বড় কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে বিএসইসির একাধিক উদ্যোগ

0
27

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের করপোরেট অর্থায়নে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর অংশ হিসেবে দীর্ঘ ১৬ বছর পর সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ চালু, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করা, করপোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, বাংলাদেশের করপোরেট অর্থায়নের প্রায় ৭৫ শতাংশই ব্যাংকনির্ভর। ফলে দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন কাঠামো এখনো মূলত ব্যাংকঋণকেন্দ্রিক। এই নির্ভরতা কমাতে নতুন কোম্পানির পাশাপাশি শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তি ও আর্থিক সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিএসইসি।

এ লক্ষ্যে বড় দেশীয়, বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করেছে কমিশন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩ সেপ্টেম্বর কয়েকটি বড় কোম্পানি ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে সংস্থাটি।

বড় কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ চালুর মাধ্যমে। গত ৫ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জারি করা সরাসরি তালিকাভুক্তি-সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ আবারও উন্মুক্ত হয়েছে।

এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর বিএসইসির ১,০২৭তম সভায় ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ বাই স্টক এক্সচেঞ্জ) রুলস, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন করা হয়।

প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্য কোম্পানিগুলো আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু না করেও বিদ্যমান শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের তাৎক্ষণিকভাবে নতুন মূলধনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু শেয়ারবাজারে লেনদেনের সুযোগ তৈরি করতে চায়, তাদের জন্য এটি বিকল্প পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি নতুন মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে না। এ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান শেয়ারধারীরা তাঁদের শেয়ার বিক্রি করবেন।

আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার উদ্যোগও নিয়েছে বিএসইসি। কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, আইপিওর প্রাক্‌-আবেদন যাচাইপ্রক্রিয়া পুনর্গঠন করা হচ্ছে। কোম্পানির আর্থিক বিবরণী ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের জবাবদিহি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিরীক্ষকদের দায়িত্ব বাড়িয়ে কমিশনের অনুমোদন প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগে আইপিও অনুমোদনে ১৮ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগলেও এখন তা তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিএসইসির একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রচলিত বুক বিল্ডিং পদ্ধতির পরিবর্তে ডাচ অকশনভিত্তিক মূল্য আবিষ্কার পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তবে পদ্ধতিটির কার্যকর প্রয়োগ নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিধিমালা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।

ব্যাংকঋণের বিকল্প হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস বাড়াতে করপোরেট বন্ড বাজার উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে বিএসইসি। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও জীবনবীমার মতো দীর্ঘমেয়াদি তহবিল পুঁজিবাজারে আনার উদ্যোগ চলছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, দেশের বাজার মূলধন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশের নিচে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

এ লক্ষ্য অর্জনে বড় ও ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি করপোরেট বন্ড এবং সরকারি সিকিউরিটিজের বাজার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও বিনিয়োগের পরিসর বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের ওপর করপোরেট খাতের নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here