
–মো.কামাল উদ্দিন
তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া সমাজ মানবসভ্যতার এক দীর্ঘ ইতিহাসবাহী, জটিল এবং বহুমাত্রিক বাস্তবতা। এই জনগোষ্ঠীকে কখনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে, কখনো সামাজিক প্রান্তিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, আবার আধুনিক যুগে তাদের পরিচয়কে মানবাধিকার ও জেন্ডার আইডেনটিটির আলোকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো—স্বীকৃতি, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে এই জনগোষ্ঠী আজও গভীর সংকটের মধ্যে অবস্থান করছে। হিজড়া পরিচয়: ইতিহাস, ভাষা ও ধারণাগত পরিবর্তন “হিজড়া” শব্দের উৎস আরবি “হিজর”, যার অর্থ বিচ্ছিন্ন বা পরিত্যক্ত। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে এটি বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইংরেজি ভাষায় একে ঐতিহাসিকভাবে “Eunuch” বলা হলেও আধুনিক সামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে “Third Gender” শব্দটি বেশি গ্রহণযোগ্য। তবে বর্তমান বৈজ্ঞানিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি বলছে তৃতীয় লিঙ্গ কেবল শারীরিক গঠন নয়; বরং এটি একটি জেন্ডার আইডেনটিটি, যা মানসিক, জৈবিক এবং সামাজিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মগত জেনেটিক ভিন্নতা (যেমন XXY ক্রোমোজোম বা হরমোনাল বৈচিত্র্য) কিছু মানুষের শারীরিক ও মানসিক জেন্ডার পরিচয়ে ভিন্নতা তৈরি করতে পারে। এটিকে কোনো রোগ বা বিকৃতি হিসেবে নয়, বরং মানব বৈচিত্র্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সামাজিক বাস্তবতা: প্রান্তিকতা ও বঞ্চনার চিত্র বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে হিজড়া সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক প্রান্তিকতার শিকার। অনেককে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা বসবাস করতে হয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই তারা বৈষম্যের মুখোমুখি হন। এই বাস্তবতায় অনেকেই জীবিকার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি, অনুষ্ঠানভিত্তিক অর্থ সংগ্রহ কিংবা অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সামাজিক অবহেলা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে আরও জটিল করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তব অন্তর্ভুক্তি এখনো সীমিত। ফলে একটি অংশ সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়ে গেছে। কোতোয়ালী থানার মামলা: অভিযোগ, প্রেক্ষাপট ও তদন্ত চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানাধীন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা দায়েরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। অভিযোগের সারসংক্ষেপ ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী— তিনি একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে সম্পর্ক গড়ে ওঠে পরবর্তীতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে দীর্ঘ সময় মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়
একটি নির্দিষ্ট সময়সীমায় তাকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয় পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি পরিবারকে জানান এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এজাহারে আরও বলা হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সম্ভাব্য মানবপাচার সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি গুরুত্বসহকারে তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণের কাজ চলছে। সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। মানবাধিকার কর্মী ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু একটি অপরাধ নয়—বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। কারণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্বল অবস্থান অনেক সময় তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের শোষণ ও নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। “কৃত্রিম হিজড়া তৈরি”–সংক্রান্ত অভিযোগ: এক ভয়াবহ আলোচনার জন্ম সম্প্রতি আরেকটি পৃথক ঘটনায় রাজধানীতে একটি চক্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে, যেখানে অবৈধ চিকিৎসা কার্যক্রমের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তিকে তৃতীয় লিঙ্গে রূপান্তরের চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। অভিযোগের মূল বিষয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কিছু ব্যক্তিকে আটক করা হয় এবং অভিযোগ অনুযায়ী— ভুয়া পরিচয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো
কসমেটিক ও হরমোন সংক্রান্ত প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হতো অর্থের বিনিময়ে শরীরগত পরিবর্তনের চেষ্টা করা হতো
কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ সার্জিক্যাল হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠে তদন্তে জব্দ করা হয় বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধপত্র। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই ঘটনা একটি গভীর প্রশ্ন সামনে আনে— মানুষের জেন্ডার পরিচয় কি “তৈরি” করা সম্ভব, নাকি এটি জন্মগত ও মানসিক বাস্তবতার ফল? বিশেষজ্ঞদের মতে, জেন্ডার আইডেনটিটি কোনো বাহ্যিক চাপ বা অবৈধ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা যায় না। বরং এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি মানসিক ও জৈবিক বিষয়। নৈতিক ও চিকিৎসা দৃষ্টিকোণ
চিকিৎসা নৈতিকতা অনুযায়ী—অযোগ্য ব্যক্তি দ্বারা চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা অপরাধ জোরপূর্বক শারীরিক পরিবর্তন মানবাধিকারের লঙ্ঘন অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা প্রদান গুরুতর অনৈতিক কাজ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কার্যক্রম শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, বরং মানবদেহ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
হিজড়া সমাজে অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও বাস্তবতা হিজড়া সম্প্রদায়ের একটি নিজস্ব সামাজিক কাঠামো রয়েছে, যেখানে “গুরু মা” বা নেতৃত্বভিত্তিক ব্যবস্থা প্রচলিত। বিভিন্ন এলাকায় এই গোষ্ঠীগুলো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভক্ত থাকে। এই কাঠামো একদিকে তাদের সামাজিক সংগঠনকে শক্তিশালী করে, অন্যদিকে কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্নও তৈরি করে। মানবাধিকার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অভাব শিক্ষার সুযোগ সীমিত কর্মসংস্থানে বৈষম্য নিরাপত্তাহীনতা আইনগত সুরক্ষার দুর্বল বাস্তবায়ন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতে হলে প্রয়োজন— শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন সরকারি চাকরি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে সুযোগ স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ সুবিধা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি সংকটের গভীর বিশ্লেষণ এই দুই ধরনের ঘটনা—একটি কোতোয়ালী থানার মামলা, আরেকটি অবৈধ চিকিৎসা ও “কৃত্রিম হিজড়া তৈরি”–সংক্রান্ত অভিযোগ—একই বাস্তবতার ভিন্ন দিক নির্দেশ করে। প্রথমটি দেখায় সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, প্রান্তিকতার দুর্বলতা ও সম্ভাব্য অপরাধ চক্রের উপস্থিতি। দ্বিতীয়টি দেখায় চিকিৎসা নৈতিকতা লঙ্ঘন, মানবদেহের ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং একটি সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীকে ঘিরে অর্থনৈতিক শোষণের ঝুঁকি। সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— ১. আইন প্রয়োগ মানবপাচার, শোষণ বা অবৈধ চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। ২. সামাজিক অন্তর্ভুক্তি তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীকে আলাদা নয়, বরং সমাজের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। ৩. শিক্ষা ও কর্মসংস্থান দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না দিলে প্রান্তিকতা আরও গভীর হবে। ৪. সচেতনতা বৃদ্ধি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে কোনো আইনই পুরোপুরি কার্যকর হবে না। তৃতীয় লিঙ্গ সমাজ কোনো বিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক গোষ্ঠী নয়; তারা মানব বৈচিত্র্যের অংশ। তাদের জীবন, সংগ্রাম ও পরিচয়কে বোঝা এবং সম্মান করা একটি আধুনিক ও সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কোতোয়ালী থানার মামলা কিংবা অবৈধ চিকিৎসা কার্যক্রম–সংক্রান্ত অভিযোগগুলো শুধুমাত্র আইনগত ঘটনা নয়; এগুলো আমাদের সমাজের ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতা ও মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। অতএব, প্রশ্নটি আর শুধু “তারা কারা” নয়—বরং “আমরা তাদের কিভাবে দেখছি এবং কতটা মানবিক হতে পারছি

