
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইউনিট-২ চালু, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড গঠন, রোগী ও স্বজনদের হয়রানি বন্ধ, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ, জনবল বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখাসহ হাসপাতালের সার্বিক সেবার মান উন্নয়নের দাবি জানিয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।
এ বিষয়ে সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল।
মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান চিকিৎসাসেবা, রোগীদের বিভিন্ন সমস্যা, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং হাসপাতালের অবকাঠামোগত ও জনবল সংকটসহ নানা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রশ্নের মুখে হাসপাতালের নানা সমস্যা
সভায় নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা ও নাগরিকদের প্রত্যাশার বিষয়গুলো একে একে প্রশ্ন আকারে পরিচালকের সামনে উপস্থাপন করেন।
তিনি জানতে চান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউনিট-২ চালুর অগ্রগতি কতদূর, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও শয্যা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে কি না এবং রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল বৃদ্ধি করা হবে কি না।
একই সঙ্গে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগী ও স্বজনদের হয়রানির অভিযোগ, দালালদের দৌরাত্ম্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে ভোগান্তি, এক্স-রে মেশিনসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখা, রোগীদের সঠিক তথ্য ও দ্রুত সেবা প্রদান এবং হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করার বিষয়গুলোও তুলে ধরেন তিনি।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান
মতবিনিময় সভায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি।
নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপও বাড়বে। তাই আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক-নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা এবং পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ সময় বিশেষ ডেঙ্গু ওয়ার্ড গঠন এবং ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়, যাতে কোনো রোগী চিকিৎসা পেতে এসে অব্যবস্থাপনা বা শয্যা সংকটের কারণে ভোগান্তির শিকার না হন।
পরিচালকের আন্তরিক জবাব
নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিনের উত্থাপিত প্রতিটি প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শুনে তার জবাব দেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন।
তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিনিধিদলকে অবহিত করেন। একই সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত করতে তাঁর বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতি তাঁর আলাদা দায়বদ্ধতা রয়েছে। এই হাসপাতালকে আরও উন্নত চিকিৎসা ও জনবান্ধব সেবার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করছেন।
তিনি বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ডের ব্যবস্থা, রোগী হয়রানি বন্ধ এবং দালালদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
হাসপাতালের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা পর্যায়ক্রমে চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
দালালমুক্ত হাসপাতাল চান নাগরিক নেতারা
মতবিনিময় সভায় হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।
নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ বলেন, চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ রোগী ও স্বজনরা অনেক সময় হাসপাতালের ভেতর-বাইরে বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর খপ্পরে পড়েন। ফলে তাঁরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতেও সমস্যায় পড়েন।
তাই হাসপাতালকে দালালমুক্ত ও হয়রানিমুক্ত চিকিৎসাসেবার নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়।
চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখার দাবি
সভায় এক্স-রে মেশিনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়মিত সচল রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নাগরিক ফোরামের নেতারা বলেন, একজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে বাইরে যেতে বাধ্য হন, তাহলে তার চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হয়। তাই হাসপাতালের নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
জনবল বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা হয়। রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য সহায়ক জনবল পর্যাপ্ত কি না—সে বিষয়েও আলোচনা করেন নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ।
তাঁরা বলেন, আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল বৃদ্ধি এবং কর্মরতদের কর্মপরিবেশ উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কামাল উদ্দিন: অভিযোগ নয়, সমাধানের পথ খুঁজতেই এই মতবিনিময়
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বৃহত্তর চট্টগ্রামের কোটি মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। এই হাসপাতালকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
তিনি বলেন, নাগরিক ফোরাম কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করতেই এই মতবিনিময় করেনি; বরং সমস্যা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে ভোগান্তিতে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালের সেবাব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করার জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহানগর সভাপতি হামিদ হোসাইন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ সলিম, মহানগর সিনিয়র সহসভাপতি লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল, ওয়াহিদুল আলম মাস্টার, মহসিন মিয়া, সাধারণ সম্পাদক দুলাল বড়ুয়া, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ শাসুল আলম রানা, লায়ন মিনহাজুর রহমান, সাজু তালুকদার, লায়ন ফরহাদ মোস্তফা, মোহাম্মদ বেলাল হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ ওসমান ও আব্দুল মান্নান।
সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা ও নাগরিক প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন এবং চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশার কেন্দ্র চট্টগ্রাম মেডিকেল
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান নয়—বৃহত্তর চট্টগ্রামের অসংখ্য মানুষের কাছে এটি জীবন ও আশার শেষ ঠিকানা। প্রতিদিন এখানে চিকিৎসার জন্য ছুটে আসেন হাজারো মানুষ।
তাই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা হতে হবে আরও সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ, মানবিক ও হয়রানিমুক্ত—এমন প্রত্যাশা নাগরিক সমাজের।
মতবিনিময় সভার মধ্য দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে যে সংলাপের সূচনা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও কার্যকর উদ্যোগে রূপ নেবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ।


