
-ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেনঃ
সাংবাদিকতা একটি জাতির বিবেক। রাষ্ট্রের আয়না, সমাজের নৈতিক কম্পাস এবং ইতিহাসের চলমান দলিল। এই মহৎ পেশায় যাঁরা আত্মনিবেদন করেন, তাঁদের দায়িত্ব কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়; বরং সত্য অনুসন্ধান, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং সময়ের ভাষ্য রচনা করা। এই প্রেক্ষাপটে মো. কামাল উদ্দিনের রচিত ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা’ গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হয়ে থাকবে। আজ তিনি সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন—এটি কেবল একটি সাংগঠনিক দায়িত্ব নয়, বরং দীর্ঘ সংগ্রাম, সততা, ত্যাগ ও আপোষহীন অবস্থানের স্বীকৃতি। তাঁর এই নেতৃত্ব সাংবাদিক সমাজে নতুন প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে—এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।শৈশব থেকে সংগ্রামের পথে ১৯৬৫ সালের ১০ মে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম চরণদ্বীপ গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে তাঁর জন্ম। কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরের প্রকৃতি, নদীর স্রোত আর গ্রামীণ জীবনযাপনের সরলতা তাঁর মনন ও চরিত্র গঠনে প্রভাব ফেলেছে। পিতা মরহুম সফর মুল্লুক ও মাতা মরহুম জাকিয়া খাতুনের সন্তান হিসেবে তিনি শৈশব থেকেই নৈতিকতা ও আদর্শিক চেতনায় গড়ে ওঠেন। সাত বোন ও তিন ভাইয়ের পরিবারে তিনি ভাইদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। পারিবারিক দায়িত্ব, জীবনের চড়াই-উতরাই এবং ব্যক্তিগত শোক—সবকিছুকে শক্ত মনোবল দিয়ে অতিক্রম করেছেন। তাঁর জীবনের বেদনার অধ্যায়ের একটি হলো ১৯৯৭ সালে ছোট ভাই আকতারের নিখোঁজ হওয়া—যার হদিস আজও মেলেনি। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং কলমকে করেছেন তাঁর প্রতিবাদের হাতিয়ার। লেখালেখির সূচনা ও বিকাশ ১৯৮৮ সালে সখের বসে লেখালেখি শুরু হলেও নব্বই দশক থেকে তিনি পূর্ণমাত্রায় কলমযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তখন থেকেই সমাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, গণতন্ত্র, নির্বাচনব্যবস্থা, ইতিহাস, মানবাধিকার এবং চট্টগ্রামের চলমান সমস্যাবলি তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। তিনি কেবল একজন সংবাদকর্মী নন—তিনি একজন অনুসন্ধানী চিন্তক। তাঁর লেখায় তথ্যের দৃঢ়তা যেমন আছে, তেমনি আছে বিশ্লেষণের গভীরতা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর ভাষা কখনো নমনীয় হয়নি; সত্যের প্রশ্নে তিনি আপোষ করেননি। গ্রন্থভাণ্ডার: সময়ের দলিল মো. কামাল উদ্দিনের রচিত গ্রন্থসমূহ সংখ্যায় ও মানে উভয়দিক থেকেই সমৃদ্ধ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বাঁকা কথা (২০০৮), নারী কথা (২০০৯), টক টক কথা, সমকথা, নির্মম নিয়তি, তাহাদের কথা, কর্ণফুলী কথা, পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ, বাংলাদেশে নির্বাচন ও নির্বাচনী তথ্য-উপাত্ত, বঙ্গবন্ধুর কথা, জীবন কথা, শোক কথা, রোহিঙ্গাদের ইতিকথা, চট্টগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা, সর্বনাশা আগস্ট ও বঙ্গবন্ধু, মনের কথা, সমকালীন কথা প্রভৃতি। তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলাদেশে নির্বাচন ও নির্বাচনী তথ্য-উপাত্ত’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং জাতীয় সংসদ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে তাঁর গবেষণা কেবল পাঠকপ্রিয় নয়, একাডেমিক মহলেও গ্রহণযোগ্য। “তাহাদের কথা” গ্রন্থে যৌনকর্মীদের হাজার বছরের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। “নারী কথা” গ্রন্থে নির্যাতিত ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জীবনের করুণ ও সাহসী অধ্যায় তুলে ধরেন। এসব কাজ তাঁকে একজন মানবিক লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।সাংবাদিকতা ও পেশাগত দায়িত্ব তিনি বর্তমানে জাতীয় দৈনিক ভোরের আওয়াজ এবং আন্তর্জাতিক ইংরেজি দৈনিক The Daily BANNER-এর যুগ্ম সম্পাদক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া জাতীয় দৈনিক সকালের সময়-এর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবেও সক্রিয় রয়েছেন। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে কেবল পেশা নয়—এটি দায়বদ্ধতা। সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নবঞ্চিত এলাকার সমস্যাগুলো তিনি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন। চট্টগ্রামের শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা আন্দোলনসহ বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি মো. কামাল উদ্দিন বিশ্বের একমাত্র লেখক সংগঠন PEN International-এর বাংলাদেশ সেন্টারের সদস্য। ২০১২ সালে কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত ৭৮তম বিশ্ব PEN সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে তিনি নোবেলজয়ী সাহিত্যিক Wole Soyinka এবং J. M. G. Le Clézio-এর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তিনি রাশিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, কাতার, চীন, কোরিয়া, সুইজারল্যান্ডসহ প্রায় ২০টির অধিক দেশ সফর করেছেন। ২০১৪ সালে জেনেভায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে অংশগ্রহণ করেন। এসব আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছে। টেলিভিশন উপস্থাপনা ও গণমাধ্যমে উপস্থিতি বাংলা টিভিতে “চট্টগ্রাম সংলাপ”, “সচিত্র চট্টগ্রাম”, “কিছু কথা কিছু গান”, “কথার কথা” প্রভৃতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয় উপস্থাপক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। প্রবাসে অবস্থানরত চট্টগ্রামের মানুষদের নিয়ে “প্রবাসে চট্টগ্রাম” অনুষ্ঠান বহু দেশে সম্প্রচারিত হয়েছে। তাঁর রচিত কাহিনির উপর ভিত্তি করে একাধিক নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মিত হয়েছে। তথ্যভিত্তিক ডকুমেন্টারিতেও তিনি সফলতা অর্জন করেছেন। সংগঠক ও সমাজসেবী তিনি মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম; বিভাগীয় সমন্বয়কারী, বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল; আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, ঢাকা জাতীয় সাংবাদিক ক্লাবসহ বহু সংগঠনের দায়িত্ব পালন করছেন। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে “গোল্ডেন হোম সার্ভিস” প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ তাঁর সমাজমুখী চিন্তার প্রমাণ। সভাপতি হিসেবে নতুন প্রত্যাশা সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ সাংবাদিক সমাজে নতুন দিশা দেখাবে। তাঁর নেতৃত্বে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, নৈতিক মানোন্নয়ন এবং ঐক্যবদ্ধ শক্তি আরও সুসংহত হবে—এ প্রত্যাশা অমূলক নয়। তাঁর গ্রন্থ ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা’ সাংবাদিকতার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী একটি দলিল। এটি সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন সহায়ক, তেমনি পেশাজীবী সাংবাদিকদের জন্যও দিকনির্দেশক। মো. কামাল উদ্দিন কেবল একজন লেখক বা সাংবাদিক নন—তিনি সময়ের সাক্ষী, সংগ্রামের প্রতীক এবং কলমের সৈনিক। সভাপতি হিসেবে তাঁর নির্বাচিত হওয়া সাংবাদিক সমাজের জন্য আশাবাদের বার্তা। আমি তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও অব্যাহত সাফল্য কামনা করি। তিনি যেন সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে কলমের আলোয় সমাজকে আলোকিত করে যেতে পারেন—এই প্রার্থনা রইল। ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন- পেশাদার ব্যারিস্টার, ইংল্যান্ড,আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠকন


