
মো.কামাল উদ্দিনঃ
সাভারের মজিদপুরে ঘটে যাওয়া এক লোমহর্ষক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে আজ গোটা দেশ স্তব্ধ। একটি মেয়ে—শিফা—৯৯৯ নম্বরে ফোন করে জানায়: “আমি আমার বাবাকে খুন করেছি। আমাকে ধরে নিয়ে যান। আমি একজন নরপশুকে শেষ করেছি।” এই স্বীকারোক্তি যেমন কাঁপিয়ে দেয় জাতির বিবেক, তেমনি জন্ম দেয় অসংখ্য প্রশ্নের। শিফা কি সত্যিই আত্মরক্ষা করেছে, না কি পূর্বপরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ডকে সহানুভূতির মুখোশ পরিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে?
প্রথম বর্ণনায় জানা যায়, নিহত আব্দুস সাত্তার নাটোরের সিংড়ার বাসিন্দা, স্ত্রী মৃত্যুর পর একমাত্র মেয়ে শিফাকে নিয়ে সাভারে বসবাস করতেন। শিফার অভিযোগ, তার বাবা চার বছর ধরে তাকে ধর্ষণ করে আসছিলেন। ২০২২ সালে একবার তিনি থানায় মামলা দায়েরও করেন, তবে বাবার জামিনে মুক্তির পর আবার শুরু হয় সেই দুঃসহ দিনরাত্রি। এক পর্যায়ে শিফা বাবাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে গভীর রাতে কুপিয়ে হত্যা করে।
এতটুকু পর্যন্ত তথ্য শুনে অনেকেই শিফার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। অনেকে বলছেন, এটি একটি আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ। এক অসহায় মেয়ের দীর্ঘদিনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর প্রতিবাদ। কিন্তু এখানেই ঘটনা নেয় মোড়।
ঘটনার আরেকটি পিঠ আছে—যা পুলিশের তদন্ত, স্থানীয়দের বক্তব্য ও পূর্বের নথিপত্র থেকে উঠে এসেছে। জানা যায়, শিফা ছিলেন কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল। তিনি তার দুই বান্ধবীকে ফ্ল্যাটে এনে সাবলেট রাখতেন। তার বাবা এই অবস্থাকে মেনে নিয়ে নিজেই ডাইনিং রুমে ঘুমাতেন। পরে আব্দুস সাত্তার লক্ষ্য করেন, তার মেয়ে ও বান্ধবীরা ড্রাগস ও বিকৃত যৌন আচরণে জড়িয়ে পড়েছেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেই থানায় মেয়ের নামে জিডি করেন, মেয়েকে এই বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও করেন।
এক রাতে, আব্দুস সাত্তার অভিযোগ করেন—তিনি তার মেয়ে ও দুই বান্ধবীকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান। তখন তিনি মেয়েকে কঠোরভাবে সতর্ক করে বান্ধবীদের বাসা ছাড়ার কথা বলেন। এরপর থেকেই মেয়ে তার ওপর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশি সূত্র অনুযায়ী, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে, যাতে বাবা বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে—এর আগেও একবার ধর্ষণের মামলা করা হয়েছিল, তবে ফরেনসিক রিপোর্টে কোন সত্যতা মেলেনি এবং সাত্তার জামিনে ছাড়া পেয়েছিলেন।
তবে, এই বিপরীত বর্ণনাটিও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, কেনই বা একজন বাবা নিজেই ডাইনিং রুমে থেকে মেয়ের সুবিধা নিশ্চিত করবেন? কেনই বা বারবার সহ্য করবেন অপমান, নেশা, উশৃঙ্খলতা? আবার, কেনই বা এক মেয়ে এতটা নির্দয় হবে, যদি না তার মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কিংবা প্রতিশোধপ্রবণতা জমে থাকে?
সত্য কোনটা? সমাজের দায় কোথায়?
এই ঘটনার দুটি বিপরীতধর্মী বর্ণনা আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়:
আসল সত্য কোনটি? একজন মেয়ে নিজের গাল্পনায় এক নাটক সাজিয়ে সহানুভূতি আদায় করতে চেয়েছে, নাকি সে সত্যিই বহু বছরের নির্যাতনের শিকার হয়ে চরম প্রতিবাদে নামতে বাধ্য হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আইন ও প্রমাণের মাধ্যমে। আমাদের দায়িত্ব নয়, বিচার করা কে খুনি, কে নির্যাতক। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব—সত্য উদঘাটন করা। প্রশাসন, ফরেনসিক বিভাগ ও আদালতের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ তদন্ত করে বিচার নিশ্চিত করা। একান্ত সত্য উদঘাটন করাই কেবল পারবে দেশকে আরও একটি বিভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।
শেষ কথা-এই ঘটনা আমাদের সমাজব্যবস্থার এক নগ্ন রূপ উন্মোচন করেছে। যেখানে পরিবারে নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ, যেখানে বাবার ছায়ায় মেয়েও অনিরাপদ, আবার যেখানে মেয়ে কোনো পাপ ঢাকতে ধর্ষণের নাটক সাজায়—সেখানেই ভেঙে পড়ে সমাজের আস্থা, সম্পর্কের ভিত্তি ও ন্যায়বিচারের চেতনা।
আমরা কি তবে শুধু অপেক্ষা করব আরও একটি শিফার জন্য? নাকি এখনই প্রশাসন, সমাজ ও পরিবার একত্র হয়ে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াবে? তিন বান্ধবীকে মুখোমুখি করলে আসল রহিস্য উদঘাটন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে – আবারও পুনরায় প্রশ্ন আসল সত্যিটা কি??

