
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
কিছু নেতৃত্ব শুধু দায়িত্ব পালন করে না, দায়িত্বের ভেতর নতুন স্বপ্নের জন্ম দেয়। কিছু মানুষ শুধু একটি বাহিনীকে পরিচালনা করেন না, বরং সহকর্মীদের হৃদয়ে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও পেশাদারিত্বের আলো জ্বালিয়ে দেন। এপিবিএনের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ তেমনই এক নেতৃত্বের প্রত্যাশার নাম। পুলিশের ইউনিফর্ম শুধু একটি পোশাক নয়—এটি মানুষের নিরাপত্তার অঙ্গীকার, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব এবং বিপদের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহসের প্রতীক। সেই ইউনিফর্ম পরা প্রতিটি সদস্যের মনোবল যত দৃঢ় হবে, জনগণের নিরাপত্তার প্রাচীরও তত শক্ত হবে। হাসিব আজিজের নেতৃত্বে এপিবিএনের প্রতিটি সদস্যের মনে জাগুক এই বিশ্বাস—আমরা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী নই; আমরা মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা ও আশার প্রহরী। ঝড় আসবে, সংকট আসবে, কঠিন দায়িত্বও আসবে; কিন্তু প্রশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ পুলিশ সদস্য কখনো দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যায় না। কারণ তার শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়—তার শক্তি সাহসে, শৃঙ্খলায়, সততায়, মানবিকতায় এবং আইনের প্রতি অবিচল আনুগত্যে। এপিবিএনের প্রতিটি সদস্যের প্রতি তাই শ্রদ্ধা—আপনারা রাত জেগে যে নিরাপত্তার প্রহরা দেন, তার মূল্য হয়তো সবসময় দৃশ্যমান নয়; কিন্তু একটি নিরাপদ সকাল, একটি শান্ত নগরী এবং একটি নিশ্চিন্ত পরিবারে আপনাদের সেই নীরব ত্যাগেরই প্রতিচ্ছবি থাকে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন—এপিবিএন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত বাহিনী। সাধারণ পুলিশিংয়ের বাইরে যখন সশস্ত্র অপরাধী, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, ভিআইপি নিরাপত্তা, শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা, বড় ধরনের জনসমাবেশ কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সংগঠিতভাবে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন হয়, তখন এপিবিএনের গুরুত্ব বিশেষভাবে সামনে আসে। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপিবিএনের যাত্রা শুরু ১৯৭৫ সালে এবং The Armed Police Battalions Ordinance, 1979 ও Armed Police Battalion Rules, 1991-এর অধীনে এর আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। বাহিনীর মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, সশস্ত্র অপরাধী চক্র দমন, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা। বর্তমানে APBn-এর ১১টি ব্যাটালিয়ন এবং Special Security and Protection Battalion-এর দুটি ব্যাটালিয়ন রয়েছে বলে বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। Bangladesh Police এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে এপিবিএনের সক্ষমতা, আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা। আর এই সময়েই এপিবিএনের নেতৃত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ, বিপিএম। তাঁর নেতৃত্বে এপিবিএনকে আরও দক্ষ, আধুনিক ও পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তরের প্রত্যাশা তাই অমূলক নয়। হাসিব আজিজের সামনে বড় দায়িত্ব একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রধান হওয়া কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একই সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দর্শন বাস্তবায়নের সুযোগ। হাসিব আজিজের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু—এপিবিএন কীভাবে আজকের দায়িত্ব পালন করবে—তা নয়। প্রশ্ন আরও বড়— আগামী ১০ বছর পর বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতায় এপিবিএনকে আমরা কোথায় দেখতে চাই? কারণ অপরাধের ধরন বদলেছে। অপরাধী এখন শুধু অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামে না। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি, অনলাইন যোগাযোগ, ডিজিটাল অর্থ লেনদেন, সাইবার অপরাধ, আধুনিক চোরাচালান, আন্তঃজেলা অপরাধচক্র এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক।
অতএব, ১৯৭৯ সালে যে বাস্তবতার জন্য এপিবিএনের আইনগত কাঠামো তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। আইন একই ভিত্তি দিতে পারে; কিন্তু সক্ষমতাকে সময়ের সঙ্গে আধুনিক করতেই হবে। আইনের ভিত শক্ত—এখন প্রয়োজন সক্ষমতার বিস্তার এপিবিএনের আইনগত ভিত্তি দুর্বল নয়। ১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশে বাহিনীর উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এপিবিএনের দায়িত্বের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার, সশস্ত্র অপরাধী গ্রেপ্তার এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তার বিষয় রয়েছে। Bangladesh Police এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এপিবিএনের শক্তি শুধু তার অস্ত্রে নয়—তার সংগঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা, দ্রুত মোতায়েনযোগ্যতা এবং বিশেষায়িত দায়িত্ব পালনের সক্ষমতায়। তাই বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার অর্থ শুধু অস্ত্র কেনা নয়। এর অর্থ— মানুষ প্রশিক্ষণ প্রযুক্তি গোয়েন্দা সক্ষমতা যোগাযোগ আধুনিক সরঞ্জাম আইনগত স্পষ্টতা জবাবদিহি। এই আটটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়াতে হবে ভবিষ্যতের এপিবিএনকে। সরকারের কাছে প্রথম প্রস্তাব: এপিবিএনের জন্য ১০ বছর মেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা আমার প্রস্তাব, সরকার এপিবিএনের জন্য একটি ১০ বছর মেয়াদি Master Modernisation Plan গ্রহণ করতে পারে। এই পরিকল্পনার আওতায় পর্যায়ক্রমে নতুন ও আধুনিক সরঞ্জাম; উন্নত সুরক্ষা পোশাক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম; আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা; দ্রুতগামী ও বিশেষায়িত যানবাহন; উন্নত কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা; ড্রোন ও বৈধ নজরদারি প্রযুক্তি; ডিজিটাল ম্যাপিং; আধুনিক প্রশিক্ষণ অবকাঠামো; দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতির সরঞ্জাম; ডিজিটাল ফরেনসিক সহায়তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। এতে একদিকে বাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনাহীনভাবে বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার প্রবণতা কমবে। দ্বিতীয় প্রস্তাব: আধুনিক APBn Training & Research Institute এপিবিএনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের Training, Research & Doctrine Centre প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সেখানে প্রশিক্ষণের বিষয় হতে পারে আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি, মানবাধিকার, জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাস ও সশস্ত্র অপরাধ মোকাবিলা, জিম্মি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগকালীন নিরাপত্তা, সাইবার সচেতনতা, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ, আধুনিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং নেতৃত্বের দক্ষতা। প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে Use of Force Doctrine—কখন, কী পরিস্থিতিতে এবং কতটুকু আইনসম্মত শক্তি প্রয়োগ করা যাবে তার স্পষ্ট ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ। এতে বাহিনীর শক্তি যেমন বাড়বে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের ঝুঁকিও কমবে। তৃতীয় প্রস্তাব: প্রযুক্তিনির্ভর এপিবিএন আজকের অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তি কোনো বিলাসিতা নয়—প্রয়োজন। এপিবিএনের মধ্যে একটি বিশেষায়িত Technology & Intelligence Support Wing গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এর কাজ হতে পারে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অপরাধের প্রবণতা বিশ্লেষণ; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ; অপরাধের ডেটা বিশ্লেষণে সহায়তা; ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা; অপরাধী নেটওয়ার্কের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ; অন্যান্য পুলিশ ইউনিটের সঙ্গে তথ্য বিনিময়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই সংবিধান, প্রচলিত আইন, আদালতের নির্দেশনা ও নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সীমারেখায় হতে হবে। কারণ আধুনিক পুলিশিং মানে শুধু বেশি নজরদারি নয়; আরও বুদ্ধিমান, লক্ষ্যভিত্তিক ও আইনসম্মত পুলিশিং। চতুর্থ প্রস্তাব: দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বিশেষায়িত ইউনিট বড় ধরনের সশস্ত্র অপরাধ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা সংকট কিংবা হঠাৎ বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য ইউনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এপিবিএনের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও প্রশিক্ষিত Rapid Response Teams তৈরি করা যেতে পারে। তাদের নিয়মিত মহড়া, সমন্বিত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে তাদের কার্যক্রমের ক্ষেত্র ও ক্ষমতা স্পষ্টভাবে আইন ও সরকারি নির্দেশনার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। চট্টগ্রামের জন্য এপিবিএনের বিশেষ গুরুত্ব একজন চট্টগ্রামবাসী হিসেবে আমার কাছে এপিবিএনের ৯ এপিবিএন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৯ এপিবিএন চট্টগ্রামে অবস্থান করে এবং তাদের দায়িত্বের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা দায়িত্বের পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিটকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা এবং চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সহায়তার বিষয় রয়েছে। Bangladesh Police চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী নয়; এটি সমুদ্রবন্দর, শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন, পাহাড় ও সমুদ্রের মিলিত একটি কৌশলগত অঞ্চল। চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, শিল্পাঞ্চল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, পর্যটন কেন্দ্র এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় এ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখানে এপিবিএনের সক্ষমতা বৃদ্ধি শুধু চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নয়—জাতীয় অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। শিল্পাঞ্চলে এপিবিএনের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন এপিবিএনের ৭ নম্বর ব্যাটালিয়নের দায়িত্বের উদাহরণটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রয়োজন থেকে এই ইউনিটকে শিল্পাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। Bangladesh Police বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর। তাই শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হলে তার প্রভাব শুধু একটি কারখানায় পড়ে না—উৎপাদন, রপ্তানি, শ্রমিকের জীবন, বিনিয়োগ ও দেশের অর্থনীতির ওপরও পড়ে। এ কারণে শিল্পাঞ্চলে এপিবিএনের দায়িত্বকে আরও আধুনিক প্রশিক্ষণ, সংঘাত নিরসন দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে শক্তিশালী করা যেতে পারে। এপিবিএনের জনবল বাড়ানো প্রয়োজন—কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে বর্তমান সময়ের নিরাপত্তা চাহিদা বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ব্যাটালিয়ন এবং জনবল বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু শুধু সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নতুন সদস্যকে হতে হবে— প্রশিক্ষিত, শারীরিকভাবে সক্ষম, প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন, আইনজ্ঞানসম্পন্ন এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন। একজন দক্ষ এপিবিএন সদস্যকে জানতে হবে— কখন অভিযান পরিচালনা করতে হয়, কখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কখন আলোচনা করতে হয় এবং কখন অন্য ইউনিটের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হয়। এটাই আধুনিক বিশেষায়িত পুলিশিং। সদস্যদের কল্যাণকে আধুনিকায়নের অংশ করতে হবে
একটি বাহিনীর সদস্য যদি দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত আবাসন, অনিয়মিত বিশ্রাম বা পারিবারিক সংকটের মধ্যে থাকেন, তাহলে তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব আশা করা কঠিন। তাই এপিবিএনের আধুনিকায়ন পরিকল্পনায় থাকতে পারে উন্নত ব্যারাক, আধুনিক চিকিৎসা, পরিবার কল্যাণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং সদস্যদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ। সদস্যের পরিবার নিরাপদ থাকলে সদস্যও দায়িত্ব পালনে আরও মনোযোগী হতে পারেন। হাসিব আজিজের নেতৃত্বে ‘People-Centred APBn’ এপিবিএনের আধুনিকায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে জনসম্পৃক্ততা। এপিবিএনকে জনগণ যেন শুধু অস্ত্রধারী বাহিনী হিসেবে না দেখে; বরং নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে দেখে—এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে কমিউনিটি সচেতনতা; স্কুল-কলেজে নিরাপত্তা সচেতনতা; মাদকবিরোধী প্রচারণা; দুর্যোগে মানবিক সহায়তা; নারী ও শিশু নিরাপত্তা সচেতনতা; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে। এতে এপিবিএনের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব কমবে। আইনগত ক্ষমতা বাড়াতে হলে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে এখানে আমি বিশেষভাবে একটি কথা বলতে চাই। এপিবিএনকে শক্তিশালী করার দাবি মানে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়ার দাবি নয়। বরং প্রয়োজন আইনগতভাবে স্পষ্ট ক্ষমতা। কোন ক্ষেত্রে এপিবিএন নিজে ব্যবস্থা নেবে, কোন ক্ষেত্রে জেলা পুলিশকে সহায়তা করবে, কোন ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করবে এবং কোন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা ও তদন্তের প্রক্রিয়া চলবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা দরকার। এতে মাঠপর্যায়ের সদস্যদেরও আইনি বিভ্রান্তি কমবে। এবং জনগণের কাছেও বাহিনীর দায়িত্ব ও ক্ষমতা পরিষ্কার থাকবে। জবাবদিহিই হবে শক্তির দ্বিতীয় নাম এপিবিএনের ক্ষমতা ও সক্ষমতা যত বাড়বে, জবাবদিহিও তত বাড়াতে হবে। আমি মনে করি, একটি আধুনিক এপিবিএনের পাঁচটি নীতি থাকা উচিত আইন প্রতিটি অভিযান আইনের ভিত্তিতে। শৃঙ্খলা প্রতিটি সদস্য কমান্ড কাঠামোর মধ্যে। পেশাদারিত্ব ব্যক্তিগত আবেগ নয়, প্রশিক্ষণ ও প্রটোকল। মানবিকতা অপরাধী দমন করা হবে, কিন্তু নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি নয়। জবাবদিহি প্রতিটি ক্ষমতা প্রয়োগের যুক্তিসংগত নথি ও তদারকি থাকবে। এটাই হতে পারে আধুনিক এপিবিএনের আদর্শ।
হাসিব আজিজের কাছে প্রত্যাশা এপিবিএনের প্রধান হিসেবে হাসিব আজিজের কাছে আমার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা—তিনি যেন বাহিনীকে শুধু প্রচলিত দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আগামী দিনের বাংলাদেশকে সামনে রেখে একটি আধুনিক বিশেষায়িত পুলিশ বাহিনীর রূপরেখা তৈরি করেন। তার নেতৃত্বে একটি “APBn Vision 2035” প্রণয়ন করা যেতে পারে। যেখানে থাকবে কেমন হবে এপিবিএন ২০৩০ সালে? কেমন হবে ২০৩৫ সালে? কতজন জনবল প্রয়োজন? কতটি নতুন ব্যাটালিয়ন প্রয়োজন? কোন কোন অঞ্চলে নতুন ইউনিট প্রয়োজন? কোন প্রযুক্তি প্রয়োজন? কোন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন? কোন ধরনের আইনগত সংস্কার প্রয়োজন? কীভাবে মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে? এসবের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা দরকার। সরকারের কাছে একটি সমন্বিত প্রস্তাব সরকার চাইলে এপিবিএনের জন্য একটি বিশেষ “APBn Modernisation and Capacity Development Programme” গ্রহণ করতে পারে। এর পাঁচটি প্রধান স্তম্ভ হতে পারে, জনবল ও নতুন ব্যাটালিয়ন,আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমত প্রশিক্ষণ ও সদস্য কল্যাণআইন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি এই পাঁচটি বিষয় বাস্তবায়ন করা গেলে এপিবিএনকে আগামী দশকের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য অনেক বেশি প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। এপিবিএন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কোনো অতিরিক্ত অলংকার নয়; এটি প্রয়োজনের সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত সক্ষমতা। ১৯৭৯ সালের আইন থেকে আজকের বাস্তবতা পর্যন্ত এপিবিএনের দায়িত্বের পরিধি ও প্রয়োজনীয়তা পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্যও দেখায় যে বাহিনীটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সশস্ত্র অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও স্থাপনার নিরাপত্তা এবং অন্যান্য পুলিশ ইউনিটকে সহায়তার মতো বহুমুখী দায়িত্ব পালন করছে। Bangladesh Police তাই এখন সময় এসেছে এপিবিএনকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আরও আধুনিক, আরও পেশাদার এবং আরও জবাবদিহিমূলক করে গড়ে তোলার। এখানে অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজের নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক নেতৃত্ব এবং বিশেষায়িত বাহিনীর দায়িত্ব—এই তিনটি অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি যদি সরকারের কাছে একটি সুসংগঠিত আধুনিকায়ন প্রস্তাব তুলে ধরতে পারেন, তাহলে এপিবিএনের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমার বিশ্বাস “শক্তিশালী এপিবিএন মানে শুধু শক্তিশালী অস্ত্র নয়; শক্তিশালী প্রশিক্ষণ, শক্তিশালী প্রযুক্তি, শক্তিশালী নৈতিকতা, শক্তিশালী আইনজ্ঞান এবং শক্তিশালী জবাবদিহি।” আর সেই শক্তির কেন্দ্রে থাকবে জনগণের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা। হাসিব আজিজের নেতৃত্বে এপিবিএন হয়ে উঠুক—আধুনিক বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও আস্থাভাজন বিশেষায়িত পুলিশ বাহিনী।

