শিরোনাম
➤কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে আইজিপির নির্দেশ➤রাউজানে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অস্ত্রসহ ৩ জন গ্রেপ্তার➤কোতোয়ালীতে ৪৪০০ পিস ইয়াবাসহ দুইজন গ্রেপ্তার➤খুলশীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার➤বোয়ালখালীতে বালুর অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ-বৈধ বালুমহাল নেই, অথচ প্রতিদিন শত শত ট্রাক। চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীলে ৩০টির বেশি বালু বিক্রয়কেন্দ্রের অভিযোগ। রাজস্ব, পরিবেশ ও জনদুর্ভোগের দায় কার?➤চন্দনাইশের প্রতারক মামুনের প্রতারণায় সর্বশান্ত সৌদি আরব মদিনা শহরের বহু প্রবাসী।➤ভোটের এক দিনের আড়ালে হাজার দিনের প্রস্তুতি ব্যালটের পেছনে মানুষ, মানুষের পেছনে প্রশিক্ষণ: নির্বাচনী প্রশিক্ষণের বিস্তৃত পরিসর নিয়ে মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের সঙ্গে একান্ত আলাপ➤বোয়িং কেনার পেছনে ‘গোপন এজেন্ডা নেই’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী➤পুঁজিবাজারে ১৭ হাজার ৩৩২ ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর টাকা ফেরত দেওয়া শুরু➤নির্বাচনী প্রশিক্ষণের বিস্তৃত পরিসর নিয়ে মহাপরিচালক হাসানুজ্জামানের সঙ্গে একান্ত আলাপ নির্বাচন ব্যবস্থাপনা থেকে আচরণ, অফিস পরিচালনা, ক্রয়ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ

― Advertisement ―

কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে আইজিপির নির্দেশ

অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধ হিসেবে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। একই সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও...

ভোটের এক দিনের আড়ালে হাজার দিনের প্রস্তুতি ব্যালটের পেছনে মানুষ, মানুষের পেছনে প্রশিক্ষণ: নির্বাচনী প্রশিক্ষণের বিস্তৃত পরিসর নিয়ে মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের সঙ্গে একান্ত আলাপ

Homeসম্পাদকীয়ভোটের এক দিনের আড়ালে হাজার দিনের প্রস্তুতি ব্যালটের পেছনে মানুষ, মানুষের...

মো. কামাল উদ্দিনঃ

একটি নির্বাচন বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, এর ভেতরের কর্মযজ্ঞ ততটাই বিস্তৃত, জটিল ও বহুমাত্রিক। ভোটের দিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভোটকেন্দ্র খুলে যায়, মানুষ ভোট দেয়, ভোট গণনা হয় এবং ফলাফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি দৃশ্যমান অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু সেই একটি দিনের পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি, আইন, আচরণবিধি, জনসম্পৃক্ততা এবং অসংখ্য মানুষের দায়িত্বশীল কর্মযজ্ঞ।

অর্থাৎ নির্বাচন কেবল ভোটের দিনের ঘটনা নয়। নির্বাচন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল।

এই বাস্তবতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের সঙ্গে

আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে আমার একান্ত সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি অত্যন্ত ধৈর্য, আন্তরিকতা ও খোলামেলা মনোভাব নিয়ে নির্বাচনী প্রশিক্ষণের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন।

আলাপচারিতায় উঠে আসে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, অফিস পরিচালনা, আচরণ ও শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ, যোগাযোগের ধরন, প্রশাসনিক দক্ষতা, সরকারি ক্রয় ও উপকরণ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সচিবালয়ের অধীনে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি আঞ্চলিক, জেলা এবং উপজেলা বা থানা পর্যায়ে মাঠ কার্যালয় রয়েছে। ফলে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের পরিধিও স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত।

নির্বাচন শুধু ভোটের দিন নয়

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই আলোচনায় আসে একটি মৌলিক প্রশ্ন। নির্বাচনকে আমরা সাধারণত ভোটগ্রহণের

দিনকে কেন্দ্র করে দেখি। কিন্তু একটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য যে দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন, তার কতটা জুড়ে রয়েছে প্রশিক্ষণ?

মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, নির্বাচন পরিচালনা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। এখানে শুধু ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাকে একটি ব্যালট বাক্স বা ভোটিং পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একজন কর্মকর্তা কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, কীভাবে ভোটার ও প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণ করবেন, কীভাবে সংকট মোকাবিলা করবেন, কীভাবে আইন ও বিধি অনুসরণ করবেন, কীভাবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন, এসব বিষয়ও প্রশিক্ষণের অংশ।

কারণ একটি নির্বাচনকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে শুধু নিয়ম জানা যথেষ্ট নয়। নিয়ম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষতা, সংযম, দায়িত্ববোধ এবং পেশাগত আচরণ।

প্রশিক্ষণ মানে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়

সাক্ষাৎকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রশিক্ষণের পরিধি নিয়ে তাঁর বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি।

নির্বাচন একটি জাতীয় প্রক্রিয়া। তাই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নির্বাচন পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য অংশীজনের জন্যও প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এখানে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য কাউকে কোনো রাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রত্যেক অংশীজনকে তাঁর নিজ নিজ দায়িত্ব, অধিকার, আচরণবিধি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মৌলিক বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া।

আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় এই অংশীজনভিত্তিক ধারণাটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও ভোটার শিক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং নির্বাচনী প্রশিক্ষণসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমের উপস্থিতি দেখা যায়।

একজন কর্মকর্তার আচরণও নির্বাচনের অংশ

সাক্ষাৎকারে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনোযোগ

আকর্ষণ করে। সেটি হলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ ও শিষ্টাচার।

একজন সরকারি কর্মকর্তা আইন জানেন, বিধি জানেন, দায়িত্ব জানেন, কিন্তু মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণ যদি যথাযথ না হয়, তাহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রশাসনিক সেবার মান প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

একজন ভোটার যখন ভোটকেন্দ্রে যান, তিনি নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর আচরণের মধ্য দিয়েই অনেক সময় পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে উপলব্ধি করেন।

সুতরাং প্রশিক্ষণের মধ্যে আচরণ, শিষ্টাচার, যোগাযোগের ভাষা, মানুষের সঙ্গে কথা বলার ধরন এবং দায়িত্ব পালনের সময় ধৈর্য ও সংযমের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এটি কেবল একটি অফিস ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এটি নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কেরও বিষয়।

কথা বলার ভাষা থেকে দায়িত্ব পালনের দর্শন

একজন কর্মকর্তার কথা বলার ধরন তাঁর পেশাগত পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভোটার, প্রার্থী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক কিংবা সাধারণ

মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় একজন কর্মকর্তাকে একই সঙ্গে বিনয়ী, স্পষ্ট এবং দায়িত্বশীল হতে হয়।

কোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য পরিস্থিতিকে জটিল করতে পারে। আবার যথাযথ তথ্য ও শান্ত আচরণ অনেক সমস্যাকে শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

তাই প্রশিক্ষণকে শুধু বই, বিধি বা নির্দেশিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।

অফিস পরিচালনাও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার অংশ

নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অধীনে ১০টি আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়, ৬৪টি জেলা পর্যায়ের নির্বাচন কার্যালয় এবং উপজেলা বা থানা পর্যায়ে ৫১৪টি কার্যালয় রয়েছে।

এত বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামোর কার্যক্রম সমন্বয় করতে হলে শুধু নির্বাচনকালীন প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। অফিস পরিচালনা, নথি ব্যবস্থাপনা, জনসেবা, সময় ব্যবস্থাপনা,

প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, তথ্য সংরক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তঃদপ্তর যোগাযোগের মতো বিষয়েও দক্ষতা প্রয়োজন।

একটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পেছনে ভোটকেন্দ্রের দৃশ্যমান কাজের পাশাপাশি এই অদৃশ্য প্রশাসনিক কাঠামোটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি ক্রয় ও উপকরণ ব্যবস্থাপনা

আলোচনায় আসে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা ও নির্বাচনী উপকরণ ব্যবস্থাপনার বিষয়ও।

একটি বড় নির্বাচন পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ উপকরণ, সরঞ্জাম, কাগজপত্র, প্রযুক্তিগত সামগ্রী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়।

এখানে পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, বিধিবিধান অনুসরণ, প্রয়োজন নিরূপণ, সংরক্ষণ এবং সময়মতো সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি উপকরণ যথাসময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছানো থেকে শুরু করে তার হিসাব সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই নির্বাচন ব্যবস্থাপনার অংশ।

অর্থাৎ নির্বাচন পরিচালনার দক্ষতা শুধু ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত কর্মকর্তার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। এর

পেছনে রয়েছে একটি বড় প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত কাঠামো।

প্রযুক্তির যুগে বদলে যাচ্ছে প্রশিক্ষণের ধরন

বর্তমান পৃথিবীতে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। ভোটার তথ্য, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ, তথ্য প্রকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের বর্তমান ওয়েবসাইটেও ভোটকেন্দ্র অনুসন্ধান, ভোটারসংক্রান্ত সেবা, পর্যবেক্ষকসংক্রান্ত তথ্য এবং বিভিন্ন নির্বাচনী তথ্য ডিজিটালভাবে উপস্থাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।

ফলে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

তবে প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, শেষ পর্যন্ত সেটি পরিচালনা করবেন মানুষ। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের দক্ষতা, সতর্কতা, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিকতার ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হয়।

পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

একটি নির্বাচনের সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক অত্যন্ত

গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকরা নির্বাচনের তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেন। পর্যবেক্ষকেরা নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। নাগরিক সংগঠন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানও বিভিন্নভাবে জনসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু প্রত্যেকের কাজের ক্ষেত্র আলাদা।

এই পার্থক্য, দায়িত্ব, সীমাবদ্ধতা এবং আচরণবিধি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে নির্বাচনকেন্দ্রিক কাজ আরও শৃঙ্খলিত হতে পারে।

সাক্ষাৎকারে মহাপরিচালকের আলোচনায় প্রশিক্ষণকে এই বৃহত্তর অংশীজনের সঙ্গে যুক্ত করার যে দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে, সেটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

শুধু নিয়ম জানলেই হবে না, নিয়মের চেতনা বুঝতে হবে

আইন ও বিধি একটি নির্বাচনী ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণ করে। কিন্তু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানুষের বিচারবোধ, দায়িত্ববোধ এবং পেশাগত সততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একজন কর্মকর্তা যদি নিয়মের শব্দ জানেন কিন্তু নিয়মের উদ্দেশ্য না বোঝেন, তাহলে বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতে পারে।

তাই প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হওয়া উচিত

নিয়ম মুখস্থ করানো নয়, বরং নিয়মের উদ্দেশ্য, প্রয়োগ এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তার সম্পর্ক বোঝানো।

এখানেই আধুনিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে প্রচলিত প্রশিক্ষণের পার্থক্য তৈরি হয়।

প্রশিক্ষণ হবে বাস্তবভিত্তিক

একটি প্রশিক্ষণ তখনই কার্যকর হয়, যখন প্রশিক্ষণ শেষে একজন মানুষ বাস্তব কর্মক্ষেত্রে তার প্রয়োগ করতে পারেন।

ভোটকেন্দ্রে হঠাৎ কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলো। কোনো ভোটার নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। কোনো প্রার্থী বা এজেন্টের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হলো। কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিল। কোনো তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলো।

এসব পরিস্থিতি কাগজে পড়ার চেয়ে বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে শেখা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

তাই নির্বাচনী প্রশিক্ষণে বাস্তব পরিস্থিতি, সম্ভাব্য সংকট, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুশীলন এবং যোগাযোগ দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।

ঋণখেলাপি প্রসঙ্গেও প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক আলোচনা

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে ঋণখেলাপিদের প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে আলাদা একটি গবেষণাভিত্তিক লেখা করার পরামর্শ দেন মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান।

বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করতে হলে আবেগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে তথ্য, আইন, পরিসংখ্যান এবং প্রামাণ্য নথিকে ভিত্তি করতে হবে।

কারা ঋণখেলাপি, কোন আইনি বিধানের অধীনে তাঁদের অবস্থান নির্ধারিত হয়, নির্বাচনে প্রার্থিতা বা অন্যান্য যোগ্যতার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য কী বলছে এবং সময়ের সঙ্গে আইনি কাঠামোতে কী পরিবর্তন এসেছে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে একটি পৃথক গবেষণামূলক প্রতিবেদন করা যেতে পারে।

এ ধরনের বিষয় নির্বাচনী সাংবাদিকতায় তথ্যনির্ভর অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্যতার প্রশ্ন

আলোচনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতার বিষয়টিও উঠে আসে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। কোনো পদে প্রার্থিতার যোগ্যতা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট

আইন ও বিধিমালা। উদাহরণ হিসেবে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২৬ ধারায় চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে যোগ্যতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া, নির্দিষ্ট বয়স পূর্ণ হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ভোটার তালিকায় নাম থাকার মতো শর্ত উল্লেখ রয়েছে।

তবে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য আইন ও যোগ্যতার বিধান এক নয়। তাই কোনো সাধারণ বক্তব্য দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান আইন ও বিধিমালা পৃথকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এই জায়গাতেই তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

নির্বাচনী প্রশিক্ষণের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

বর্তমান সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার সামনে চ্যালেঞ্জও বদলেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে পড়া, ভুল তথ্য, প্রযুক্তির ব্যবহার, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কনটেন্ট, তথ্য যাচাই, জনসচেতনতা এবং দ্রুত যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো নির্বাচন ব্যবস্থাপনার আলোচনায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রান্ত তথ্য মোকাবিলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ঝুঁকি এবং নাগরিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে কর্মশালার উল্লেখ রয়েছে।

ফলে ভবিষ্যতের নির্বাচনী প্রশিক্ষণকে কেবল প্রচলিত প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ কমছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুকেও পরিবর্তিত হতে হবে।

মানুষই নির্বাচনী ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু

প্রযুক্তি থাকবে, আইন থাকবে, নির্দেশনা থাকবে, প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল থাকবে। কিন্তু এসব বাস্তবায়ন করবেন মানুষ।

তাই নির্বাচনী ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো দক্ষ, দায়িত্বশীল এবং পেশাদার মানুষ।

একজন প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করেন না। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরিতেও ভূমিকা রাখেন।

একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক শুধু সংবাদ প্রকাশ করেন না। তিনি সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্বও পালন করেন।

একজন সচেতন পর্যবেক্ষক শুধু নির্বাচন দেখেন না।

তিনি নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে নিজের দায়িত্ব পালন করেন।

একজন সচেতন নাগরিক শুধু ভোট দেন না। তিনি নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন থাকেন।

এই সম্মিলিত দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই একটি নির্বাচনকে দেখতে হয়।

শেষ কথায় ফিরে আসে সেই এক দিনের ভোট

সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার পরও মনে হলো, আমরা যে নির্বাচনকে একটি দিনের ঘটনা হিসেবে দেখি, তার প্রকৃত গল্প আসলে অনেক দীর্ঘ।

ভোটকেন্দ্রের দরজা খোলার অনেক আগে শুরু হয় সেই গল্প। শুরু হয় পরিকল্পনা দিয়ে। তারপর আসে আইন ও বিধি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, জনবল নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, উপকরণ, যোগাযোগ, ভোটার শিক্ষা, পর্যবেক্ষণ, গণমাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ের অসংখ্য মানুষের নিরলস কাজ।

ভোটের দিন তার একটি দৃশ্যমান প্রকাশ মাত্র।

সাক্ষাৎকারে মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে উপলব্ধিটি তৈরি হয়েছে তা হলো, একটি

নির্বাচনকে বুঝতে হলে শুধু ব্যালটের দিকে তাকালে হবে না; ব্যালটের পেছনে থাকা মানুষগুলোর প্রস্তুতির দিকেও তাকাতে হবে।

কারণ একটি ভোটের মূল্য শুধু ভোট দেওয়ার মুহূর্তে তৈরি হয় না। তার আগে তৈরি হয় দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।

সেই অর্থে নির্বাচন শুধু একটি দিনের আয়োজন নয়।

ভোটের এক দিনের আড়ালে সত্যিই লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতির এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।

আর সেই কর্মযজ্ঞের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম হচ্ছে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ।

আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে প্রবেশের পর থেকেই আমার মনে একটি আলাদা ধরনের অনুভূতি কাজ করছিল। নির্বাচন নিয়ে আমরা প্রতিদিন নানা কথা বলি, সংবাদ লিখি, আলোচনা করি, মতামত প্রকাশ

করি। কিন্তু একটি নির্বাচন কীভাবে ভেতর থেকে প্রস্তুত হয়, সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের মানুষগুলোর সঙ্গে সরাসরি বসে কথা বলার সুযোগ সব সময় আসে না।

এই সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্যও তাই ছিল একটু ভিন্ন। শুধু পদে থাকা একজন কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া নয়, বরং নির্বাচনী প্রশিক্ষণের ভেতরের দর্শন, দায়িত্ব, বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তাঁর কাছ থেকে সরাসরি জানা।

নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের সঙ্গে যখন মুখোমুখি বসার সুযোগ হলো, প্রথমেই যে বিষয়টি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তা তাঁর স্বাভাবিক ও আন্তরিক আচরণ।

একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর মধ্যে যে আনুষ্ঠানিকতার আবরণ থাকার কথা, কথোপকথন শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি অনেকটা সহজ হয়ে এলো। তিনি মনোযোগ দিয়ে প্রশ্ন শুনছিলেন, প্রশ্নের ভেতরের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছিলেন এবং উত্তর দেওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করছিলেন না।

আমার কাছে একজন সাক্ষাৎকারদাতার এই আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকের প্রশ্ন যত

গুরুত্বপূর্ণই হোক, উত্তরদাতা যদি নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার সুযোগ না পান, তাহলে সাক্ষাৎকার পূর্ণতা পায় না।

আমি তাই শুরু থেকেই প্রশ্নগুলোকে একের পর এক ছুড়ে দেওয়ার পরিবর্তে আলোচনার স্বাভাবিক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। একটি প্রশ্ন থেকে যে প্রসঙ্গ তৈরি হয়েছে, সেখান থেকেই পরবর্তী প্রশ্ন এসেছে। ফলে পুরো কথোপকথনটি অনেকটা আনুষ্ঠানিক প্রশ্নোত্তরের বাইরে গিয়ে একটি গভীর আলোচনার রূপ নেয়।

মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের আচরণে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমার চোখে পড়েছে, তা হলো তাঁর ধৈর্য।

দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধরনের প্রশ্ন করেছি। কিছু প্রশ্ন ছিল প্রশাসনিক, কিছু ছিল প্রশিক্ষণসংক্রান্ত, কিছু ছিল নির্বাচন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, আবার কিছু প্রশ্ন ছিল তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণধর্মী।

তিনি কোনো প্রশ্নকে অপ্রয়োজনীয় বলে এড়িয়ে যাননি। বরং প্রশ্নের ধরন অনুযায়ী উত্তরকে কখনো সংক্ষিপ্ত করেছেন, কখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যায় গেছেন।

কথা বলার সময় তাঁর মধ্যে অস্থিরতা লক্ষ্য করিনি। প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং পুরো প্রশ্ন শুনে কয়েক মুহূর্ত ভেবে তারপর বক্তব্য শুরু করেছেন।

একজন সাক্ষাৎকারদাতার এই অভ্যাস সাংবাদিকের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ এতে বক্তব্যে হঠাৎ আবেগের পরিবর্তে চিন্তার প্রতিফলন বেশি থাকে।

তাঁর বাচনভঙ্গিও আমার কাছে আলাদাভাবে উল্লেখ করার মতো মনে হয়েছে।

তিনি খুব উচ্চকণ্ঠে কথা বলেননি, আবার এত নিচু স্বরেও নয় যে বক্তব্য অস্পষ্ট হয়ে যায়। তাঁর কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিক দৃঢ়তা। কথা বলার সময় অপ্রয়োজনীয় শব্দের ব্যবহার কম এবং বক্তব্যকে বিষয়ভিত্তিক রাখার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট।

প্রশাসনিক বিষয় ব্যাখ্যা করার সময় তাঁর ভাষা ছিল দায়িত্বশীল ও পরিমিত। কোনো বিষয়কে অতিরঞ্জিত করার প্রবণতা লক্ষ্য করিনি। আবার কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাও চোখে পড়েনি।

কখনো কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি একটি বিষয়কে উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। আবার কোথাও একটি বিষয়ের সঙ্গে অন্য একটি বিষয়ের সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।

এতে বোঝা যায়, নির্বাচনী প্রশিক্ষণকে তিনি শুধু একটি দাপ্তরিক কার্যক্রম হিসেবে দেখেন না। এর সঙ্গে প্রশাসনিক দক্ষতা, মানবিক আচরণ, যোগাযোগ এবং দায়িত্ববোধের একটি সমন্বিত সম্পর্ক রয়েছে বলেই তাঁর কথায় প্রতীয়মান হয়েছে।

সাংবাদিক হিসেবে আমি মনে করি, একটি ভালো সাক্ষাৎকারের সাফল্য শুধু উত্তরদাতার ওপর নির্ভর করে না। প্রশ্নকর্তার প্রস্তুতিও সেখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমি চেষ্টা করেছি প্রচলিত কিছু প্রশ্নের মধ্যে সাক্ষাৎকারকে সীমাবদ্ধ না রেখে এমন জায়গায় যেতে, যেখানে একজন কর্মকর্তা তাঁর কাজকে কীভাবে দেখেন, প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং ভবিষ্যতের নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হতে পারে, সেসব বিষয় উঠে আসে।

তাই আলোচনায় শুধু নির্বাচন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ নয়, বরং অফিস ব্যবস্থাপনা, আচরণ ও শিষ্টাচার, মানুষের সঙ্গে কথা বলার ধরন, দায়িত্ববোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা, সরকারি ক্রয় ও উপকরণ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন অংশীজনের ভূমিকার মতো বিষয়ও সামনে আসে।

সাক্ষাৎকারের সময় আমার মনে হচ্ছিল, নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় আইন, ভোট, প্রার্থী, কেন্দ্র ও ফলাফলের দিকে বেশি তাকাই। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক যখন কোনো সরকারি

প্রতিষ্ঠানের দরজায় যান, তখন প্রতিষ্ঠানের প্রথম পরিচয় তিনি পান সেখানে কর্মরত মানুষের আচরণের মধ্য দিয়ে।

একজন কর্মকর্তা কীভাবে একজন সাধারণ মানুষকে গ্রহণ করছেন, কীভাবে তাঁর কথা শুনছেন, কীভাবে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং কোনো জটিল পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, এসব বিষয়ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত।

সেই জায়গা থেকেই নির্বাচনী প্রশিক্ষণে আচরণ ও শিষ্টাচারের বিষয়টি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।

কারণ নির্বাচন পরিচালনা শুধু প্রযুক্তি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে মানুষের অনুভূতি, প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার বিষয়টিও জড়িয়ে থাকে।

মহাপরিচালকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় ধীরে ধীরে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠল। নির্বাচনী প্রশিক্ষণকে

শুধু নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সীমিত প্রশিক্ষণ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত পরিসর ধরা যাবে না।

নির্বাচনের সঙ্গে বহু মানুষ ও প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত।

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, নির্বাচনকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যমকর্মী, সাংবাদিক, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।

প্রত্যেকের দায়িত্ব আলাদা। প্রত্যেকের সীমারেখাও আলাদা। কিন্তু একটি গ্রহণযোগ্য ও সুশৃঙ্খল নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য প্রত্যেকের নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

এই জায়গায় প্রশিক্ষণ শুধু দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম নয়, দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ারও একটি প্রক্রিয়া।

সাক্ষাৎকারটি যত দীর্ঘ হচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল আলোচনাটি আরও গভীরে যাচ্ছে।

সাধারণত দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে একসময় উত্তরদাতার মধ্যে ক্লান্তি চলে আসে। কিন্তু এখানে আমার পর্যবেক্ষণ ছিল ভিন্ন। দীর্ঘ সময় কথা বলার পরও তিনি আলোচনার বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন হননি।

কোনো প্রশ্নের সঙ্গে অন্য কোনো প্রসঙ্গ যুক্ত হলে সেটিও ব্যাখ্যা করেছেন। কোথাও বিষয়টি প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়েছেন, কোথাও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

একজন সাংবাদিক হিসেবে এই ধরনের সাক্ষাৎকার আমার কাছে শুধু তথ্য সংগ্রহের কাজ নয়। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের চিন্তাভাবনা বোঝার সুযোগও।

একজন সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করেন, তখন তাঁর প্রশ্ন সব সময় আরামদায়ক হবে এমন নয়। বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন হলে সেখানে প্রশাসনিক কাঠামো, আইন, দায়িত্ব, জবাবদিহি এবং বাস্তবতার নানা দিক উঠে

আসতে পারে।

আমি লক্ষ্য করেছি, তিনি প্রশ্নকে ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার পরিবর্তে বিষয় হিসেবে দেখেছেন। ফলে প্রশ্নোত্তরে একটি স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় ছিল।

এ ধরনের পরিবেশ একজন সাংবাদিককে আরও গভীরে যেতে সাহায্য করে।

আমিও চেষ্টা করেছি কোনো প্রশ্নকে অযথা উত্তেজনাপূর্ণ না করে তথ্যভিত্তিক রাখতে। কারণ আমার কাছে সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো প্রশ্ন করার সাহসের সঙ্গে তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।

দীর্ঘ আলাপ শেষে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে উপলব্ধিটি তৈরি হয়েছে, তা হলো নির্বাচনকে শুধু ভোটের দিন দিয়ে বিচার করলে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না।

একটি নির্বাচন সামনে রেখে বহু স্তরে প্রস্তুতি নিতে হয়। মানুষকে প্রস্তুত করতে হয়। কর্মকর্তাদের দক্ষ করতে হয়। অফিসকে প্রস্তুত রাখতে হয়। প্রয়োজনীয় উপকরণ ও

প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনা করতে হয়। দায়িত্ব ও আচরণ সম্পর্কে ধারণা দিতে হয়। বিভিন্ন অংশীজনকে তাঁদের নিজ নিজ ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন করতে হয়।

অর্থাৎ ব্যালটের আগে মানুষকে প্রস্তুত করতে হয়।

আর সেই মানুষ তৈরির প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো প্রশিক্ষণ।

এই সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের বক্তব্য, তাঁর আচরণ, প্রশ্ন গ্রহণের ধরন এবং বিষয় ব্যাখ্যার পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, নির্বাচনী প্রশিক্ষণকে শুধু একটি দাপ্তরিক কাজ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি বৃহত্তর প্রশাসনিক ও সামাজিক দায়িত্বের অংশ।

সাক্ষাৎকার শেষে যখন তাঁর কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আসছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল, একটি নির্বাচনের গল্প আসলে ভোটকেন্দ্রের দরজা দিয়ে শুরু হয় না।

তার অনেক আগে শুরু হয় প্রস্তুতি।

প্রশিক্ষণ হয়, মানুষ তৈরি হয়, দায়িত্ব ভাগ হয়, প্রশাসনিক কাঠামো সক্রিয় হয়, প্রযুক্তি প্রস্তুত হয়, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং অসংখ্য মানুষ নিজেদের অবস্থান থেকে একটি জাতীয় প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন।

সেই দীর্ঘ প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সামনে বসেই আমি কথা বলেছি নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের সঙ্গে।

আমার প্রশ্ন ছিল একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন। তাঁর উত্তর ছিল একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার উত্তর। কিন্তু সেই প্রশ্নোত্তরের ভেতর দিয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হলো, একটি নির্বাচন শুধু ব্যালটের হিসাব নয়।

এটি মানুষ, দায়িত্ব, দক্ষতা, আচরণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, আইন এবং আস্থার সমন্বিত একটি প্রক্রিয়া।

আর সেই কারণেই এই সাক্ষাৎকারকে আমি শুধু একটি সাক্ষাৎকার হিসেবে দেখছি না। এটি নির্বাচনের নেপথ্যে থাকা মানুষ ও প্রস্তুতির  জানালা হিসেবে দেখছি।

“লেখকঃসাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক।