শিরোনাম
২২তম স্মরণ সভায় সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা- সাংবাদিক সৈয়দ মোস্তফা জামাল ছিলেন নিরহংকারী, নীতিবান, মানবতাবাদী ও সমাজহিতৈষী মানুষসরকার বাংলাদেশ পুলিশের ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার ১৩ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে।তেলের দাম বাড়ল, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা অব্যাহতভয়াবহ আগুনে বানিয়াচং বাজারে ৯ দোকান পুড়ে ছাই“২২ এপ্রিল: জন্ম এক মানুষের, জাগরণ এক ইতিহাস—লেনিনের আলোয় বিশ্ব ও আমার দেখা”প্রজ্ঞানন্দ স্মৃতি সংসদের নতুন কমিটি গঠিত২৪ ঘণ্টায় সাত খুন: জামায়াত আমিরের ক্ষোভ, সরকারের সমালোচনাদুই আসনের নির্বাচনী নথি সংরক্ষণের নির্দেশরাজনীতির ছায়ায় শিক্ষা ক্যাম্পাস: চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে সংঘর্ষ, আতঙ্কে সাধারণ শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার দিনে অস্থিরতা-এবার ‘দম’ দেখবে সারা দেশ

― Advertisement ―

সততা, পরিশ্রম এবং মানবিকতার প্রতীক: সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমানের জীবনগাথা-

Homeসম্পাদকীয়সততা, পরিশ্রম এবং মানবিকতার প্রতীক: সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমানের জীবনগাথা-

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
স্মৃতিতে, সাফল্যে এবং মানবিকতায় সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ও অতিবাহিত জন্মদিনে শুভেচ্ছা সহ কিছু কথা-আমার জীবনে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের সঙ্গে সংযোগ শুধু পেশাগত বা সামাজিক নয়; বরং তাদের সঙ্গে কাটানো সময়, আড্ডা, সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে গভীর ছাপ ফেলে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে আমার স্মৃতি বহু রঙের, নানা ধরণের এবং সময়ের স্বাক্ষর বহন করে। বিশেষ করে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি, আমাদের আলোচনার চঞ্চলতা, চিন্তার বিনিময় এবং উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার আড্ডা—সবই যেন এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। আমাদের সমন্বয় ঘটেছে এমন অনেক বড় মুহূর্তে যেখানে ডিআইজি মনির উজ জামান, পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার চৌধুরী, ডিআইজি রোকন উদ্দিন ফকির এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতেন। এই আড্ডাগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তারা ছিলেন চিন্তাশীল মানুষের সংলাপের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে দেশের উন্নয়ন, চট্টগ্রামের কল্যাণ এবং সমাজসেবার দিকগুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হতো। সেই সমস্ত মুহূর্তে মিজানুর রহমানের উপস্থিতি আমাদের সবাইকে প্রেরণা জুগিয়েছে। আমার বন্ধু এস এম শফি-র মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিগুলোকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। তিনি একাধিকবার আমাকে দেখিয়েছেন কিভাবে মিজানুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন, বিনয়ীভাবে সমালোচনা শুনেন এবং উদারতার সঙ্গে পরামর্শ দেন। সেই সমস্ত মুহূর্তে আমরা দেখেছি যে, সত্যিকারের নেতৃত্ব কেবল পদ, ধন বা ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সমষ্টিগত কল্যাণের প্রতি প্রতিশ্রুতিতে নিহিত। যখন এই স্মৃতিগুলো মনে পড়ে, তখন শুধু একটি ব্যক্তি নয়, বরং তাঁর চারপাশে গড়ে ওঠা সমন্বিত শক্তি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরীর জীবনযাত্রা, শিল্পে, ব্যবসা ক্ষেত্রে, শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদান এবং মানুষের প্রতি আন্তরিকতা—সবই আমাদেরকে শেখায়, কিভাবে সত্যিকারের সফলতা অর্জন করতে হয়। এই সূচনা শুধু তাঁর জীবনের সাফল্যের কথা নয়; বরং এটি এক বন্ধুত্ব, সম্মান এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার গল্প। প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি আড্ডা, প্রতিটি আলোচনা—সবই আমাদের মনে গেঁথে গেছে, যা এই প্রবন্ধকে শুধুমাত্র তথ্যপূর্ণ নয়, বরং হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছে।


সেই কারণেই, এই লেখার শুরুতেই আমি আমাদের সকল স্মৃতি ও সম্মানকে একত্রিত করে বলতে চাই—সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী শুধু একজন শিল্পপতি নন; তিনি আমাদের সমাজের একজন জীবন্ত প্রেরণা, যার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের জন্য মূল্যবান এবং শিক্ষণীয়।আজকের এই লেখা লিখতে বসলাম উনার জন্মদিন উপলক্ষে- নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন গ্রামে ১৯৪৩ সালের ১২ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যেন তাঁর জীবনে লেখা শুরু হয়একটি জীবনের গল্প যা শুধু সফলতার নয়, বরং সততা, মানবিকতা, শিক্ষা ও সমাজসেবার অনন্য দৃষ্টান্তে পরিপূর্ণ। ৮৪ বছরে পৌঁছানো এই মানুষটির জীবন কাহিনী আমাদের শেখায়, যে সঠিক পথে পরিশ্রম করলে, মানবিকতা ও দেশপ্রেমকে আদর্শ করলে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই হয়ে ওঠে প্রেরণার উৎস।
ছোটবেলায় মিজানুর রহমান দেখেছেন তার পরিবারের পরিশ্রম, সততা এবং শিক্ষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তার পিতার নাম সুফি মুহাম্মদ দায়েম উদ্দিন এবং মাতার নাম রাহাতুন নেসা। তারা তাকে শিক্ষিত ও নৈতিকভাবে সংহত করে বড় করেছেন। মিজানুর রহমানের শৈশব কেটেছে সরল গ্রামীণ পরিবেশে, যেখানে প্রকৃতি, মানবিকতা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তার জীবনের প্রথম পাঠ হয়ে ওঠে। বিদ্যালয় জীবন শুরু হয় ভারত চন্দ্র বিদ্যালয় থেকে, যেখানে ১৯৬১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক এবং পরে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। কলেজের দিনগুলোতে তিনি শুধু বই পড়েননি; ব্যাংকিং, ব্যবসা এবং অর্থনীতির মৌলিক নীতিও শিখেছেন। সেই আগ্রহ তাকে পরবর্তীতে ব্যাংকিং বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জনের পথে প্রেরণা জুগিয়েছিল।
মিজানুর রহমানের কর্মজীবন শুরু হয় একেবারে সাধারণভাবে—নারায়ণগঞ্জের জালাল জুট ভ্যালি কোম্পানি-তে মাত্র ১০০ টাকার বেতনে। তবে তার দৃঢ় মনোবল এবং স্বপ্নের উদ্দীপনা তাকে কখনও হতাশ হতে দেয়নি।
১৯৬৫ সালে তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (বর্তমান সোনালী ব্যাংক লিমিটেড)-এর চট্টগ্রামের লালদীঘি শাখায় জুনিয়র ক্লার্ক হিসেবে যোগ দেন। ব্যাংকিং জগতে প্রথম পদক্ষেপ হলেও, প্রতিটি দিনই তাকে মূল্যবান অভিজ্ঞতা এবং নীতি শিখিয়েছে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমান পূবালী ব্যাংক লিমিটেড)-এর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় বৈদেশিক বিভাগের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন। এই সময়ে তিনি শিখেছিলেন ব্যবসায়িক নীতি, আর্থিক ব্যবস্থা এবং কৌশলগত চিন্তাভাবনা—যা পরবর্তীতে তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর মিজানুর রহমান ব্যাংকিং চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নেমে পড়েন। তিনি ব্যাংক লোন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। প্রথম দিকে পণ্য আমদানি করে দেশীয় বাজারে বিক্রি করা শুরু করেছিলেন, তবে ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ প্রসারিত হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে পুরনো জাহাজের আসবাবপত্র এবং যন্ত্রাংশ বিক্রি হতো। এটি ছিল তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধি এবং চাহিদার বাস্তবায়নের প্রমাণ। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করা রি-রোলিং মিল, ১৯৮৪ সালে ‘মংলা ইঞ্জিনিয়ার্স ওয়ার্কস’ এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকায় পিএইচপি রানী মার্কা ঢেউটিন কারখানা তাঁকে শিল্পক্ষেত্রে পরিচিতি এনে দেয়। এরপর তিনি ধাপে ধাপে সব প্রতিষ্ঠানকে পিএইচপি গ্রুপের অধীনে নিয়ে আসেন। আজ এই গ্রুপের অধীনে ২৯টির বেশি কোম্পানি রয়েছে, যা শিল্প, প্রকৌশল, বাণিজ্য এবং সেবাখাতকে সমৃদ্ধ করেছে।
মিজানুর রহমান কেবল ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার উদ্যোগে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনায় সৃজনশীলতার প্রসার ঘটানো হয়েছে।
ঢাকার কাঞ্চননগর গ্রামে তিনি ৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটি শুধু চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করে না; সামাজিক সেবার এক মডেল। এছাড়াও, তিনি গজল ও সুফিবাদকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রসার ঘটিয়েছেন।
২০০০ সালে রোটারী ইন্টারন্যাশনালে যোগদান করেন। ২০১৬ থেকে ২০১৭ মেয়াদে তিনি ডিস্ট্রিক্ট ৩২৮২, বাংলাদেশ-এর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রোটারী ইন্টারন্যাশনালের ‘আর্চ ক্লাম্প সোসাইটি মেম্বার’ এবং স্ত্রী তাহামিনা রহমানের সঙ্গে ‘কাপল আর্চ ক্লাম্প সোসাইটি মেম্বার’ হিসাবে অনন্য স্থান অধিকার করেন। সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং নৈতিকতার প্রসারে তার নেতৃত্ব অগ্রণী।তার ব্যক্তিগত জীবনও ততটাই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাহামিনা রহমানের সঙ্গে বিবাহিত এই দম্পতির ৭ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। পরিবারকে তিনি সর্বদা প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখেছেন। সততা, আদর্শ এবং সহযোগিতা তাঁর পারিবারিক জীবনের মূলমন্ত্র। মিজানুর রহমানের জীবন ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা: দ্য ডেইলি স্টার অ্যান্ড ডিএইচএল বেস্ট বিজনেস অ্যাওয়ার্ড (২০০৩) – বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য। ব্যাংক বীমা অ্যাওয়ার্ড (২০০৭) – ব্যাংক ও বীমা খাতে উদ্ভাবনী নীতি প্রয়োগের স্বীকৃতি। ব্যাংক-বীমা অর্থনীতি অ্যাওয়ার্ড (২০০৯, ২০১১) – আর্থিক খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য। ইন্দোনেশিয়ার মাননীয় কনসাল, বাংলাদেশে (২০১৮) – দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং সমাজসেবায় বিশেষ অবদান। একুশে পদক (২০২০) – শিক্ষা, সমাজসেবা ও শিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা। মিজানুর রহমানের জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি, সফলতা কেবল অর্থোপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সততা, পরিশ্রম, সমাজসেবা ও মানবিকতার সংমিশ্রণে প্রকৃত সফলতা নিহিত। তার জীবন যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করে। স্বপ্ন দেখো – কোন বড় অর্জন ছোট স্বপ্নের মাধ্যমে শুরু হয়। পরিশ্রম করো – নিয়মিত শ্রম এবং ধৈর্যই প্রকৃত সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। সততার পথে চলো – ব্যবসা বা জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে সততা বজায় রাখলে সম্মান ও দীর্ঘস্থায়ী সফলতা আসে। সমাজের কল্যাণে কাজ করো – ব্যক্তি জীবনের সাফল্য সমাজের কল্যাণে কাজে লাগলে তা প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ হয়।
৮৪তম জন্মদিনে আমরা কেবল একজন শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীর গল্পই দেখি না; আমরা দেখি একজন সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং মানবিক নেতার জীবনের আলোকচ্ছটা। সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রমাণ করেছেন যে সততা, পরিশ্রম, উদারতা এবং দেশপ্রেম মিলিত হলে একজন মানুষ সমাজে অমুল্য প্রভাব ফেলতে পারে। তার জীবনকাহিনী প্রমাণ করে, বাস্তব সফলতা কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের কল্যাণে অবদান রাখার মধ্যেই প্রকৃত অর্থ নিহিত।