
কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম দিয়ে শুধু একটি সময়কে সমৃদ্ধ করেন না, তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা, চেতনা ও সৃষ্টিশীলতার ভিতও নির্মাণ করে যান। তাঁদের চলে যাওয়া তাই নিছক একজন মানুষের প্রস্থান নয়; এটি জ্ঞান, মনন ও প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। কিন্তু তাঁদের সৃষ্টিকর্ম, উচ্চারণ ও ভালোবাসার স্মৃতি থেকে যায়—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আজ ২৭ আগস্ট—শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলা ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও ভাষাবিজ্ঞানের এই বরেণ্য মনীষীকে। তিনি ছিলেন শুধু একজন ভাষাবিজ্ঞানী নন; তিনি ছিলেন শিক্ষক, গবেষক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং বাংলা ভাষার নিবেদিতপ্রাণ সাধক। তাঁর দীর্ঘ জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জগতে একটি সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার রেখে গেছে। তবে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কের জায়গাটি আমার কাছে আরও ব্যক্তিগত, আরও আবেগের এবং আরও স্মৃতিময়। কারণ আমার লেখকজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি আমার মতো একজন সাধারণ লেখকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আমার লেখাকে মূল্যায়ন করেছিলেন এবং তাঁর মূল্যবান কথায় আমাকে নতুন করে লেখার সাহস জুগিয়েছিলেন।
‘নারী কথা’ ও মনিরুজ্জামান স্যারের সেই ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ২০০৯ সাল। আমার লেখকজীবনের একটি স্মরণীয় সময়। সে সময় আমার লেখা দুটি বই একই সঙ্গে শৈলী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল—‘নারী কথা’ এবং ‘টক টক কথা’। এর মধ্যে ‘নারী কথা’ আমার কাছে শুধু একটি বই নয়; নারীজীবন, নারীর অধিকার, সমাজের বাস্তবতা ও নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমার ভাবনা ও পর্যবেক্ষণের একটি প্রকাশ ছিল। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘নারী কথা’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসব। সেই অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম বরেণ্য ভাষাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান। একজন সাধারণ লেখক হিসেবে আমার জন্য সেটি ছিল এক বিরাট সম্মানের মুহূর্ত। একদিকে একজন নবীন লেখকের বই, অন্যদিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার একজন প্রতিষ্ঠিত মহীরুহ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মূল্যায়নের প্রতি আমার ছিল গভীর আগ্রহ ও কৌতূহল।কিন্তু সেদিন তিনি যা বলেছিলেন, তা আমার প্রত্যাশার সীমাকেও অতিক্রম করেছিল। তিনি আমার লেখাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমাকে ‘অসাধারণ লেখক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। আজও সেই শব্দগুলো আমার কাছে শুধু প্রশংসা নয়—একটি দায়িত্ব, একটি বিশ্বাস এবং একটি অনুপ্রেরণার নাম। একজন বড় মাপের ভাষাবিজ্ঞানী যখন একজন সাধারণ লেখকের সৃষ্টিকে এভাবে মূল্যায়ন করেন, তখন সেই প্রশংসা ব্যক্তিগত আনন্দের সীমায় থাকে না; তা হয়ে ওঠে লেখকজীবনের এক অমূল্য প্রেরণার উৎস। আমি আজও মনে করি, সেদিন ড. মনিরুজ্জামান শুধু আমার বইয়ের আলোচনা করেননি—তিনি একজন লেখকের আত্মবিশ্বাসকে স্পর্শ করেছিলেন। তাঁর একটি প্রশংসা—আমার কাছে আজও অমূল্য সম্পদ জীবনে অনেক প্রশংসা পাওয়া যায়, অনেক কথা শোনা যায়। সময়ের সঙ্গে সেসব কথার অধিকাংশই হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু কথা হৃদয়ে স্থায়ীভাবে বসে যায়। ড. মনিরুজ্জামান স্যারের সেই মূল্যায়ন আমার কাছে ঠিক তেমনই। আমি পেশায় সাংবাদিকতা করেছি, লিখেছি, গবেষণা করেছি, নানা বিষয়ে বই প্রকাশ করেছি; কিন্তু আমার লেখকজীবনের বহু অর্জনের ভিড়েও তাঁর সেই মূল্যায়নের স্মৃতি আজও আলাদা আলোয় জ্বলজ্বল করে। কারণ প্রশংসাটি এসেছিল এমন একজন মানুষের কাছ থেকে, যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গভীরতর জগতের একজন প্রতিষ্ঠিত গবেষক ও ভাষাবিজ্ঞানী। তাঁর মতো একজন মনীষীর মুখে আমার মতো একজন সাধারণ লেখকের জন্য এমন মূল্যায়ন—এটি আমার কাছে নিঃসন্দেহে এক বিরল সৌভাগ্য। শুধু মঞ্চে নয়—দৈনিক আজাদীর পাতায়ও তিনি আমাকে মূল্যায়ন করেছিলেন ড. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে আমার সেই স্মৃতি আরও গভীর হয়ে আছে আরেকটি কারণে। ‘নারী কথা’ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আলোচনার পাশাপাশি তিনি আমার বই ও লেখালেখিকে নিয়ে দৈনিক আজাদী পত্রিকায় একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। একজন প্রতিষ্ঠিত ভাষাবিজ্ঞানী একজন সাধারণ লেখকের বই নিয়ে সংবাদপত্রে বড় পরিসরে লিখছেন—এটি আমার জন্য কতটা সম্মানের ও আনন্দের ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, মনে হয়—সেটি শুধু একটি প্রবন্ধ ছিল না; আমার মতো একজন লেখকের প্রতি একজন মনীষীর আস্থা ও ভালোবাসার একটি দলিল ছিল। সেই সময়ের স্মৃতি আজও আমার লেখকসত্তাকে নাড়া দেয়।
‘টক টক কথা’ এবং আরেক মহান ভাষাবিজ্ঞানী ড. মাহবুবুল হক একই সময়ে প্রকাশিত আমার দ্বিতীয় বই ছিল ‘টক টক কথা’। এই বইকে ঘিরেও আমার জীবনে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় তৈরি হয়েছিল। বইটির মূল আলোচক ছিলেন আরেকজন বরেণ্য ভাষাবিজ্ঞানী—অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক। একই সময়ে আমার দুটি বই—একটির আলোচনায় অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান, অন্যটির আলোচনায় অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক। তখন হয়তো বুঝিনি, কিন্তু আজ উপলব্ধি করি—আমার লেখকজীবনের সেই সময়টি ছিল এক অসাধারণ সৌভাগ্যের অধ্যায়। দুই মহান ভাষাবিজ্ঞানীর সান্নিধ্য, তাঁদের মূল্যায়ন এবং তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া উৎসাহ আমার লেখকজীবনের স্মৃতির ভাণ্ডারে আজও সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি। সময় কত নির্মম! আজ সেই স্মৃতিগুলো মনে করতে গিয়ে হৃদয়ের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। যাঁদের সামনে বসে কথা শুনেছি, যাঁদের কণ্ঠে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গভীর ব্যাখ্যা শুনেছি, যাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি উৎসাহ—আজ তাঁরা কেউই আমাদের মাঝে নেই। অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দুই বছর কেটে গেছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, সময় যেন খুব বেশি দূরে যেতে পারেনি। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সেই অনুষ্ঠান, ‘নারী কথা’ বইয়ের প্রকাশনা, মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি, তাঁর মূল্যায়নের সেই শব্দগুলো—সবকিছু যেন এখনো স্মৃতির পর্দায় জীবন্ত। মানুষের শারীরিক উপস্থিতি হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের কণ্ঠস্বর হারায় না। তাঁদের বলা কিছু কথা আমাদের ভেতরে দীর্ঘদিন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
ড. মনিরুজ্জামান স্যারের সেই প্রশংসার কথাও আমার কাছে তেমনই এক অমলিন প্রতিধ্বনি।
একজন লেখকের কাছে একজন শিক্ষকের মূল্যায়ন
একজন লেখকের জীবনে পাঠক গুরুত্বপূর্ণ, প্রকাশক গুরুত্বপূর্ণ, সহকর্মী গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু একজন গুণী মানুষের মূল্যায়ন কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কারণ সেই মূল্যায়ন লেখককে শুধু আনন্দ দেয় না, তাকে আরও ভালো লেখার দায়িত্বও দেয়।
ড. মনিরুজ্জামান স্যারের সেই মূল্যায়ন আমার কাছে আজও এক ধরনের নৈতিক দায়।
তিনি যখন আমার মতো একজন সাধারণ লেখকের মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, তখন তাঁর সেই বিশ্বাসকে সম্মান করার জন্য আরও বেশি লিখতে হয়েছে, আরও বেশি পড়তে হয়েছে, আরও গভীরে যেতে হয়েছে।
তাঁর প্রশংসা আমাকে অহংকার শেখায়নি; বরং শিখিয়েছে—একজন লেখকের পথ দীর্ঘ, আর সেই পথের শেষ নেই।
মনিরুজ্জামান স্যার—একটি প্রতিষ্ঠান
ড. মনিরুজ্জামান ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিয়েছেন। বাংলা বিভাগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের নেতৃত্ব, কলা অনুষদের ডিনের দায়িত্ব, নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালকসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে তিনি তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
ভাষা, সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে তাঁর বিপুল গবেষণা ও প্রকাশনা বাংলা জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাঁর প্রায় ৩৫টি গ্রন্থ এবং শতাধিক গবেষণাপ্রবন্ধ তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীল সাধনার সাক্ষ্য বহন করে।
*‘ভাষা ও সাহিত্য সাধনা’, ‘উপভাষা চর্চার ভূমিকা’, ‘বর্ণে বর্ণে নজরুল’, ‘ভাষা সমস্যা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘ভাষাতত্ত্ব অনুশীলন’*সহ তাঁর বহু গ্রন্থ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার মূল্যবান সম্পদ।
তাঁর কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন এবং একুশে পদকেও ভূষিত হন।
কিন্তু একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু তাঁর পুরস্কারে নয়—তিনি কত মানুষের মনে আলো জ্বালাতে পেরেছেন, তার মধ্যেই তাঁর প্রকৃত মহত্ত্ব।
আমার জীবনে ড. মনিরুজ্জামান তেমনই একজন আলোকবর্তিকা।
শেষ কথায়—শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা
স্যার, আপনি আজ নেই।
কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার সেই স্মৃতি আছে।
‘নারী কথা’ বইয়ের সেই প্রকাশনা উৎসব আছে।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সেই মঞ্চ আছে।
আপনার কণ্ঠে উচ্চারিত সেই প্রশংসার শব্দ আছে।
দৈনিক আজাদীর পাতায় আমার বই ও লেখালেখিকে নিয়ে আপনার লেখা সেই মূল্যবান প্রবন্ধের স্মৃতি আছে।
আর আছে একজন সাধারণ লেখকের হৃদয়ের গভীরে একজন মহান মানুষের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা।
আজ আপনাকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে হচ্ছে—মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু মানুষের দেওয়া অনুপ্রেরণার মৃত্যু হয় না।
আপনি আমার জীবনে যে সামান্য আলো জ্বেলে দিয়েছিলেন, সেই আলো হয়তো আপনার কাছে ছিল একটি মুহূর্তের উচ্চারণ; কিন্তু আমার কাছে সেটি আজও দীর্ঘ লেখকজীবনের এক উজ্জ্বল প্রদীপ।
আজ একই সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আরেক মহান ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হককে—যিনি আমার ‘টক টক কথা’ বইয়ের আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। সময়ের নির্মমতায় আজ দুই মহান ভাষাবিজ্ঞানীই আমাদের মাঝে নেই।
তবু তাঁরা হারিয়ে যাননি।
বাংলা ভাষার প্রতিটি শুদ্ধ উচ্চারণে, গবেষণার প্রতিটি পাতায়, সাহিত্যের প্রতিটি আলোকিত বাক্যে এবং তাঁদের স্পর্শ পাওয়া মানুষের স্মৃতিতে তাঁরা বেঁচে থাকবেন।
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান স্যারের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতা।
হে মহান আল্লাহ, আমার শ্রদ্ধেয় দুই শিক্ষকতুল্য মনীষী—অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হককে ক্ষমা করুন, তাঁদের কবরকে নূরে ভরে দিন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
— মো. কামাল উদ্দিন
লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক


