“অপপ্রচারের দেয়ালে সত্যের কড়া নাড়া: অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর দীর্ঘ সংগ্রাম, সততা ও পেশাদারিত্বের গল্প-

0
136

 -মো. কামাল উদ্দিনঃ বাংলাদেশে একজন সরকারি কর্মকর্তার মূল্যায়ন প্রায়ই তার কর্মদক্ষতা দিয়ে নয়, বরং গুজব, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা দিয়ে করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা আরও প্রকট। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে ঘিরেও এমন কিছু আলোচনা ও অপপ্রচার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আমাকে দীর্ঘদিনের একজন সাংবাদিক হিসেবে কিছু ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরতে বাধ্য করেছে। আমি এই লেখা কারও পক্ষ নিয়ে লিখছি না। কাউকে খুশি করার জন্যও লিখছি না। লিখছি কারণ ইতিহাস বিকৃত হতে দেখলে নীরব থাকা একজন সাংবাদিকের কাজ নয়। আমার বাড়িও বোয়ালখালী এবং ওয়াহিদুল হক চৌধুরী চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর সন্তান। তাঁকে আমি সরাসরি কাছে পেয়েছি এসি ডবি হিসেবে লালদিঘির ডিবি অফিসে তার আগে এসি ডিবি ছিল বাবুল আকতার তখন ক্রাইম নিউজের সুবাদে ডিবির সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার দায়িত্ব- তাকে এবং তার পুরো পরিবারকে আমি আগে থেকে জানলেও কিন্তু সেই পুলিশ অফিসার হিসেবে তার সাথে প্রথম পরিচয় ডিবিতে, তা-ও আবার তার স্কুল বন্ধু রব্বানী সহ- রব্বানী হচ্ছে বাকলিয়ার’ আমার এক “ছোট্ট ভাই-তবে ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর বাবা আহমেদুল হক চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার। তিনি এমন এক সময় দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যখন বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল। তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নানা আলোচনা থাকতে পারে, কিন্তু এটাও সত্য যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন। অবসরের পর তিনি কোনো রাজনৈতিক পদ, সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা বিশেষ প্রভাবের আশ্রয় নেননি; বরং চকবাজারে চা পাতার ব্যবসা করে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সৎ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করেছেন। আজকের বাংলাদেশে যেখানে অবসরের পরও অনেক কর্মকর্তা বিত্ত-বৈভবের পাহাড় গড়ে তোলেন, সেখানে একজন সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার সাধারণ ব্যবসায়ী হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন—এটিও একটি ইতিহাস। ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর ছাত্রজীবন ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে উত্তাল সময়ের সাক্ষী। তখন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘাত ছিল ভয়াবহ। সহিংসতা, খুন, সন্ত্রাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, সেশনজট—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। সেই সময়ের রাজনীতি যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির ছিল পরস্পরের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। আমার জানা ও দেখা অনুযায়ী, ওয়াহিদুল হক চৌধুরী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু তাকে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার পক্ষে কোনো বাস্তব ভিত্তি আমি কখনো দেখিনি। বরং সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা জানলে এমন অভিযোগ কতটা অসংগত, তা সহজেই বোঝা যায়।
আমি তাকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি। তার কর্মজীবনের অনেক পর্যায় কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অসংখ্য পুলিশ কর্মকর্তার উত্থান-পতন, সাফল্য-বিতর্ক এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা দেখেছি। কিন্তু ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অসততা, অর্থনৈতিক দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ কখনো শুনিনি। বরং আমি দেখেছি এক দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস। পুলিশ প্রশাসনে সবাই জানেন, ভালো পোস্টিং, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং সময়মতো পদোন্নতি সব সময় কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে হয় না। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বিবেচনা, প্রভাব, লবিং এবং নানা বাস্তবতা কাজ করে। সেই বাস্তবতার শিকার হয়েছিলেন ওয়াহিদুল হক চৌধুরীও। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা যেখানে শহুরে আরামদায়ক দায়িত্ব খুঁজেছেন, সেখানে তিনি পাহাড়ের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেছেন। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে কত জটিল, তা যারা জানেন, তারা বুঝবেন এই দায়িত্ব কোনো সাধারণ দায়িত্ব নয়। ২০১৬ সালের দিকে তিনি চট্টগ্রামে একটি তুলনামূলক ভালো কর্মস্থলে আসার জন্য বহু চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় চট্টগ্রামের প্রয়াত জননেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সাক্ষাতের কিছু ছবিও আমি সহ অনেকের কাছে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই যোগাযোগ রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিন পাহাড়ে দায়িত্ব পালনের পর স্বাভাবিক কর্মপরিবেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা থেকে। আজ যারা সেই ছবিগুলো দেখিয়ে রাজনৈতিক রং খুঁজতে চান, তারা হয়তো জানেন না—তখন তিনি ছিলেন একজন ক্লান্ত কর্মকর্তা, যিনি শুধু একটি স্বাভাবিক পোস্টিং চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও তার ভাগ্য বদলায়নি। অনেকে জানেন, সে সময় গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ছিল প্রশাসনের অলিখিত বাস্তবতা। ওয়াহিদুল হক চৌধুরী সেই পথে হাঁটেননি। ফলে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়েছে। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। যে মানুষ নিজের সততা বিক্রি করেন না, তাকে হয়তো সাময়িকভাবে বঞ্চিত করা যায়; কিন্তু স্থায়ীভাবে থামিয়ে রাখা যায় না। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসন, অর্থ, অপরাধ ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রশংসিত হয়। পরবর্তীতে সিএমপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও তিনি একই পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আজ যারা তাকে নিয়ে মন্তব্য করছেন, তাদের অনেকেই হয়তো তার জীবনের সংগ্রামের ইতিহাস জানেন না। জানেন না কত বছর তিনি পদোন্নতি ও পদায়নের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। জানেন না কত কঠিন পরিবেশে দায়িত্ব পালন করেছেন। জানেন না কত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি অসততার পথে হাঁটেননি। আমি বলছি না তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে। পৃথিবীর কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন করতে হলে তার পুরো কর্মজীবন, সততা, দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি অবদান বিবেচনা করতে হবে। আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি—ওয়াহিদুল হক চৌধুরী সেই বিরল কর্মকর্তাদের একজন, যিনি ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্বকে, সুবিধার চেয়ে সততাকে এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে পেশাগত মর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সময়ের বিচার শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে নিরপেক্ষ বিচারক।
আর সময়ের সেই আদালতে ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর পরিচয় কোনো অপপ্রচারের নয়; বরং একজন সৎ, সাহসী, মেধাবী, দায়িত্বশীল এবং পরীক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় হিসেবেই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হবে। সত্য কখনো কখনো দেরিতে আসে, কিন্তু আসে অবশ্যই। আর যখন আসে, তখন অপপ্রচারের সব দেয়াল ভেঙে পড়ে। পরিশেষে আবারও একটি কথা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক পটভূমি কিংবা ছাত্রজীবনের মতাদর্শকে কেন্দ্র করে তাকে আজীবন বিচার করা ন্যায়বিচারের পথ হতে পারে না। ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর বাবা মরহুম আহামেদুল হক চৌধুরী ছিলেন বিএনপির আদর্শে বিশ্বাসী একজন মানুষ। সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই ওয়াহিদুল হক চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে মূল্যায়ন বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বলে অনেকের ধারণা। যোগ্যতা, মেধা, সততা এবং দীর্ঘ কর্মঅভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকেও বঞ্চিত হতে হয়েছে। আজ যখন তিনি নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা এবং কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছেছেন, তখন আবারও তাকে নতুন করে ‘শিবির’ তকমা লাগিয়ে বিতর্কিত করার চেষ্টা সত্যিই দুঃখজনক। ইতিহাসের সত্যকে বিকৃত করে, একজন কর্মকর্তার পুরো কর্মজীবনকে অস্বীকার করে কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপবাদ ছড়িয়ে কাউকে ছোট করা যায়, কিন্তু সত্যকে পরাজিত করা যায় না। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে যতটুকু জেনেছি, দেখেছি এবং দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করেছি, তাতে কখনো তাকে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখতে পাইনি। তাই অনুরোধ থাকবে—মতভেদ থাকুক, রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হোক, সমালোচনাও হোক; কিন্তু তা যেন তথ্য ও সত্যের ভিত্তিতে হয়। একজন সৎ, মেধাবী এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সম্মান ক্ষুণ্ন করার জন্য ভিত্তিহীন অপপ্রচার থেকে আমরা সবাই বিরত থাকি। কারণ ব্যক্তি নয়, শেষ পর্যন্ত সত্যই টিকে থাকে; আর সততা ও কর্মনিষ্ঠার ইতিহাস কোনো অপবাদ দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here