
–মো.কামাল উদ্দিন
বাংলাদেশের পর্যটন খাত দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাবনার আলোয় উজ্জ্বল, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাঠামোবদ্ধ শক্তিতে রূপ দিতে প্রয়োজন ছিল একটি দৃঢ়, কেন্দ্রীয় এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব। ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে “জাতীয় পর্যটন পরিষদ” গঠন—এবং তার নেতৃত্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করা—এই বাস্তবতারই একটি সুস্পষ্ট ও যুগান্তকারী প্রতিফলন। রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আসনে থাকা প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সম্পৃক্ততা এই পরিষদকে শুধু একটি প্রশাসনিক কাঠামো থেকে উন্নীত করে একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে। এটি নিছক একটি কমিটি নয়; এটি একটি নীতিনির্ধারণী শক্তিকেন্দ্র, যেখানে দেশের পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারিত হবে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতার আলোকে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের তাৎপর্য এখানে বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—পর্যটন এখন আর প্রান্তিক কোনো খাত নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর ও কার্যকর করে তোলে। যে কোনো বড় প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন বা নীতিগত সংস্কার—সবকিছুই সরাসরি সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপিত ও অনুমোদিত হওয়ার সুযোগ পায়, ফলে দীর্ঘসূত্রিতা কমে আসে। এই পরিষদের গঠন বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সমন্বয় ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। স্থানীয় সরকার, অর্থ, পরিকল্পনা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, পরিবেশ, সংস্কৃতি, ভূমি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন, বাণিজ্য, পানি সম্পদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক এবং নৌপরিবহন—এই বিস্তৃত পরিসরের মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রীদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে পর্যটন উন্নয়ন আর কোনো একক দপ্তরের সীমাবদ্ধ দায়িত্ব নয়; এটি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে রূপ নিয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় সবচেয়ে বড় যে সুবিধা তৈরি হবে তা হলো—নীতিগত ঐক্য ও বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা। অতীতে দেখা গেছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে অনেক প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়েছে বা কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু এখন, একই টেবিলে বসে সব মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা যখন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কাজ করবেন, তখন সিদ্ধান্তগুলো হবে সুসমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক এবং সময়োপযোগী। পরিষদের কার্যপরিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এটি শুধু পরিকল্পনা প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপেই এর সক্রিয় ভূমিকা থাকবে। টেকসই পর্যটন উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, তার তদারকি, মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন—সবকিছুই এই পরিষদের দায়িত্ব। বিশেষ করে পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষা—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন নিশ্চিত করার সুযোগ এখানে তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই পরিষদ আন্তর্জাতিক পর্যটন কূটনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাপী পর্যটন এখন কেবল ভ্রমণ নয়; এটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের একটি কার্যকর মাধ্যম। এই পরিষদের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার পর্যটন খাতকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে—যেখানে নিরাপত্তা, অবকাঠামো, সেবা এবং অভিজ্ঞতার মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব একটি বড় শক্তি। বিনিয়োগকারীরা সবসময় একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিকভাবে সমর্থিত কাঠামো খোঁজেন। যখন তারা দেখবেন যে দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সরাসরি একটি খাতের উন্নয়নে সম্পৃক্ত, তখন তাদের আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে পর্যটন অবকাঠামো, হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সেবাখাতে ব্যাপক বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এছাড়া, এই পরিষদ নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি বাস্তবায়নের পথে এগোবে এবং তার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পরিবীক্ষণ করা হবে। এতে করে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তব রূপ পাবে এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। প্রজ্ঞাপনে পরিষদের সভা প্রয়োজন অনুযায়ী আয়োজনের কথা বলা হয়েছে, যা এই কাঠামোকে নমনীয় ও কার্যকর করে তুলবে। প্রয়োজনে নতুন সদস্য কো-অপ্ট করার সুযোগ থাকায় বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবে, যা প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল রাখবে। সবশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত “জাতীয় পর্যটন পরিষদ” কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, একটি উন্নয়ন দর্শন এবং একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি। এই পরিষদ যদি কার্যকরভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন খাত শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবেই নয়, বরং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি এক নতুন যাত্রার সূচনা—যেখানে নেতৃত্বের কেন্দ্রে আছেন প্রধানমন্ত্রী, আর লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশকে বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে একটি উজ্জ্বল, সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা

