আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে কানাডায় শতকোটি টাকা পাচারের অভিযোগ

0
201

নিজস্ব প্রতিবেদক
ইসলামী শরীয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংকসমূহের মধ্যে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি অন্যতম। দীর্ঘদিন যাবৎ এস আলম গ্রুপ এই ব্যাংকের মালিকানায় থাকলেও নিয়ন্ত্রণে ছিলো কেডিএস গ্রুপ। মূলত বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে এস আলম গ্রুপের ভালো সম্পর্ককে ব্যবহার করে কেডিএস গ্রুপ কয়েকশ কোটি টাকা পাচার করেছে বিদেশে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এস আলম গ্রুপ সারাদেশে অর্থপাচার নিয়ে বিতর্কিত হলেও অর্থপাচারকারী কেডিএস গ্রুপকে নিয়ে কোনো আলোচনাই নেই। কিন্তু এস আলম গ্রুপের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখলেও থলের বিড়াল বের হয়ে গেছে। ব্যাংকের আমানতের অর্থ ঋণের নামে লুঠসহ এই গ্রুপের বিরুদ্ধে পাওয়া যাচ্ছে অসংখ্য অভিযোগ। জানা গেছে, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে সরকারের উর্ধ্বতন মহলের সাথে সুসম্পর্ক রেখে কেডিএস গ্রুপের এমডি ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম রহমান ও তার ভগ্নিপতি ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এস এম শামীম ইকবাল ওই ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ঋণের নামে কয়েকশো কোটি টাকা বের করে বিদেশে পাচার করেছেন। এস এম শামীম ইকবাল ও তার স্ত্রী হাসিনা ইকবাল কেডিএস গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। তার শ^শুর কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ক্যাপিটাল সার্ভিসেস লি. এর চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান অতীতে ন্যাশনাল ব্যাংকে পরিচালক থাকাকালীন অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকে তদন্তাধীন অন্তত পাঁচটি মামলার আসামী। সম্প্রতি খলিলুর রহমানও দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়ে জামিনে মুক্তি লাভ করেন। খলিলুর রহমানের অপর জামাতা লিজেন্ড হোল্ডিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান এস এস আবদুল হাই তাদের মালিকানাধীন ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তিনিও আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ছিলেন। কেডিএস পরিবারের এই লুটেরা সিন্ডিকেট আল-আরাফাহ্ ও ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক লুটেপুটে খেলেও মিডিয়ায় আলোচনার বাইরে রয়ে গেছেন। এইচএসবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ কর্তৃক অর্থপাচারকারী এস এম শামীম ইকবাল ও তার স্ত্রী হাসিনা ইকবালের দেশত্যাগে নিশেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া অর্থ দিয়ে তিনি কানাডার অন্টারিও শহরের নর্থ ইয়র্ক এলাকার ৫৭নং ফাইফশায়ার রোডে ১৪০ কোটি টাকা দামের একটি বিলাসবহুল বাড়ি ক্রয় করেছেন। কানাডার এই বাড়িটির একটি ছবি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কানাডার বিভিন্ন শহরে তার আরো অভিজাত বাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে যা আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে অনুসন্ধান করলে খুঁজে পাওয়া যাবে। তিনি ২০১৭ সালে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে টাকা বের করা শুরু করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, ২০১৭ সালের শেষের দিকে বনানী শাখায় এফ এম এগ্রো ফুডস লিঃ এর নামে তিনি একটি চলতি হিসাব খুলেন। পরবর্তীতে ব্যাংকের গুলশান শাখাকে নিরাপদ বিবেচনায় এবং সেলিম রহমানের পরামর্শে এস এম শামীম ইকবাল কর্তৃক ২০১৮ সালের শুরুর দিকে হিসাবটি বনানী শাখা থেকে গুলশান শাখায় স্থানান্তর করা হয় (হিসাব নং ০৫৪১০২০০০৬৭৯৬)। ওই শাখায় জেকটা লিমিটেডের নামে ১৪.১২.২০২২ তারিখে আরেকটি চলতি হিসাব (নং ০৫৪১০২০০০০০৫১) খুলেন। ওই শাখা থেকে প্রথম ধাপে এফ এম এগ্রো ফুডস লিঃ এর অনুকূলে ৩৫.০০ কোটি টাকার ঋণসীমা গ্রহণের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়া শুরু করেন। এস এম শামীম ইকবাল প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল সিইও হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিলেও প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়/শেয়ারহোল্ডার হিসাবে রয়েছে জেকটা লিমিটেড। এই জেকটা লিমিটেড এফ এম এগ্রো ফুড লিমিটেড এর ৮৯% শেয়ারের মালিক। উল্লেখ্য, জেকটা লিমিটেড এর শেয়ারহোল্ডার হিসাবে এসএম শামীম ইকবালের ৫১.৯৪%, ছেলে এসএমএস জাইফ ইকবাল ৩৩.৫৮% এবং শামীম ইকবালের বোন মিসেস শামশাদ বেগম রহমান ১০% শেয়ারের মালিক। অর্থাৎ এফএম এগ্রো লিমিটেডের নেপথ্য মালিক এসএম শামীম ইকবাল। কেডিএস গ্রুপের এমডি সেলিম রহমান তার নিজস্ব প্রভাব খাটিয়ে শামীম ইকবালের সহযোগিতায় এফ এম এগ্রো লিমিটেড এর মাধ্যমে বিপুল অংকের টাকা ব্যাংক থেকে সরিয়ে নেন। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত উক্ত বিনিয়োগ প্রতিবছর নবায়ন ও বিনিয়োগ সীমা বৃদ্ধি করা হয় এবং উক্ত মেয়াদের অধিকাংশ সময়েই সেলিম রহমান ব্যাংকের চেয়ারম্যান অথবা ইসি চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্বে থেকে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেয়ার প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৪ সালে সেলিম রহমান ইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকাকালে এফ এম এগ্রো লিমিটেড এর সাথে শামীম ইকবালের মালিকানাধীন জেকটা লিমিটেড-কে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসাবে যুক্ত করে আরো ৩০.০০ কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগ মঞ্জুরী প্রদানের মাধ্যমে বের করে দেয়ায় ভূমিকা রাখেন। প্রতিষ্ঠান দুটির অনুকূলে প্রদত্ত ঋণের একটি টাকাও ব্যাংকে ফেরত তো আসেনি বরং প্রদত্ত ২০.০০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যাংক ফোর্সড লোন সৃষ্টির মাধ্যমে পরিশোধে বাধ্য হয়। এই সময়টিতেও সেলিম রহমান ইসি চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংকের হিসাব বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে গুলশান শাখা থেকে বাই-মুয়াজ্জাল (জেন) বিনিয়োগ প্রডাক্ট থেকে গৃহীত ৭ কোটি টাকা ঋণের স্থিতি বর্তমানে দাড়িয়েছে ৮.৭০ কোটি টাকায়। এইচপিএসএম শিল্প, মেশিনারি, মুরাবাহা টিআরসহ বিভিন্ন প্রডাক্ট থেকে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ১৩৫.৫০ কোটি টাকা মুনাফাসহ বর্তমান স্থিতি ১৬৪.৭৫ কোটি টাকা। শুধু মুরাবাহা টিআর খাতে ১৩৪টি ডিলের মাধ্যমে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ৭৭.৩৮ কোটি টাকা যার মুনাফাসহ বর্তমান স্থিতি ৯৬.৮৮ কোটি টাকা। কোন টাকা পরিশোধ না করায় এই ৯৬.৮৮ কোটি টাকার পুরোটাই খেলাপী হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়ে গেছে। জেকটা লিমিটেডের অনুকূলে গৃহীত ৪১.৪৮ কোটি টাকার মুনাফাসহ বর্তমান পাওনা ৫০.৯৮ কোটি টাকার বেশিরভাগ ডিলই খেলাপী হয়ে গেছে। কথিত আছে, সেলিম রহমানের পরামর্শে উভয় হিসাব থেকে গৃহীত ঋণের সব টাকা তার ভগ্নীপতি এস এম শামীম ইকবালকে ব্যবহার করে হুন্ডির মাধ্যমে কানাডায় পাচার করেন। এই পাচারের টাকা দিয়েই শামীম ইকবাল কানাডায় একাধিক বিলাসবহুল প্রাসাদ তৈরি ও ক্রয় করেছেন। কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে কেডিএস গ্রুপের পক্ষে নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে মানিলন্ডারিং করেছেন। অভিজ্ঞ তদন্ত দলের মাধ্যমে তদন্ত করা হলে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে তার সকল বিনিয়োগের খোঁজ পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য কেডিএস গ্রুপের চট্টগ্রাম অফিসে গিয়ে বক্তব্য জানতে চাইনে কেউ মুখ খোলতে নারাজ মিডিয়ারকে কেউ বক্তব্য দিচ্ছে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here