
মো. কামাল উদ্দিন
কিছু মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ সময়ের খাতায় কেবল একটি তারিখ হয়ে থাকে, আর কিছু সাক্ষাৎ হয়ে ওঠে স্মৃতির পাতায় লেখা এক একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। আজ ৫ অক্টোবর দুপুর ১২টা, বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তর। ব্যস্ত কর্মদিবসের ভিড়ে একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে যেন কথার ভেতর দিয়ে আবিষ্কার করলাম আরেকটি মানুষকে, যাঁর পোশাক পুলিশের, দায়িত্ব পুলিশের, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর বই, জ্ঞান, দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য গভীর এক মমতা।
তিনি বাংলাদেশ পুলিশের চৌকস, সৎ, নিষ্ঠাবান, বিচক্ষণ ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা ডিআইজি হুমায়ুন কবির।
সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য আমরা যখন পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছাই, তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের স্বাগত জানান। তাঁর আচরণে পদমর্যাদার দূরত্ব ছিল না, ছিল একজন ভদ্র মানুষের স্বাভাবিক সৌজন্য। আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই আলাপ পরিণত হয় প্রাণবন্ত ভাববিনিময়ে।
পুলিশ প্রশাসন থেকে সাংবাদিকতা, সংবাদপত্র থেকে সাহিত্য, পর্যটন থেকে কক্সবাজার, পেশাগত দায়িত্ব থেকে দেশের ভবিষ্যৎ, নানা প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে আসে আমাদের দীর্ঘ আলোচনায়।
বই যখন উপহার নয়, আলোর বার্তা
সাক্ষাতের এক পর্যায়ে আমার দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা, গবেষণা ও লেখালেখির অভিজ্ঞতার ফসল ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা’ বইটি তাঁর হাতে তুলে দিলাম।
বইটি হাতে নিয়েই তিনি যে কথাটি বললেন, তা আমার লেখকজীবনের বহু প্রাপ্তির মাঝেও আলাদা করে মনে রাখার মতো।
তিনি বললেন,
“বই উপহার পৃথিবীর সেরা উপহার। আমি এই বইটি পড়ব, ইনশাআল্লাহ।”
একজন পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন একটি বাক্য শুনে মুহূর্তটি আমার কাছে অন্যরকম হয়ে উঠল। কারণ বইয়ের প্রকৃত মূল্য তার মলাটে নয়, মানুষের চিন্তার দরজা খুলে দেওয়ার ক্ষমতায়। ফুলের সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী, বস্তুগত উপহারের মূল্য সময়ের সঙ্গে কমে যায়; কিন্তু একটি ভালো বই মানুষের মনের ভেতর যে আলো জ্বালায়, তার কোনো মেয়াদ নেই।
ডিআইজি হুমায়ুন কবির বইটির পাতা উল্টিয়ে দেখলেন। শুধু সৌজন্য রক্ষার জন্য নয়, তিনি বিষয়বস্তু বোঝার চেষ্টা করলেন। বইয়ের বিভিন্ন অংশ দেখে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করলেন, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য এ ধরনের বই অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
তাঁর এই মূল্যায়ন আমাকে আনন্দিত করেছে। কারণ একজন লেখকের কাছে পাঠকের প্রশংসা যেমন আনন্দের, তেমনি একজন সচেতন ও পেশাদার মানুষের চিন্তাশীল মূল্যায়ন তার লেখার প্রতি নতুন দায়বদ্ধতাও তৈরি করে।
“আপনার লেখা আমি নিয়মিত পড়ি”
সাক্ষাতের সবচেয়ে আন্তরিক মুহূর্তগুলোর একটি ছিল তাঁর আরেকটি কথা।
তিনি জানালেন, আমার লেখা তিনি নিয়মিত পড়েন এবং আমার লেখালেখি তাঁর ভালো লাগে।
এই স্বীকৃতি কোনো আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন নয়। একজন ব্যস্ত পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা যখন একজন লেখকের লেখা নিয়মিত পড়ার কথা বলেন, তখন সেই কথার মূল্য অনেক গভীর।
আমার লেখা সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষ, অপরাধ, পর্যটন ও সমকালীন নানা বিষয়কে ঘিরে। সেই লেখাগুলোর প্রতি তাঁর আগ্রহ আমার কাছে লেখকের জন্য এক ধরনের নীরব প্রেরণা।
তিনি আরও জানতে পারেন, আমার লেখা ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা’ বইটি সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য রেফারেন্স হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের কথা। বিষয়টি শুনে তিনি আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
আমার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩৪ শুনেও তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন। একজন লেখকের কাছে ৩৪টি বই শুধু সংখ্যা নয়, এটি দীর্ঘ পথের ৩৪টি মাইলফলক, অসংখ্য নির্ঘুম রাত, গবেষণা, চিন্তা, পাঠ ও আত্মত্যাগের সমষ্টি।
অর্থনীতির ছাত্র, সংবাদপত্রেরও একজন অনুরাগী
ডিআইজি হুমায়ুন কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। অথচ সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর যে গভীর শ্রদ্ধা ও আগ্রহ, তা আমাদের আলোচনায় বারবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সমাজে সাংবাদিকতার ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি মনে করেন, সংবাদপত্র শুধু সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি সমাজের আয়না, মানুষের কথা বলার জায়গা এবং রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে একজন সাংবাদিকের আলোচনায় এই জায়গাটিই সবচেয়ে সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরি করে। কারণ পুলিশ ও সংবাদমাধ্যম উভয়েরই মূল দায়িত্ব মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও সত্যের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা, অথচ অসাধারণ ভদ্রলোক
ডিআইজি হুমায়ুন কবিরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের একটি তাঁর পেশাদারিত্ব। দীর্ঘ কর্মজীবনে পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তার ছাপ তাঁর কথাবার্তা ও চিন্তাভাবনায় স্পষ্ট।
কিন্তু পেশাগত দৃঢ়তার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্বে রয়েছে অসাধারণ বিনয়।
পদ বড় হলে অনেক সময় মানুষের চারপাশে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে সেই দেয়াল চোখে পড়েনি। কথাবার্তায় ছিল স্বাভাবিকতা, আচরণে আন্তরিকতা এবং অতিথিদের প্রতি ছিল আন্তরিক আপ্যায়নের ব্যবস্থা।
এই সৌজন্য একজন কর্মকর্তাকে শুধু ভালো কর্মকর্তা নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবেও পরিচিত করে।
কক্সবাজারের স্বপ্ন, পর্যটনের নতুন ভাবনা
আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে কক্সবাজারের কথা।
কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর সঙ্গে আলোচনা হয়। কক্সবাজারকে ঘিরে আমাদের ভাবনা, পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটনের ভূমিকা নিয়ে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন।
কক্সবাজার যে প্রকৃতির অপার দান, পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন নগর হিসেবে এর সম্ভাবনা যে আরও বিস্তৃত করা সম্ভব, এ বিষয়ে তাঁর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আশাবাদী করেছে।
আমার নতুন বই ‘পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ’ বাজারে আসছে শুনে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন। বইটির প্রকাশনা ও প্রচারের সফলতা কামনা করেন।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে পর্যটন নিয়ে এমন গভীর আলোচনা হয়তো অনেকের কাছে বিস্ময়ের হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। পর্যটন নিরাপত্তা চায়, আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা।
‘দি টুরিস্ট’ হাতে, পর্যটনের কথাও
সাক্ষাতের এক পর্যায়ে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দি টুরিস্ট’।
তিনি পত্রিকাটি মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং এর লেখা ও ছাপার মানের প্রশংসা করেন। পর্যটন ও পর্যটনশিল্পের বিকাশে পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
একটি পত্রিকা যখন শুধু সংবাদ ছাপার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চায়, তখন সেটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাবের দায়িত্ব
সাক্ষাতে আমি চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টিও তাঁকে অবহিত করি।
তিনি আমাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান এবং দায়িত্ব পালনে সফলতা কামনা করেন।
একজন সাংবাদিকের কাছে নিজের পেশার মানুষের স্বীকৃতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে সাংবাদিক সংগঠনের দায়িত্বের জন্য অভিনন্দন পাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের।
পেন ইন্টারন্যাশনাল থেকে বিশ্বভ্রমণের কথামালা
আলোচনায় আমার লেখালেখির পাশাপাশি বিশ্ব লেখকদের সংগঠন পেন ইন্টারন্যাশনাল এর সদস্য হিসেবে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথাও উঠে আসে।
সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানুষ ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমাজ বাস্তবতা নিয়ে আমাদের মধ্যে নানা বিষয়ে আলোচনা হয়।
আমি বিশ্বাস করি, একজন লেখকের পৃথিবী যত বিস্তৃত হয়, তার লেখার জানালাও তত বড় হয়। মানুষের জীবন, রাষ্ট্র, সমাজ ও পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা লেখকের কলমকে আরও দায়িত্বশীল করে।
পুলিশের শৃঙ্খলা ও গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রত্যয়
আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বাংলাদেশ পুলিশ।
দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে ডিআইজি হুমায়ুন কবির তাঁর বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। পুলিশের শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব, মর্যাদা ও গৌরব আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় তাঁর কথায় স্পষ্ট।
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে তিনি পুলিশের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাগত মানকে আরও শক্তিশালী করার কাজে নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চান।
একটি বাহিনীর শক্তি শুধু তার অস্ত্রে নয়, তার শৃঙ্খলায়। শুধু ক্ষমতায় নয়, মানুষের আস্থায়। শুধু পোশাকে নয়, দায়িত্ব পালনের সততা ও পেশাদারিত্বে।
আর সেই জায়গাটিতেই ডিআইজি হুমায়ুন কবিরের ভাবনাগুলো আশাব্যঞ্জক।
আমরা যারা সঙ্গে ছিলাম
আজকের এই স্মরণীয় সৌজন্য সাক্ষাতে আমার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডের সভাপতি আবু সৈয়দ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম চৌধুরী এবং সৈয়দুল ইসলাম সাঈদ।
সবার উপস্থিতিতে সাক্ষাৎটি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত ও অর্থবহ।
শেষ কথায় ফিরে আসে সেই একটি বাক্য
সাক্ষাৎ শেষ হওয়ার পরও মনে হচ্ছিল, আজকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোনো ছবি নয়, কোনো পদমর্যাদার পরিচয়ও নয়।
সবকিছুকে ছাপিয়ে বারবার মনে পড়ছিল ডিআইজি হুমায়ুন কবিরের সেই কথাটি,
“বই উপহার পৃথিবীর সেরা উপহার।”
সত্যিই তো, বই এমন এক উপহার যার বয়স বাড়ে, মূল্য বাড়ে, অর্থ বাড়ে। একটি বই একজন মানুষের হাতে গিয়ে কখনো একজন পাঠক তৈরি করে, কখনো একজন চিন্তক, কখনো একজন লেখক, কখনো একটি নতুন প্রজন্ম।
ফুলের সুবাস একদিন মিলিয়ে যায়। উপহারের চাকচিক্য একদিন পুরোনো হয়। কিন্তু একটি ভালো বই মানুষের মনের ভেতর রেখে যায় প্রশ্ন, জ্ঞান, বিবেক ও আলোর বীজ।
আজ পুলিশ সদর দপ্তরের সেই দুপুরে তাই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে রইল কোনো বস্তু নয়, একজন জ্ঞানমনস্ক পুলিশ কর্মকর্তার মুখে উচ্চারিত একটি সরল অথচ গভীর সত্য—
“বই উপহার পৃথিবীর সেরা উপহার।”
সেদিনের সেই কথার ভেতর যেন আমি একজন পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয়ের বাইরে আবিষ্কার করলাম একজন বইপ্রেমী, জ্ঞানমনস্ক, সংস্কৃতিমনা, বিনয়ী ও দেশচিন্তায় নিবেদিত মানুষকে।
আর একজন লেখক হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!

