
মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুতে ৫ জুন রাতে যা ঘটেছে, তাকে আমরা কোনোভাবেই ‘দুর্ঘটনা’ বলি না। এটি একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড — গাফিলতি, অবহেলা এবং চরম দায়িত্বহীনতার কারণে সংঘটিত একটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে তিনজন নিরীহ মানুষ, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বহু পরিবার। কিন্তু দায় নিচ্ছে না কেউ। কয়েকজন নিচু পর্যায়ের রেলকর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করে দায়মুক্তি নেওয়ার চেষ্টা চলছে—এটা কি ন্যায়বিচার? কেবল গার্ড বা গেটকিপার নয়—পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও দায়ী-
আমরা জিজ্ঞাসা করতে চাই, চট্টগ্রাম রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম), বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও), বিভাগীয় প্রকৌশলী, নিরাপত্তা শাখার ইনচার্জরা কী দায়িত্ব পালন করছিলেন?
কেন বছরের পর বছর ধরে এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে ট্রেন ও যানবাহন একযোগে চলাচল করছে, অথচ সেখানে পর্যাপ্ত সুরক্ষা, স্বয়ংক্রিয় গেটিং ব্যবস্থা, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, বা সংকেত প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়নি? কেন এমন একটি স্থানে নিয়মিত গার্ড ও গেটকিপার নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা হয়নি?
এই অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার দায়ভার শুধু নিচুতলার কর্মীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া কি দায়িত্বশীল আচরণ?
এই প্রশ্নের উত্তর রেলপথ মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম রেল বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দিতে হবে। এবং দিতে হবে জনসম্মুখে।
এই সেতুতে ছিল ‘দুই বিপরীতমুখী চলাচলের’ স্পষ্ট বিপদ-
বাংলাদেশে একমাত্র এই সেতুতেই একইসঙ্গে রেল ও যানবাহন চলাচল করে। এটি যুগের পর যুগ ধরে সকলের জানা বিষয়। এই জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা, অগ্রিম সংকেত ও স্বয়ংক্রিয় ব্যারিকেডের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক ছিল। অথচ এখানেই ছিল সবচেয়ে বেশি অবহেলা।
রেলের গার্ডের দায়িত্ব ছিল:
• ট্রেন চলার আগে পথপরিদর্শন করা,
• ব্রিজ খালি কিনা নিশ্চিত হওয়া,
• প্রয়োজনীয় সংকেত প্রদান,
• ব্রিজে যান চলাচল বন্ধ করা।
গেটকিপারের কাজ ছিল ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকানো, লোকাল সংকেত দেখিয়ে ট্রেনকে সতর্ক করা।
এগুলো কোনোটাই সঠিকভাবে হয়নি — আর তার ফলেই গাড়িগুলো উঠে পড়ে ট্রেনের সামনে, প্রাণ যায় তিনজনের।
এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা’ নয়
দায়িত্বপ্রাপ্তরা দায়িত্ব পালন করলে এমন মৃত্যু কখনোই ঘটতো না।
তাহলে প্রশ্ন উঠে—
• এটা কি কেবল গাফিলতি, নাকি ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা?
• রাষ্ট্র কি নিজের নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে?
• আমরা কি চাই, কালুরঘাটের মতো ঘটনা বারবার ঘটুক?
আমরা জোর দাবি জানাই:
১. এই ঘটনাকে “দুর্ঘটনা” নয়, “অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড” হিসেবে বিবেচনা করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ৩০২ ও ৩০৪ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করতে হবে।
• চট্টগ্রাম রেলওয়ের জিএম, বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও), বিভাগীয় প্রকৌশলী, নিরাপত্তা বিভাগ প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে অথবা সরকারকে তাদের বরখাস্ত করতে হবে।
• তদন্ত কমিটিকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে প্রভাবমুক্ত তদন্ত করতে দিতে হবে এবং তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
• পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ নয়—চাই ন্যায়বিচার।
• কালুরঘাটে নতুন আধুনিক সেতু নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে রেল ও যানবাহন চলবে পৃথকভাবে।
• এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, ট্রেন চালনার লগ ও রেল সিগন্যালিং তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
যারা বলছে ‘দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা’, তাদের বলি — দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কোনো দুর্ঘটনা নয়-
রেল ট্র্যাজেডিগুলো একের পর এক ঘটছে—ময়মনসিংহে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, এখন চট্টগ্রামের কালুরঘাটে। প্রতিবারই কেবল নিচুতলার কর্মীদের শাস্তি হয়, বড় কর্তারা থেকে যান বাইরে। এভাবে চলতে পারে না।
রেল উপদেষ্টা সাহেব, আপনি কি এই ঘটনার দায় নিচ্ছেন? আপনার মন্ত্রণালয়ের সুশৃঙ্খল কাঠামো থাকলে আজ তিনটি তরতাজা প্রাণ হারিয়ে যেত না। আমরা চাই, এই ঘটনার জন্য রেলওয়ের উচ্চ পর্যায়ের প্রত্যেক কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।
শেষকথা-আমরা কোনো পরিবারের কান্না দেখতে চাই না। আমরা আর কোনো লাশ চাই না কালুরঘাটে। আমরা চাই দায়িত্বপ্রাপ্তদের শাস্তি, পদত্যাগ এবং সিস্টেম সংস্কার।
এই প্রতিবাদ শুধুমাত্র চট্টগ্রামের নয়—পুরো বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়ের দাবি।
তিনটি প্রাণের রক্ত যেন এদেশের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। কালুরঘাট ট্র্যাজেডি যেন আর কখনও না ঘটে।
লেখক:
মহাসচিব -চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম
সাংবাদিক, কলাম লেখক।
তারিখ: ৬ জুন ২০২৫
স্থান: চট্টগ্রাম

