― Advertisement ―

তেলের দাম বাড়ল, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা অব্যাহত

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমার বদলে বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, পাকিস্তানের...

“২২ এপ্রিল: জন্ম এক মানুষের, জাগরণ এক ইতিহাস—লেনিনের আলোয় বিশ্ব ও আমার দেখা”

Homeসম্পাদকীয়“২২ এপ্রিল: জন্ম এক মানুষের, জাগরণ এক ইতিহাস—লেনিনের আলোয় বিশ্ব ও আমার...

—মো. কামাল উদ্দিন
২২ এপ্রিল—একটি তারিখ, যা কেবল একটি জন্মদিন নয়; এটি ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার সূচনাদিবস। এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন Vladimir Ilyich Lenin—যার নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে বিপ্লব, পরিবর্তন, এবং শোষণমুক্ত এক মানবিক সমাজের স্বপ্ন। ১৮৭০ সালের এই দিনে, জারশাসিত রাশিয়ার ছোট্ট শহর সিমবির্স্কে জন্ম নেওয়া এক শিশুর ভেতরে তখনও লুকিয়ে ছিল না কোনো বিপ্লবের বজ্রধ্বনি। কিন্তু সময়, সমাজ ও ইতিহাস তাকে গড়ে তুলেছিল এক অনন্য চিন্তক ও সংগঠকে। তাঁর প্রকৃত নাম ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ—কিন্তু ইতিহাস তাঁকে চেনে “লেনিন” নামেই। শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন বৈষম্য, অন্যায় ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। পিতা ছিলেন শিক্ষাবিদ, মা ছিলেন বিদুষী নারী। কিন্তু তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় অভিঘাত আসে যখন তাঁর বড় ভাই আলেক্সান্ডার জার হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। সেই ঘটনার আগুনই যেন তাঁর ভেতরে জ্বালিয়ে দেয় প্রতিরোধের প্রথম শিখা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশের পর তিনি সরাসরি জড়িয়ে পড়েন ছাত্র আন্দোলনে। কাজান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, নির্বাসন—সবকিছুই তাঁর পথ থামাতে পারেনি। বরং তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন Karl Marx-এর দর্শন, এবং বুঝতে পারেন—শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব প্রয়োগই ইতিহাসের রূপ বদলায়। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি গড়ে তোলেন একটি নতুন পথ—যেখানে বিপ্লব কেবল স্বপ্ন নয়, বরং সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞ। ১৯১৭ সালের Russian Revolution-এর মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এটি শুধু একটি দেশের পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল একটি নতুন যুগের সূচনা। লেনিনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—চিন্তা ও প্রয়োগের অসাধারণ মেলবন্ধন। তিনি বুঝেছিলেন, ইতিহাসের কোনো স্তরকে লাফ দিয়ে অতিক্রম করা যায় না। তাই তিনি রাশিয়ার বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে চীনসহ অনেক দেশে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ ছিল তীক্ষ্ণ ও বাস্তবভিত্তিক। তিনি দেখিয়েছেন—রাষ্ট্র কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়; এটি শাসক শ্রেণির হাতিয়ার। এই ভাবনাকে পরবর্তীতে আরও গভীর করেছেন Antonio Gramsci এবং Michel Foucault। কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো ভাঙার বাস্তব পথনকশা দিয়েছেন লেনিন নিজেই। তিনি বিশ্বাস করতেন—স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত বিপ্লবী দল, সুস্পষ্ট মতাদর্শ এবং পরিকল্পিত সংগ্রাম। তাঁর এই ধারণাই “বিপ্লবী পার্টি” তত্ত্ব হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। লেনিনের জীবন ছিল এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের কাব্য। জারের নিপীড়ন, নির্বাসন, পলাতক জীবন—সবকিছুর মাঝেও তিনি থেমে যাননি। তাঁর সহধর্মিণী Nadezhda Krupskaya-কে পাশে নিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন অদম্য শক্তিতে। লিখেছেন অসংখ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা করেছেন Iskra পত্রিকা, গড়ে তুলেছেন বিপ্লবী সংগঠন। আমি নিজে যখন রাশিয়ায় গিয়েছিলাম, তখন তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে Lenin Library-এর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল—এ শুধু একটি লাইব্রেরি নয়, এটি এক বিপ্লবের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র। সেখানে প্রতিটি বই, প্রতিটি দেয়াল যেন লেনিনের চিন্তার সাক্ষ্য বহন করছে। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল, তার আলো আজও নিভে যায়নি। যদিও ১৯২৪ সালে তাঁর মৃত্যু ঘটে, কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর চিন্তা আজও জীবন্ত। ১৮৪৮ সালে মার্ক্স বলেছিলেন, “কমিউনিজমের ভূত ইউরোপকে তাড়া করছে।” সেই ভূত আজও অদৃশ্যভাবে বিদ্যমান—প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, প্রতিটি বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আজ ২২ এপ্রিল—লেনিনের জন্মদিনে দাঁড়িয়ে মনে হয়,
এটি কেবল একজন মানুষের জন্মদিন নয়,
এটি এক স্বপ্নের জন্মদিন,
এক সংগ্রামের জন্মদিন,
এক অমর আদর্শের জন্মদিন।
যতদিন পৃথিবীতে শোষণ থাকবে,
যতদিন অন্যায় থাকবে,
ততদিন লেনিন ফিরে আসবেন—
নতুন নামে, নতুন রূপে, নতুন সংগ্রামে।
লেনিন তাই ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নন—
তিনি আজও আমাদের প্রশ্ন করেন,
আমাদের ভাবতে শেখান,
এবং লড়াই করতে অনুপ্রাণিত করেন।
তাঁর জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা—
একজন মানুষের প্রতি নয়,
একটি জাগরণের প্রতি।