“গণমানুষের কণ্ঠসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক যোদ্ধা

0
7
 ৫ম মৃত্যুবার্ষিকীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর স্মরণে- “গান কখনো শুধু সুর নয়; কখনো তা প্রতিবাদের ভাষা, কখনো স্বাধীনতার শপথ, আবার কখনো একটি জাতির আত্মপরিচয়ের উচ্চারণ।” এই সত্যটি যাঁরা তাঁদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর। আজ তাঁর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি এই কিংবদন্তি শিল্পীকে, যিনি কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন বাংলাদেশের মাটি, মানুষের সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন ফকির আলমগীর। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত এই দিনেই তাঁর জন্ম যেন ভবিষ্যতের এক সাংস্কৃতিক সংগ্রামীর আগমনের বার্তা বহন করেছিল। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি গানকে মুক্তির সংগ্রামের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি গণসংগীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর কণ্ঠে উঠে আসে কৃষকের কথা, শ্রমিকের কথা, মেহনতি মানুষের স্বপ্ন, বঞ্চিত মানুষের আর্তনাদ এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়। তিনি কখনো ক্ষমতার প্রশংসায় নয়, বরং সত্য, ন্যায় এবং মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর গাওয়া “ও সখিনা…”, “মীমাংসা”, “সব সখিরে পার করিতে…”-সহ অসংখ্য গান আজও মানুষের হৃদয়ে অম্লান। তাঁর কণ্ঠে লোকসংগীত, গণসংগীত ও দেশাত্মবোধক গানের এক অনন্য মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—গান শুধু বিনোদন নয়; গান একটি জাতির বিবেক, একটি সমাজের প্রতিবাদ এবং মানুষের মুক্তির ভাষা। ফকির আলমগীর দীর্ঘদিন বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা-এর নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি একজন লেখক, কলামিস্ট, উপস্থাপক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি বাংলাদেশের গণসংগীতকে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক-এ ভূষিত করে। এই সম্মান শুধু একজন শিল্পীর নয়; এটি ছিল গণসংগীত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামেরও স্বীকৃতি। ২০২১ সালের ২৩ জুলাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বিদায়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন হারিয়েছিল এক সাহসী কণ্ঠসৈনিককে। কিন্তু প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু হয় না। তিনি তাঁর সৃষ্টি, আদর্শ এবং মানুষের ভালোবাসার মধ্যেই চিরঞ্জীব হয়ে থাকেন। আজ, তাঁর প্রয়াণের পাঁচ বছর পরও যখন অন্যায়, বৈষম্য, অসহিষ্ণুতা এবং মানবিক মূল্যবোধের সংকট আমাদের সমাজকে স্পর্শ করছে, তখন ফকির আলমগীরের গান আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর কণ্ঠ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশপ্রেম শুধু মুখের কথা নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, সত্যের পক্ষে কথা বলার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস। আমরা যদি সত্যিই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই, তবে শুধু ফুল দিয়ে নয়; তাঁর আদর্শকে ধারণ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে নিজেদের ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব। ৫ম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণসংগীতের অগ্রদূত এবং গণমানুষের শিল্পীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ তাঁর আত্মার মাগফিরাত দান করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌসে উচ্চ মর্যাদা নসিব করুন।
যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে, গণসংগীতের ধারায় এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ফকির আলমগীরের নাম শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তাঁর কণ্ঠ থেমে গেছে, কিন্তু তাঁর গান আজও বাংলাদেশের হৃদস্পন্দন হয়ে বেঁচে আছে। শ্রদ্ধাঞ্জলিতে—
মো. কামাল উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here