“চট্টগ্রাম কসমোপলিট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘিরে কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ-

0
39

নগদ অর্থ, রোগীর বিল, শেয়ার তহবিল ও হাসপাতালের সম্পদ ব্যবহারে প্রশ্ন; প্রতিকার চাইতে গিয়ে হয়রানি, ভয়ভীতি ও সন্ত্রাসী তাণ্ডবের অভিযোগ ভুক্তভোগীদের
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন- দি ডেইলি টুরিস্ট, চট্টলচিত্র :
আটকে থাকা নগদ অর্থ থেকে শুরু করে রোগীর বিল, ফার্মেসির হিসাব, শেয়ার তহবিল, কর্মচারীদের পাওনা ও প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ে একাধিক অভিযোগ। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার পর্যবেক্ষণ বাস্তবায়ন না করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা সাধারণ ডায়েরি, থানায় মামলা করার প্রস্তুতি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ।
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন
চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। একটি হাসপাতালের প্রতিটি আর্থিক লেনদেন, রোগীর বিল, ওষুধ বিক্রির হিসাব, চিকিৎসাসংক্রান্ত ফি, কর্মচারীদের পাওনা এবং শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার অধীনে থাকা অপরিহার্য। অথচ চট্টগ্রাম কসমোপলিট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার-এর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উত্থাপিত একাধিক অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের হিসাব সংরক্ষণ, নগদ অর্থের নিয়ন্ত্রণ, রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের যথাযথ হিসাবভুক্তি এবং ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা হিসাবসংক্রান্ত বিবরণ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার পর্যবেক্ষণ এবং আর্থিক নথির বর্ণনা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালের বিভিন্ন আর্থিক খাতে অসংগতি দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ হস্তান্তর না করা, ব্যাংক থেকে উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ জমা না দেওয়া, রোগীর বিল ও ভর্তি বাতিলের হিসাব, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ, শেয়ার তহবিলে গরমিল, কর্মচারীদের পাওনা এবং হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবহারের বিপরীতে অর্থ আদায়ের প্রশ্ন।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয় যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না হওয়ায় হাসপাতালের আর্থিক স্বচ্ছতা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁরা অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত, প্রকৃত পাওনা নির্ধারণ, অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
তবে উল্লেখিত অর্থের সবগুলোকে প্রমাণিত আত্মসাৎ বা চূড়ান্ত আর্থিক ক্ষতি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। কোনো অর্থ বকেয়া, অনাদায়ী, হিসাবের গরমিল, অনুমোদনহীন ব্যয় কিংবা প্রকৃত আত্মসাতের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা মূল নথি, ব্যাংক বিবরণী, নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
হিসাব বিভাগের দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা বিবরণে বলা হয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত হাসপাতালের হিসাব বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন ম্যানেজার জাহেদুল ইসলাম এবং হিসাবরক্ষক ইলিয়াস খান। ওই সময় সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নগদ অর্থের হিসাব তাঁদের দায়িত্বের আওতায় ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নাসির, আমিন ও রুহুল আমিন দৈনিক বিল পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে হিসাব সংরক্ষণ বিভাগ বিলিং বিভাগের অধীনে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আবু তৈয়ব রাসেল এবং ম্যানেজার জাহেদুল ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী হিসাব সংরক্ষণ বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
তাঁদের আরও দাবি, তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে হিসাব বিভাগে হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত কমিটির কার্যবিবরণী, লিখিত নির্দেশনা, দায়িত্ব বণ্টন এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
নগদ অর্থ হস্তান্তর না করার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে হিসাব সংরক্ষণ বিভাগ বিলিং বিভাগে স্থানান্তরের সময় পূর্ববর্তী নগদ অর্থের হিসাব বাবদ ৮ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৭ টাকা ক্যাশ বিভাগের কাছে হস্তান্তর বা জমা দেওয়া হয়নি।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় হাসপাতালের নগদ অর্থের প্রকৃত স্থিতি কত ছিল, সংশ্লিষ্ট অর্থ কোনো পৃথক হিসাবে রাখা হয়েছিল কি না এবং পরবর্তী সময়ে তা সমন্বয় করা হয়েছিল কি না। ক্যাশবুক, লেজার, দায়িত্ব হস্তান্তরপত্র ও ব্যাংক জমার নথি পরীক্ষা ছাড়া অর্থের চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ সম্ভব নয়।
ব্যাংক থেকে উত্তোলিত অর্থের হিসাব
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ২১ এপ্রিল ২০২২ তারিখে ম্যানেজার জাহেদুল ইসলাম ব্যাংক হিসাব থেকে একক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ১১ লাখ ৯২ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। একই দিনে ক্যাশ বিভাগে ১০ লাখ টাকা জমা দেওয়া হলেও বাকি ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা জমা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
এই লেনদেনের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, উত্তোলন স্লিপ, ক্যাশ রসিদ, ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবের সমন্বয়পত্র পরীক্ষা করা জরুরি।
রোগীর বিল, ভর্তি বাতিল ও ফার্মেসির অর্থ
অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু রোগীর বিল সম্পূর্ণ আদায়ের পর একই দিনে ছাড়পত্র দেওয়া হলে অনুমোদন ছাড়া Admission Cancel দেখিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে বলে পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে।
একই সঙ্গে ২ লাখ ৯৯ হাজার ১৫১ টাকা ওষুধের বিক্রয় বা ফার্মেসিসংক্রান্ত হিসাবে দেখানো হলেও অর্থটি ক্যাশ কিংবা ফার্মেসি বিভাগ বুঝে পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে রোগীর ভর্তি ও ছাড়পত্রের নথি, বিল বাতিলের অনুমোদন, সফটওয়্যারের পরিবর্তন-ইতিহাস, ফার্মেসির বিক্রয় রেজিস্টার এবং অর্থ জমার রসিদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট রোগীদের বিলের সঙ্গে প্রকৃত অর্থ আদায়ের তথ্য মিলিয়ে দেখা হলে অভিযোগের সত্যতা ও আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালের ক্যাশ থেকে ব্যক্তিগত খরচের জন্য ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৯৪৪ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অর্থ Loan/Suspense হিসাবে দেখানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, অর্থগুলো ফেরত জমা দেওয়া বা যথাযথভাবে হিসাব সমন্বয়ের প্রমাণ তাঁরা পাননি। তবে সংশ্লিষ্ট অর্থ ঋণ, অগ্রিম, সাময়িক উত্তোলন, অনুমোদিত ব্যয় নাকি অন্য কোনো খাতে সমন্বয় করা হয়েছে, তা নির্ধারণে মূল হিসাব ও অনুমোদনপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
শেয়ার তহবিলে গরমিল ও বেতন গ্রহণের নথি
২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেয়ার বাবদ আদায়কৃত অর্থের হিসাবে ৮ লাখ ১৬ হাজার টাকার গরমিল রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ, ব্যাংকে জমা, শেয়ার রেজিস্টার ও আর্থিক বিবরণী মিলিয়ে এ অভিযোগ যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া হাসপাতালের ম্যানেজার দীর্ঘ সময় ক্যাশ বিভাগ থেকে নিজের বেতন গ্রহণ করলেও বেতন গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে স্বাক্ষর দেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বেতন রেজিস্টার, পে-স্লিপ এবং ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন পরিশোধের তথ্য পরীক্ষা করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা উচিত।
সার্ভিস চার্জের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ
২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রোগীদের বিলের সঙ্গে বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ যুক্ত করে অর্থ আদায় ও উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে মাসে আনুমানিক ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা এবং দীর্ঘ সময়ের হিসাবে মোট প্রায় ৩ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন প্রশ্নের মুখে রয়েছে।
অভিযোগে Follow-up Charge, Medicine Bill ও বিভিন্ন Service Fee-এর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উল্লিখিত অর্থের সম্পূর্ণটাই অনিয়মিত আদায় বা আত্মসাৎ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে হাসপাতালের অনুমোদিত মূল্যতালিকা, রোগীদের বিল, সার্ভিস চার্জের নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের হিসাব নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কর্মচারীদের পাওনা ও অডিটে উল্লেখিত ব্যয়
২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের অডিট প্রতিবেদনে পাঁচ বছরের ছুটির পাওনা পরিশোধের কথা উল্লেখ থাকলেও ক্যাশবুক ও লেজারে তিন বছরের অর্থ পরিশোধের হিসাব পাওয়া গেছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অবশিষ্ট দুই বছরের ছুটির পাওনা বাবদ ২ লাখ ৯২ হাজার ৯৫০ টাকা কর্মচারীরা পাননি।
এ ছাড়া ২০১৬ ও ২০১৭ সালের অডিট প্রতিবেদনে অপারেশন টিম চার্জ বাবদ ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হলেও সংশ্লিষ্ট হিসাব নথিতে পরিশোধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
কর্মচারীদের ছুটির হিসাব, বেতন রেজিস্টার, অডিট রিপোর্ট, ভাউচার এবং অর্থ গ্রহণের স্বাক্ষর যাচাই করে প্রকৃত পাওনা ও ব্যয়ের সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব
অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা বিবরণে ল্যাপারোস্কপি মেশিনের সহকারী ফি বাবদ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকা অনাদায়ী থাকার কথা বলা হয়েছে। একই মেশিনের ভাড়া বাবদ ২ লাখ ৬২ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতালের ইসিজি মেশিন ব্যবহার করে রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষাপ্রতি ৪০০ টাকা আদায় করা হলেও হাসপাতালের হিসাবে আনুমানিক ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা জমা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালের জুন থেকে হাসপাতালের নিজস্ব এক্স-রে মেশিন ডায়াগনস্টিক কর্তৃপক্ষ ব্যবহার করে আসছে, অথচ তার বিপরীতে প্রাপ্য অর্থ জমা দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।
হাসপাতালের জেনারেটর থেকে ব্যক্তিগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানির রসিদ জেনারেটরের ব্যয় হিসেবে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয় যাচাই করতে মেশিন ব্যবহারের রেজিস্টার, রোগীদের বিল, বিদ্যুৎ সংযোগের নথি, জ্বালানি রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র পরীক্ষা করা জরুরি।
ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে পাওনা-পাল্টাপাওনার বিরোধ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে হাসপাতালের ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। অন্যদিকে, বকেয়া ভাড়া পরিশোধের তাগাদা দেওয়া হলে ডায়াগনস্টিক কর্তৃপক্ষের হিসাব বিভাগ হাসপাতালের ম্যানেজার জাহেদুল ইসলামের সংশ্লিষ্ট রোগী ও তাঁদের আত্মীয়স্বজনের Investigation Bill বাবদ ৯ লাখ টাকা পাওনার দাবি করেছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
এ ধরনের পাল্টাপাল্টি দাবি নিষ্পত্তির জন্য উভয় প্রতিষ্ঠানের হিসাব, রোগীভিত্তিক বিল, অর্থ গ্রহণের রসিদ, চুক্তি এবং দায় স্বীকারের নথি একসঙ্গে নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের Internal Audit Report-এ শেয়ার তহবিলের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং একক স্বাক্ষরে ব্যক্তিগত লেনদেনের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ছিল। কিন্তু এসব বিষয় উঠে আসার পরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে দেখানো হলেও তার পক্ষে যথাযথ প্রমাণপত্র বা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের কর পরিশোধের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে জরিমানাসহ ২ লাখ ৩৯ হাজার ৮১৭ টাকা ব্যাংক হিসাব থেকে কর্তনের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে রয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এসব বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে যথাযথ তদারকির অভাব থাকতে পারে। তবে বোর্ড সদস্য, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা অন্য কোনো ব্যক্তির দায় নির্ধারণের আগে তাঁদের সিদ্ধান্ত, অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা অপরিহার্য।
প্রতিকার চাইতে গিয়ে হয়রানি ও সন্ত্রাসী তাণ্ডবের অভিযোগ
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হিসাবের স্বচ্ছতা, বকেয়া অর্থ এবং আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তোলার পর তাঁরা হয়রানি, ভয়ভীতি এবং সন্ত্রাসী তাণ্ডবের শিকার হয়েছেন।
তাঁদের আরও অভিযোগ, হাসপাতালপক্ষের কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেই কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, আর্থিক অভিযোগের নিষ্পত্তির পরিবর্তে তাঁদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ দায়েরের ঘটনা তাঁদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট জিডি, থানায় দাখিল করা লিখিত অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ছবি-ভিডিও এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো পক্ষের অভিযোগকেই তদন্তের আগেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
থানায় মামলা ও গুরুতর অপরাধের অভিযোগের প্রস্তুতি
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাসপাতালের আর্থিক অনিয়ম, অর্থের হিসাব না পাওয়া, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবহারের অভিযোগ এবং তাঁদের ওপর কথিত হয়রানির বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংকলন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা এবং গুরুতর অপরাধের অভিযোগে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীদের উচিত মূল নথি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, অডিট প্রতিবেদন, বিলের কপি, লেনদেনের প্রমাণ এবং হয়রানির ঘটনার তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া এবং তদন্তে সব পক্ষকে সমান সুযোগ দেওয়া জরুরি।
অভিযোগকারীদের প্রধান দাবি
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে হাসপাতালের প্রাসঙ্গিক আর্থিক হিসাব নিয়ে স্বাধীন ফরেনসিক অডিট, প্রকৃত পাওনা নির্ধারণ, প্রমাণিত অনিয়মের অর্থ উদ্ধার, কর্মচারীদের বৈধ পাওনা পরিশোধ, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
তাঁরা চান, হাসপাতালের বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলোর বিষয়ে লিখিত বক্তব্য দিক এবং প্রয়োজনীয় হিসাবপত্র নিরপেক্ষ নিরীক্ষার জন্য উপস্থাপন করুক। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পাল্টা অভিযোগসহ প্রতিটি বিষয় আইন অনুযায়ী যাচাই করা হোক।
হাসপাতালের প্রতিটি টাকার হিসাব হোক স্বচ্ছ
চট্টগ্রাম কসমোপলিট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারএর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কেবল অর্থের হিসাবের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, রোগীদের স্বার্থ, কর্মচারীদের অধিকার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিষয়।
অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট অর্থ উদ্ধার, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের বক্তব্য গ্রহণ ও ন্যায়সংগত আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
হাসপাতাল কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি রোগী, কর্মচারী, বিনিয়োগকারী ও জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ধামাচাপা না দিয়ে, আবার প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত না করে, স্বাধীন তদন্ত ও স্বচ্ছ হিসাবের মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটন করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান দায়িত্ব।
জনস্বার্থে এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত, অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা এবং হাসপাতালের প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।ভুক্তভোগী অভিযোগকারীদের বক্তব্য
নিরাপত্তা চাই, হয়রানি বন্ধ চাই, ন্যায়বিচার চাই
চট্টগ্রাম কসমোপলিট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিকার চাইতে গিয়ে আমরা হয়রানি, পাল্টা জিডি এবং ভয়ভীতির আশঙ্কায় রয়েছি। আমাদের আশঙ্কা, কথিত সন্ত্রাসী ব্যক্তিদের মাধ্যমে হামলার চেষ্টাও হতে পারে।
আমরা প্রশাসন ও পুলিশের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করুন এবং কোনো মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা-জিডি করা হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।
আমরা সংঘাত নয়, ন্যায়বিচার চাই। ভয়ভীতি নয়, নিরাপত্তা চাই। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও সত্য উদ্‌ঘাটন চাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here