
পুলিশের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কঠোর শৃঙ্খলা, দায়িত্বের ভার, অপরাধ দমনের দৃঢ়তা আর আইনের নির্লিপ্ত প্রয়োগ। মনে হয়, তাঁদের জীবনে বুঝি আবেগের জন্য আলাদা কোনো জায়গা নেই। অথচ মানুষ তো কেবল একটি পদবি বা একটি ইউনিফর্মের নাম নয়। কঠোরতার আবরণের নিচেও একটি কোমল হৃদয় বাস করে, যেখানে সুরের জন্য ভালোবাসা থাকে, কবিতার জন্য আকুলতা থাকে, শিল্পের জন্য গভীর অনুরাগ থাকে। আজ চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির প্রাণবন্ত মিলনায়তনে স্বরলিপি সাংস্কৃতিক অঙ্গন আয়োজিত মধুমাসের ফল উৎসব ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় উপস্থিত হয়ে সেই সত্যটিই নতুন করে উপলব্ধি করলাম। মঞ্চে উঠলেন সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম। প্রতিদিন যাঁর কণ্ঠে থাকে দায়িত্বের দৃঢ়তা, আজ সেই কণ্ঠে ধরা দিল সুরের কোমলতা। মাইক্রোফোন হাতে তিনি যখন গানের প্রথম কলিটি তুললেন, তখন যেন মুহূর্তের জন্য তাঁর পরিচয় বদলে গেল। তিনি আর কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তা নন—তিনি হয়ে উঠলেন একজন শিল্পী, একজন সুরসাধক, একজন হৃদয়বান মানুষ। তাঁর কণ্ঠে ছিল না ক্ষমতার কোনো উচ্চারণ, ছিল না পদমর্যাদার কোনো অহংকার। ছিল কেবল সংগীতের নির্মল আবেদন। প্রতিটি সুর যেন শ্রোতাদের হৃদয়ে আলতো করে নাড়া দিচ্ছিল। তবলা, গিটার ও কিবোর্ডের সুরের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ মিলেমিশে এক অপূর্ব আবহ সৃষ্টি করেছিল। উপস্থিত দর্শকদের করতালি বারবার জানিয়ে দিচ্ছিল—ভালো শিল্পীকে সম্মান জানাতে কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। মঞ্চের পেছনে ছিল দেশীয় নানা ফলের বর্ণিল সাজ। আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, আনারস, তরমুজ—বাংলার মধুমাস যেন রঙ আর সৌরভ নিয়ে নেমে এসেছিল শিল্পকলার মঞ্চে। সেই ফলের উৎসবকে আরও মধুর করে তুলেছিল সংগীতের সুধা। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির মাধুর্য আর মানুষের শিল্পচেতনা আজ একই সুরে বাঁধা পড়েছে। আজকের এই আয়োজন আমাকে একটি গভীর উপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, তাঁরাও শিল্পকে ভালোবাসেন, গানকে ভালোবাসেন, সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন। ইউনিফর্ম তাঁদের দায়িত্বের পরিচয় দেয়, কিন্তু শিল্প তাঁদের মানবিকতার পরিচয় বহন করে। সত্যিই, কঠোরতা মানুষের পেশার অংশ হতে পারে, কিন্তু কোমলতা মানুষের আত্মার পরিচয়। আইন সমাজকে শৃঙ্খলা দেয়, আর সংগীত মানুষকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। এই দুইয়ের অপূর্ব মিলনই যেন আজ দেখা গেল উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলামের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায়।
সন্ধ্যার শেষে মনে হলো, কিছু কিছু মুহূর্ত শুধু দেখা যায় না—অনুভব করতে হয়। আজকের এই সংগীত সন্ধ্যা ছিল ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত। যেখানে পুলিশ কর্মকর্তা নয়, একজন শিল্পী হৃদয় জয় করেছেন তাঁর সুরের জাদু দিয়ে। তাই বলতেই হয়—মাঝে মাঝে বেরসিক পুলিশও এমন রসিক হয়ে ওঠেন, তখন মনে হয় ইউনিফর্মের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে এক অনবদ্য শিল্পীর হৃদস্পন্দন। কর্তব্য তাঁকে দিয়েছে সম্মান, আর সংগীত তাঁকে দিয়েছে মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা

