
১৮ই জুলাই—এই তারিখটি প্রতি বছরই আমার হৃদয়ে এক গভীর শূন্যতার দিন হয়ে ফিরে আসে। কারণ, এই দিনেই ২০০৯ সালে আমরা হারিয়েছিলাম এক মহান পুরুষকে, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, চট্টগ্রামের উন্নয়ন আন্দোলনের অগ্রদূত, আমার রাজনীতির প্রথম প্রেরণা, আমার জীবনের নির্মাতা—চট্টলবন্ধু আলহাজ্ব এস. এম. জামাল উদ্দিনকে।
এ বছর তাঁর ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হলো। সময় চলে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর অভাব, তাঁর শূন্যতা আরও গভীরভাবে অনুভব করছি। আমি আজ যদি একজন কলমযোদ্ধা হতে পারি, যদি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি, যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস করে কথা বলতে পারি—তবে তার পিছনে একটিই কারণ, তা হলো এই মহান মানুষটির আদর্শ, সাহসিকতা ও জীবনের শিক্ষা।
জন্ম ও সংগ্রামের শিকড়
১৯৪২সালের ২৮ শে জানুয়ারি হাটহাজারী হাটহাজারী উপজেলার মাদার্শা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হাটহাজারীর প্রথম মুসলিম ডিগ্রিধারী হেদায়েত আলী মাস্টারের দ্বিতীয় পুত্র। জন্মের পরপরই বাবাকে হারিয়ে তিনি যেন শৈশবেই জীবনের বাস্তবতা ও কঠিনতা বুঝে যান। সেই দুঃখক্লিষ্ট জীবন তাঁকে ভেঙে দেয়নি, বরং গড়ে তুলেছিল এক সংগ্রামী মনন। ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তানি শাসনামলে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে ছিলেন সাহসী কণ্ঠ। পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর অঙ্গসংগঠন শ্রমিক লীগের চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি হন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ নেতা এম. এ. হান্নানের নেতৃত্বে সংগঠনের কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন একজন সংগঠক ও সম্মুখ যোদ্ধা।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দৃঢ় বিশ্বাস
এস. এম. জামাল উদ্দিন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন আজীবন অনুসারী। বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠন করেন, তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের কালরাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর, যেই সময় প্রায় সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, সেই সময় এস. এম. জামাল উদ্দিন ছিলেন প্রতিবাদী, সোচ্চার ও অকুতোভয়। তিনি বছরের পর বছর চট্টগ্রামে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন করেছেন, যখন তা রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হতো না।
বাকশাল পুনর্গঠনের সময় আবদুর রাজ্জাক সাহেবের নেতৃত্বে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জিয়াউর রহমানের সময় হাটহাজারী আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন, প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
সংগঠন, আন্দোলন ও অবদান
তিনি ছিলেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। চট্টগ্রামের উন্নয়ন দাবিতে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন আন্দোলন, কর্মসূচি, গণসংযোগ করেছেন।তারাই ধারাবাহিকতায় ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন এর
নেতৃত্বে গঠিত ‘চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম’ এটা এখন হয়ে উঠেছে এক সম্মিলিত গণচেতনার প্রতীক। তিনি বারবার বলেছেন—“চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের সমৃদ্ধি।”
ব্যক্তিগতভাবে আমার অনুভব
আমি তাঁর হাতে তৈরি। আমার রাজনৈতিক চেতনা, সমাজ ভাবনা, নেতৃত্বের সাহস—সবই এস. এম. জামাল উদ্দিনের দেওয়া। তিনি শুধু নেতা ছিলেন না, ছিলেন আমার জীবনের অভিভাবক, এক বাস্তবিক পথপ্রদর্শক।
তিনি আমার কাছে ছিলেন যেমন রাজনৈতিক আদর্শ, তেমনি ছিলেন পারিবারিক মমতার এক আশ্রয়। তাঁর চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠের দৃঢ়তা, সমাজের প্রতি তাঁর ভালোবাসা—সবকিছু আজও আমার জীবনকে চালিত করে।
১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজন
গতকাল সকাল ৯টায় তাঁর গ্রামের বাড়ি হাটহাজারীর মাদার্শা গ্রামে কবরে ফুলেল শ্রদ্ধা ও কবর জিয়ারত করেছি আমরা। চেরাগি পাহাড় থেকে একদল অনুসারী তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শকে বুকে ধারণ করে যাত্রা শুরু করে। বাদ আসর কদম মোবারক এতিমখানায় অনুষ্ঠিত হয় কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিল। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করেন নেতৃবৃন্দ, শুভাকাঙ্ক্ষী, স্বজন ও সাধারণ মানুষ।
আজও তিনি বেঁচে আছেন
এস. এম. জামাল উদ্দিন শরীরগতভাবে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ, তারুণ্য গড়ার দৃষ্টান্ত, চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য তাঁর সংগ্রাম আজও আমাদের পথ দেখায়। তাঁর রেখে যাওয়া সংগঠনগুলো আজও কাজ করছে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য।
আমি আজ যদি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি, কলম হাতে তুলে নিতে পারি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিৎকার করতে পারি—তবে তা এস. এম. জামাল উদ্দিনের কারণেই। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন, কীভাবে এক হাত দিয়ে কলম আর আরেক হাত দিয়ে পতাকা ধরে রাখতে হয়।
চট্টলবন্ধু এস. এম. জামাল উদ্দিন, আপনি আমাদের মাঝে নেই—তবুও আপনার প্রতিটি শিক্ষা, প্রতিটি সংগ্রাম, প্রতিটি দৃঢ় পদক্ষেপ আজ আমাদের জীবনের দিশারী হয়ে আছে। আমি আজীবন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার হৃদয়ে আজও চট্টলবন্ধুর নাম বেঁচে আছে আলোকবর্তিকা হয়ে।

