পেশাগত জীবনের গভীরতা আরও বাড়িয়ে দেয়। হাইকোর্টে কাজ করার সময় তিনি শিখেছেন আইনের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং ন্যায়বিচারের দার্শনিক দিক। এই অভিজ্ঞতা তাকে একজন সাধারণ আইনজীবী থেকে একজন চিন্তাশীল আইনবিশারদে পরিণত করে। চার দশকের পেশাজীবন: দায়িত্ব, সততা ও নেতৃত্ব দীর্ঘ চার দশকের আইনজীবী জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাত বছর চট্টগ্রাম আদালতের জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (PP) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তার কাজের ভিত্তি ছিল সততা, নিরপেক্ষতা এবং আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিচারিক অঙ্গনে এটি ছিল তার দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার একটি বড় স্বীকৃতি। একসময় তার নাম বিচারপতি হওয়ার সম্ভাব্য তালিকায়ও ছিল। কিন্তু তিনি সেই উচ্চ পদে না গিয়ে বেছে নিয়েছেন মানুষের পাশে থাকার কঠিন কিন্তু মানবিক পথ। মানবাধিকার কর্মী হিসেবে পরিচয় আবুল হাশেমের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মানবাধিকার সংগঠক। তিনি বিশ্বাস করেন—আইন যদি মানুষের অধিকার রক্ষা না করে, তবে সেই আইন অর্থহীন। তিনি অসংখ্য নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বহু মামলা তিনি নিজের অর্থে পরিচালনা করেছেন। অনেক সময় ঢাকায় আসা অসহায় মানুষদের আশ্রয় দিয়েছেন, সহায়তা করেছেন, পথ দেখিয়েছেন। তার জীবনে এমন বহু ঘটনা আছে যেখানে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির পক্ষে কাজ করে সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের নির্দোষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। লেখক ও চিন্তাশীল মানুষ তিনি শুধু আদালতে সীমাবদ্ধ নন। তিনি একজন লেখকও। আইন, সমাজ, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। তার লেখায় থাকে বাস্তব অভিজ্ঞতার গভীরতা, যুক্তির শক্তি এবং মানবিকতার প্রকাশ।
তিনি বিশ্বাস করেন—আইন যত কঠিনই হোক, সাধারণ মানুষের জন্য তা সহজভাবে বোঝানো উচিত। তাই তার লেখায় থাকে সহজ ভাষা, কিন্তু গভীর অর্থ। সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এখনো আছেন। শিশু ও নারীর অধিকার রক্ষায় তার অবদান উল্লেখযোগ্য। অসহায় মানুষের আইনি সহায়তায় তিনি বহু দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সেখানে তিনি ছিলেন একজন সাহসী ও নির্ভীক কণ্ঠস্বর। ব্যক্তিগত জীবন: সফলতা কিন্তু বিনয়ী অস্তিত্ব তার পারিবারিক জীবনও সফল। সন্তানরা সুশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই সফলতা কখনোই তাকে অহংকারী করেনি। তিনি রয়ে গেছেন একজন সাধারণ, সাদা মনের মানুষ হিসেবে—যার মধ্যে নেই লোভ, নেই অহংকার, আছে শুধু দায়িত্ববোধ। হাইকোর্টের ছাদে সেই আড্ডা সেদিন হাইকোর্টের ছাদে বসে আমাদের আড্ডায় যোগ দেন জাতীয় নাট্য ব্যক্তিত্ব আল নোমান । চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছিল, আর বৃষ্টিভেজা আকাশের নিচে কথাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল। সেই আড্ডা শুধু আলোচনা ছিল না—তা ছিল একটি জীবনের পুনর্লিখন, একটি মানুষের চার দশকের ইতিহাসের স্মৃতিচারণ। আবুল হাশেম কোনো সাধারণ নাম নয়। তিনি এক দীর্ঘ সময়ের প্রতীক, যেখানে আইন, মানবতা ও ন্যায়বোধ একসাথে চলেছে। তার জীবন আমাদের শেখায়— সত্যের পথে থাকলে পথ যত কঠিনই হোক, মানবতার পাশে থাকলে জীবন যত ঝড়ঝাপ্টাই হোক, শেষ পর্যন্ত আলো কখনো নিভে যায় না। তিনি একজন আইনজীবী নন শুধু—তিনি ন্যায়ের এক চলমান প্রতিশ্রুতি। হাইকোর্টের নীরব প্রাঙ্গণে শেষ হয় বৃষ্টিভেজা আড্ডার কথা, আইনের ভাঁজে ভাঁজে জেগে থাকে এক মানবিক জীবনগাথা।
আবুল হাশেম—ন্যায়ের পথে চলা এক নিরব দীপ্ত নাম,
মানুষের অধিকারে গাঁথা যার চার দশকের সংগ্রাম।
মেঘলা ঢাকার আকাশে মিলিয়ে যায় সময়ের ক্লান্ত ছায়া,
থেকে যায় শুধু সত্যের আলো—এক অমলিন মানবিক মায়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here