
বিপ্লব বিজয়
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের দুর্গম জেলেপল্লীতে গভীর রাতে হাজির হলেন জেলা প্রশাসক। শীতের তীব্রতা ও শীতার্ত মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চট্টগ্রাম জনাব মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সোমবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) গভীর রাতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন জেলেপল্লী ও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অসহায় মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করেন। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচালিত এই শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমের আওতায় আকমল আলী ঘাট জেলেপল্লী, রানী রাসমনির ঘাট জেলেপল্লী ও উত্তর কাট্টলী জেলেপল্লীতে বসবাসরত দরিদ্র জেলে পরিবারগুলোর মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ভাসমান ও অসহায় মানুষের মাঝেও শীতবস্ত্র তুলে দেওয়া হয়। এদিন মোট ৫০০টি কম্বল বিতরণ করা হয়। গভীর রাতে দুর্গম জেলেপল্লীতে জেলা প্রশাসক নিজে উপস্থিত হয়ে জেলে পরিবার, নারী ও শিশুদের হাতে কম্বল তুলে দেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। স্থানীয় জেলেরা জানান, এর আগে কোনো জেলা প্রশাসক এত রাতে সরাসরি জেলেপল্লীতে এসে তাদের পাশে দাঁড়াননি। এ সময় জেলেপল্লীর বাসিন্দারা তাদের সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে আবেদন জানালে জেলা প্রশাসক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে স্কুলসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি জেলেদের কাছ থেকে তাদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন। জেলেদের উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসক বলেন,“জেলেদের জীবনমান পরিবর্তন করতে হবে। বাবা–দাদাদের সময়ের পুরনো পদ্ধতিতে আর চলা যাবে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবিকা ও জীবনযাত্রার ধরন বদলে স্বনির্ভর হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “জেলেদের টেকসই জীবনমান নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।”আকমল আলী ঘাট জেলেপল্লীর জেলে নেতা দুলাল এবং রানী রাসমনির ঘাট জেলেপল্লীর জেলে নেতা খেলন দাস বলেন,
“শহর থেকে এত দূরের জেলেপল্লীতে গভীর রাতে জেলা প্রশাসক নিজে এসে আমাদের পাশে দাঁড়ানো অভাবনীয়। আগে কখনো এমন দেখিনি।”গভীর রাতে জেলা প্রশাসককে কাছে পেয়ে জেলে পরিবারগুলো আবেগাপ্লুত হয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। শীতের কষ্ট লাঘবের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার কথা বলায় তারা জেলা প্রশাসকের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় দোয়া করেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝেও কম্বল বিতরণ করেন। এ সময় নূর কায়াস নামে এক নারী তার তিন সন্তানসহ রাস্তায় অবস্থান করছিলেন। প্রচণ্ড শীতে একটি শিশু কাঁপতে থাকলে বিষয়টি নজরে আসে। তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসক খাবারের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন এবং তার বড় সন্তান আছিয়ার পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ শরীফ উদ্দীন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ ছাইফুল্লাহ মজুমদারসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করেন। শীতের এই দুঃসময়ে জেলা প্রশাসকের মানবিক, দূরদর্শী ও সাহসী উদ্যোগ শীতার্ত মানুষের মাঝে শুধু উষ্ণতা নয়—শিক্ষা, পরিবর্তন ও আত্মনির্ভরতার দৃঢ় বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে।

