শিরোনাম
“সন্ত্রাসের সামনে আপসহীন ওসি আবদুর রহিম—খুলশীতে আইনের শাসনের নতুন বার্তা”চরণদ্বীপে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভাচরনদ্বীপে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভাঢাকা–কক্সবাজার আকাশপথে ভাড়ার নৈরাজ্য বন্ধ করুন | “পর্যটন রাজধানীকে জিম্মি করে বিমানভাড়া বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া যায় না” | সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডেরদূরের দেশ, কাছের মানুষ—মুনা উইলসনের সঙ্গে শারজাহ বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টার মায়াবী সাক্ষাৎ দূরের দেশ, কাছের মানুষ-দেশে সংকটের মাঝে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে সারবন্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত, বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধরেলওয়ের তিন শীর্ষ পদে বড় রদবদলইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়নে আইডিবির সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সইফটিকছড়িতে ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধুর রহস্যজনক মৃত্যুঃ স্বামী সহ ২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

― Advertisement ―

“সন্ত্রাসের সামনে আপসহীন ওসি আবদুর রহিম—খুলশীতে আইনের শাসনের নতুন বার্তা”

চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী—আবাসিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের বসবাসের কারণে আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এই এলাকায় মাদক, সন্ত্রাস,...

বাংলা সাহিত্যের দীপ্ত নক্ষত্র ফরিদা হোসেনঃ অনুপ্রেরণার চিরন্তন আলো”

Homeসম্পাদকীয়বাংলা সাহিত্যের দীপ্ত নক্ষত্র ফরিদা হোসেনঃ অনুপ্রেরণার চিরন্তন আলো”

— মো. কামাল উদ্দিনঃ
বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ যাত্রাপথে কিছু মানুষ আসেন, যারা শুধু শব্দের কারিগর নন—তারা হয়ে ওঠেন সময়ের প্রতিনিধি, মানবমনের অন্তর্লোকের অনুবাদক, আর জাতির বোধ ও চেতনার জাগানিয়া আলোকশিখা। এমনই এক মহীয়সী সাহিত্যপ্রাণা হলেন ফরিদা হোসেন—বাংলাদেশের ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক ও শিশুসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি প্রজ্ঞা, মমতা ও সৃষ্টিশীলতার এক বিরল মেলবন্ধন। তিনি সেই সাহিত্যিক, যিনি লেখার মাধ্যমে হৃদয়ের কথা বলার সাহস জুগিয়েছেন অসংখ্য নারী-পুরুষকে, যিনি “অবিনশ্বর” নামের একটি লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন শত শত তরুণ লেখকের আত্মপ্রকাশের মঞ্চ। তাঁর কলমে যেমন আছে সমাজের নিরাবরণ সত্য, তেমনি আছে শিশুর হাসির স্নিগ্ধতা, প্রকৃতির কোমলতা, আর নারীর মর্মের গভীর সুর। ১৯৪৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারতের কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই গুণবতী নারী শৈশব থেকেই সংস্কারমুক্ত ও শিক্ষানুরাগী পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতা, ফয়েজ আহমেদ, ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রমজগতের গর্ব, যিনি আইএলও’র গভর্নিং বডির পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর মা, বেগম ফয়েজুননেসা, ছিলেন এক স্নেহধন্যা, কোমল হৃদয়ের গৃহিণী, যাঁর কাছ থেকেই ফরিদা হোসেন পেয়েছিলেন মানবিকতা ও মমতার প্রথম পাঠ। চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার শাহেরখালী গ্রামে তাঁর পারিবারিক শিকড়, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংস্কৃতি ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। পরবর্তীতে তিনি ফেনীর রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন-এর সঙ্গে ১৯৬৬ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার, সন্তান, সাহিত্য—সবকিছুর মধ্যেই তিনি বজায় রেখেছেন এক অনন্য ভারসাম্য, যা তাঁকে নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে অনন্য করে তুলেছে। ষাটের দশকে, তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। সাহিত্যপ্রেমে উজ্জ্বল তরুণী ফরিদা লিখেছিলেন তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন “আজন্তা”—যা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় হয়ে ওঠে। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার—যা যেন প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক নবযাত্রার। এরপর তাঁর কলমে সৃষ্টি হয় একের পর এক কালজয়ী গল্প—“সহযাত্রী”, “একজন কাজলীর কথা”, “শাড়ি”, “হিমালয়ের দেশে”, “একটি শীতল মৃত্যু”, “জীবন যেমন” ইত্যাদি। প্রতিটি গল্পেই তিনি মেলে ধরেছেন সমাজের গভীর বাস্তবতা, নারীর মর্মবেদনা, ভালোবাসার অন্তর্গাথা ও সময়ের স্রোতধারায় মানুষের লড়াই। তাঁর উপন্যাস—“আরাধনা”, “মুখোশ”, “ক’জনার কথা”—বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে স্থান পেয়েছে হৃদয়ের গভীরে। তাঁর লেখা নাটক যেমন “ঝড়ের পরে”, “তুষার কন্যা”, “তারার খোঁজে”, “খুকুর স্বপ্ন”—সবই মানবমনের শিল্পিত প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে শিশুতোষ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার পেছনে যাঁদের অকৃত্রিম ভূমিকা, তাঁদের মধ্যে ফরিদা হোসেন অন্যতম। তাঁর শিশুতোষ রচনাগুলো—“রূপকথার দেশে”, “মিতালী”, “আনন্দ ফুলঝুরি”, “ভাই-বোনের গল্প”, “চাঁদ কন্যার কথা”, “মায়া দ্বীপে অভিযান”, “সুরে ছন্দে ছড়াগান”—সবগুলোই একেকটি শিশুমনের মহাবিশ্ব। শিশুর কল্পনা, মানবিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা তিনি গল্পের ভাষায় এমনভাবে বুনেছেন যে তা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করছে। তাঁর কলমে শিশু মানেই শুধু হাসি নয়, বরং সৃষ্টিশীল চিন্তার বীজ। ফরিদা হোসেন শুধু সাহিত্য সৃষ্টি করেননি, তিনি সাহিত্য সৃষ্টির পরিবেশও তৈরি করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত লিটল ম্যাগাজিন “অবিনশ্বর” ছিল তরুণ লেখকদের প্রথম আশ্রয়, যেখানে অগণিত লেখক প্রথম প্রকাশ পেয়েছেন, সাহস পেয়েছেন, নিজেদের আবিষ্কার করেছেন। আর আন্তর্জাতিক পরিসরে তিনি পি.ই.এন. ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বমঞ্চে। আমার নিজ জীবনে এ এক গভীর আশীর্বাদ—তাঁরই উৎসাহে আমি পেন ইন্টারন্যাশনালের সদস্য হতে পেরেছি। তাঁর হাত ধরেই আমি অংশ নিয়েছিলাম ২০১২ সালে কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত ৭৬তম বিশ্ব লেখক সম্মেলনে, যেখানে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে। বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী লেখক গুল সোয়িঙ্কা, জে-ম্যারি গুস্তাভ লে ক্লেজিও, কোরিয়ার গভর্নরসহ শত শত সাহিত্যিকের উপস্থিতিতে ফরিদা হোসেন ছিলেন এক দীপ্ত উপস্থিতি—বাংলাদেশের মুখ, বাংলাদেশের কণ্ঠ। যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চেনেন, তাঁরা জানেন—তিনি এক নিরহংকার মানুষ, হৃদয়ে পরম নম্রতা। জ্ঞানের বিশালতা তাঁর অহংকার নয়, বরং আলোক। সাহিত্যিক খ্যাতি তাঁর কাছে ব্যক্তিগত গৌরব নয়, বরং এক সামাজিক দায়িত্ব। রাজনীতিক সংসারে থেকেও তিনি নিজেকে রেখেছেন সৃষ্টিশীল, সুশৃঙ্খল ও ভাবনাময়। তিনি যেমন লেখক, তেমনি মা, বন্ধু, উপদেষ্টা ও পথপ্রদর্শক। বাংলা সাহিত্য তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক (২০০৪) প্রদান করে। এছাড়াও মাইকেল মধুসূদন পদক, মওলানা ভাসানী স্বর্ণপদক, অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক, নন্দিনী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখক সমিতি সাহিত্য পুরস্কার, ফুলকলি সাহিত্য পুরস্কার, নারীকণ্ঠ শাইনিং পারসোনালিটি অ্যাওয়ার্ড (২০০৮)—এসব তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের মাইলফলক। তবু তাঁর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি—পাঠকের ভালোবাসা। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি, কারণ তাঁর মতো একজন কিংবদন্তি সাহিত্যিকের কাছে থেকে আমি শিখেছি সাহিত্য, জীবন, বিনয় এবং দায়িত্ববোধ। তাঁর অনুপ্রেরণায় আমার কলমে জন্ম নিয়েছে ৩০টি বই—যা তাঁর প্রভাব ও শিক্ষারই ফল। তিনি আমাকে চিনিয়েছেন সাহিত্যের প্রকৃত অর্থ— যেখানে শব্দ কেবল বাক্য নয়, বরং আত্মার সেতুবন্ধন। আজকের প্রজন্ম যখন সাহিত্যপথে হাঁটতে শুরু করে, তখন ফরিদা হোসেন হয়ে ওঠেন তাদের পথপ্রদর্শক আলোকবর্তিকা। তাঁর জীবন, তাঁর কাজ, তাঁর নীরব অবদান—সবই এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি আমাদের সময়ের গর্ব, আমাদের সাহিত্যের অভিজাত আভা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যতদিন শব্দ থাকবে, যতদিন কলমে প্রাণ থাকবে—ফরিদা হোসেনের নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। তাঁর প্রতি রইল আমার গভীর শ্রদ্ধা, চিরন্তন শুভকামনা— তাঁর আলো যেন অবিনশ্বর থাকে, তাঁর সৃষ্টিশক্তি যেন প্রজন্মের পর প্রজন্মে জ্বেলে রাখে সাহিত্যপ্রেমের প্রদীপ।