
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
কিছু কণ্ঠ কখনো নীরব হয় না। মানুষ চলে যায়, সময় বদলে যায়, কিন্তু সেই কণ্ঠ থেকে যায়—মাটির ভেতরে, মানুষের স্মৃতিতে, নদীর ঢেউয়ে, শীতল বাতাসে। শেফালী ঘোষ ছিলেন তেমনই এক কণ্ঠ। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান তাঁর কণ্ঠে শুধু গান হয়ে ওঠেনি—হয়ে উঠেছে মানুষের জীবন, বিরহ, প্রেম, সাধনা আর বিশ্বাসের অবিনাশী দলিল। আজ তাঁর ঊনবিংশ প্রয়াণদিবসে আমরা কেবল একজন শিল্পীকে স্মরণ করছি না; আমরা স্মরণ করছি চট্টগ্রামের লোকসংস্কৃতির এক সম্পূর্ণ অধ্যায়, এক উজ্জ্বল সময়কে—যার আলো আজও নিভে যায়নি। জন্ম থেকে গানের পথে—এক অন্তর্গত ডাক ১৯৪১ সালের ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগোপাড়া গ্রামে জন্ম নেন শেফালী ঘোষ। শৈশব থেকেই তাঁর ভেতরে ছিল সুরের অনিবার্য টান। গানের প্রতি ভালোবাসা ছিল তাঁর রক্তে মেশানো। পারিবারিক অনুপ্রেরণা আর অন্তরের আকুলতাই তাঁকে নিয়ে যায় সংগীতের পথে—যে পথ কখনো সহজ ছিল না, কিন্তু ছিল গভীর ও সত্য। তেজেন সেন, শিবশঙ্কর মিত্র, জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদ বড়ুয়ার মতো গুণী ওস্তাদদের সান্নিধ্যে তাঁর কণ্ঠ পায় শুদ্ধতা, তালিম ও আত্মবিশ্বাস। শেফালী ঘোষ ছিলেন সেই শিল্পীদের একজন, যাঁরা সাধনাকে জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন—গান তাঁর কাছে ছিল ইবাদত।পাঁচ দশকের সাধনা—সহস্রাধিক গানের উত্তরাধিকার প্রায় পাঁচ দশক ধরে শেফালী ঘোষ অবিরাম গেয়েছেন। সহস্রাধিক গান তাঁর কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে দুই শতাধিক অ্যালবাম। আঞ্চলিক গান, পল্লিগীতি, মাইজভান্ডারী ও আধ্যাত্মিক গান—সব ধারাতেই তিনি রেখে গেছেন অনন্য ছাপ।
“যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম”, “ও রে সাম্পানওয়ালা”, “ছোট ছোট ঢেউ তুলি”এই গানগুলো কেবল শোনা হয় না, অনুভূত হয়। এসব গানে আছে নদীর ঢেউ, নৌকার ছলাৎছল, অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস, প্রেমের নির্ভরতা আর জীবনের বাস্তবতা। মুক্তিযুদ্ধে কণ্ঠসৈনিক ১৯৭১ সালে, যখন দেশ রক্তাক্ত, মানুষ দিশেহারা শেফালী ঘোষ তখন কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন যুদ্ধের দায়িত্ব। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী। তাঁর গান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছে, মানুষের মনে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন গানও অস্ত্র হতে পারে। বিশ্বমঞ্চে চট্টগ্রামের গান শেফালী ঘোষ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে দেশের সীমানায় আটকে রাখেননি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিশটিরও বেশি দেশে সংগীত পরিবেশন করে তিনি বিশ্বকে শুনিয়েছেন বাংলার মাটির কথা। তাঁর কণ্ঠে চট্টগ্রাম পৌঁছে গিয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। শ্যাম শেফালী–হালী: একটি ইতিহাস চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের স্বর্ণযুগের কথা বললেই অবধারিতভাবে উচ্চারিত হয় তিনটি নাম আব্দুল গফুর হালী, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালী ঘোষ। চট্টগ্রাম বেতারে যখন শ্যামসুন্দরের কণ্ঠে গান প্রচার হচ্ছিল, তখন শেফালী ঘোষের দৃপ্ত উচ্চারণ “উদা শ্যামরে দিলে অইতো ন, আঁরেও গান দেওন” এই একটি বাক্যেই প্রকাশ পায় তাঁর আত্মমর্যাদা,আত্মবিশ্বাস ও শিল্পীর সত্তা। আব্দুল গফুর হালীর লেখা“ন যাইও ন যাইও আঁরে ফেলাই, বাপের বাড়িত ন যাইও” গানটি আঞ্চলিক গানের ধারাই বদলে দেয়। প্রতিষ্ঠিত হয় কিংবদন্তি জুটি শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালী ঘোষ। বিরহের অমর গান ও শ্যাম রেঙ্গুন ন যাইওরে’ শেফালী ঘোষের কণ্ঠে গাওয়া “ও শ্যাম রেঙ্গুন ন যাইওরে” আজও বিরহী নারীর চোখ ভিজিয়ে দেয়। এটি শুধু গান নয় এটি চট্টগ্রামের সামাজিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল, প্রবাস আর অপেক্ষার বেদনাময় কাব্য। সাধনা, বিনয় ও চিরন্তন প্রভাব খ্যাতির চূড়ায় থেকেও শেফালী ঘোষ ছিলেন বিনয়ী। তিনি বিশ্বাস করতেন গান আগে, খ্যাতি পরে। নিজেকে নিঃশেষ করেছেন আঞ্চলিক গানের জন্য। আজকের প্রজন্মের বহু শিল্পী তাঁর কণ্ঠ থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়। শেষ নয় এক অনন্ত উপস্থিতি ২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেফালী ঘোষ আমাদের ছেড়ে গেলেও তাঁর কণ্ঠ আজও বেঁচে আছে চট্টগ্রামের অলিগলিতে, নদীর পারে, মানুষের হৃদয়ে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর, তাঁর ঊনবিংশ প্রয়াণদিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় বলি শেফালী ঘোষ, আপনি ছিলেন না শুধু একজন শিল্পী আপনি ছিলেন চট্টগ্রামের কণ্ঠ। আপনি আছেন, থাকবেন চিরকাল। বিনম্র শ্রদ্ধা।
