একই মঞ্চে পিতা ও পুত্র: ৩৭ বছরের ব্যবধানে ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়

0
29

এপিবিএনের প্রাথমিক নেতৃত্বে এম. আজিজুল হক, ৩৭ বছর পর একই মঞ্চে তাঁর সন্তান হাসিব আজিজ
মো. কামাল উদ্দিন
ইতিহাসের কিছু ঘটনা সময়ের সীমানা পেরিয়ে স্মৃতি, আবেগ ও উত্তরাধিকারের অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে তেমনই এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় এম. আজিজুল হক ও তাঁর সন্তান হাসিব আজিজকে ঘিরে। প্রায় ৩৭ বছরের ব্যবধানে একই প্রতিষ্ঠানের একই মঞ্চে সালাম গ্রহণ করেছেন পিতা ও পুত্র। দুই প্রজন্মের এই বিরল সংযোগ বাংলাদেশের পুলিশ ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।


১৯৮৯ সালে রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুলের (পিএসটিএস) মঞ্চে সালাম গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন ডিআইজি এম. আজিজুল হক। দীর্ঘ ৩৭ বছর পর, ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর, তাঁর সন্তান অতিরিক্ত আইজিপি ও এপিবিএন প্রধান হাসিব আজিজ একই প্রতিষ্ঠানের সেই মঞ্চে সালাম গ্রহণ করেন। সময়ের ব্যবধানে একই মঞ্চে পিতা ও পুত্রের এমন উপস্থিতি নিঃসন্দেহে এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
এপিবিএনের ইতিহাসে এম. আজিজুল হক এপিবিএনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিকাশের অধ্যায়। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে এপিবিএনের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালের ৩১ মার্চ ‘The Armed Police Battalions Ordinance, 1979’ জারির মাধ্যমে বাহিনীটির আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জারি হওয়া এই অধ্যাদেশ এপিবিএনের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংগৃহীত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন ডিআইজি এম. আজিজুল হক ১৮ এপ্রিল ১৯৮০ থেকে ১৯ জুলাই ১৯৮০ পর্যন্ত এপিবিএনের প্রাথমিক পর্যায়ের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রকাশিত জীবনবৃত্তান্তেও ১৯৮০ সালে ডিআইজি হিসেবে তাঁর এপিবিএনে দায়িত্ব পালনের তথ্য রয়েছে। বাহিনীটির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের শুরুর দিকের এই সময় তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বেতবুনিয়ার পিএসটিএসের ইতিহাস
পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুলেরও রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথপরিক্রমা। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে পার্বত্য অঞ্চলের মহালছড়িতে ‘টেকনিক্যাল জঙ্গল ওয়ারফেয়ার’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮০ সালে এর নাম পরিবর্তন করে পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুল রাখা হয়। ১৯৮২ সালে এটি কক্সবাজারের ডুলাহাজারায় স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯৮৫ সালে রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় বর্তমান অবস্থানে আসে।
সেই হিসাবে ১৯৮৯ সালে এম. আজিজুল হক যখন বেতবুনিয়ার পিএসটিএসের মঞ্চে সালাম গ্রহণ করেন, তখন প্রতিষ্ঠানটি সেখানে চার বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। আর ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর একই মঞ্চে তাঁর সন্তান হাসিব আজিজের সালাম গ্রহণের ঘটনা সেই ইতিহাসে যোগ করেছে নতুন এক অধ্যায়।
পিতার কর্মজীবন থেকে সন্তানের নেতৃত্ব
এম. আজিজুল হক ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান পুলিশ সার্ভিসে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি ১৯৯৬ সালের ২২ এপ্রিল বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৭ সালের ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
অন্যদিকে, তাঁর সন্তান হাসিব আজিজ ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের মে মাসে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে তাঁকে এপিবিএনের প্রধান হিসেবে পদায়ন করা হয়।
পিতার কর্মজীবনের সঙ্গে যে বাহিনীর প্রাথমিক বিকাশের ইতিহাস জড়িয়ে আছে, বহু বছর পর সেই বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে সন্তানের কাঁধে। আর সেই দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় বেতবুনিয়ার পিএসটিএসের একই মঞ্চে সালাম গ্রহণের ঘটনাটি হয়ে ওঠে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।


ইতিহাসের পাতায় দুই প্রজন্মের স্মৃতি
এম. আজিজুল হক এপিবিএনের প্রাথমিক বিকাশপর্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর সন্তান হাসিব আজিজ বহু বছর পর সেই বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ ও বাহিনীর কর্মপরিধি বেড়েছে। কিন্তু দায়িত্ববোধ, পেশাদারিত্ব ও দেশসেবার অঙ্গীকারের গুরুত্ব আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
এটি কেবল একটি পরিবারের গৌরবের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসেরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৮৯ সালে পিতার সালাম গ্রহণ এবং ২০২৬ সালে একই মঞ্চে সন্তানের সালাম গ্রহণ—দুই ঘটনার মাঝখানে কেটে গেছে ৩৭টি বছর। পিতা আজ পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের ইতিহাসের সঙ্গে সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণের এই যোগসূত্র এক অনন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।
সময় চলে যায়, প্রজন্ম বদলায়, দায়িত্বের পরিধি পাল্টায়; কিন্তু ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত কখনো মুছে যায় না। বেতবুনিয়ার সেই মঞ্চে পিতা ও পুত্রের দুই সময়ের উপস্থিতি বাংলাদেশের পুলিশ ইতিহাসে তেমনই এক বিরল ও আবেগঘন অধ্যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here