
মো.কামাল উদ্দিনঃ
সুর মানুষের আত্মাকে ছুঁয়ে যায়, হৃদয়ের নিঃসঙ্গতা ভরিয়ে তোলে, একটুকরো আশ্রয় দেয় যন্ত্রণার ভিতরেও। আজ এমনই এক সুরের সন্ধান পেলাম, যা শুধু শ্রবণেন্দ্রিয় নয়, আমার সমস্ত সত্তাকেই আলোড়িত করে তুলল। তাঁর নাম—নূরে ইফতে খাইরুন ন্নেসা মাহিয়া। জন্মেছেন বোয়ালখালীতে, বেড়ে উঠেছেন ভালোবাসা, শিক্ষা আর সংগীতের পবিত্র আলোয়। তাঁর পিতা মোহাম্মদ আবুল হাসেম চৌধুরী এবং মাতা ফিরোজা বেগম—দুজনেই যেন জীবনের নানা পথে তাঁর পথপ্রদর্শক হয়ে আছেন। তবে আজ মাহিয়ার কথা বলতে গিয়ে শুধু এক শিল্পীর বর্ণনা নয়, এক সম্ভাবনাময় সাংগীতিক ইতিহাসের গোড়াপত্তনের কথাও বলতে হয়। আজকে সুরের আড্ডায় হঠাৎ আগমন- দিনটি ছিল একেবারে সাধারণ একটি দিন, কিন্তু পরিণতি—অসাধারণ। চট্টগ্রামের লুসাই ভবনের নিচে ইলিয়াস ইলুর ‘সাউন্ড টার্চ’ স্টুডিওতে গানের আড্ডায় হঠাৎই প্রবেশ করি। ইলিয়াস ইলু শুধু সংগীতশিল্পীই নন, একজন দক্ষ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারও বটে। তাঁর আড্ডায় প্রাণের উচ্ছ্বাস, সংগীতের নেশা, এবং শিল্পপ্রেমীদের মিলন ঘটে প্রতিনিয়ত। সেখানে উপস্থিত ছিলেন লোক ও গণসংগীতের শক্তিশালী কণ্ঠ মোজাহিদ—যাঁর গলায় মাটির গন্ধ আছে, দ্রোহের ধ্বনি আছে, হৃদয়ের আহ্বান আছে। আমি সেই গানের ভক্ত অনেক আগে থেকেই।
সেই আড্ডায় হঠাৎ করে মাহিয়া প্রবেশ করেন তাঁর পিতার সঙ্গে। মুখে বিনয়, চোখে আভিজাত্য, আর সুরে যেন গোপন বিস্ময়ের পাথেয়। তিনি যখন মেহেদী হাসানের একটি জীবনঘনিষ্ঠ গজল পরিবেশন করলেন, তখন পুরো স্টুডিও যেন মুহূর্তেই অন্য এক জগতে পাড়ি দিল। সেই কণ্ঠ—কোকিলের মধুময় সুরের মতো, তাতে ছিল প্রশান্তি, প্রেম, বেদনা, আর এক গভীর আত্মিকতা। মেহেদী হাসান থেকে নজরুলের গৃহে- মাহিয়ার কণ্ঠে মেহেদী হাসান ছিলেন না শুধুই অনুকরণীয়, বরং তিনি যেন গানে তাঁর আত্মা মিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর গায়নশৈলী এতটাই পরিপক্ব ও হৃদয়গ্রাহী যে, এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর বয়স বা অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না। কণ্ঠে ছিল দার্শনিকতার সুর, আত্মমগ্নতার মাধুর্য। তিনি গেয়েছেন নজরুলসংগীতও, এবং যেভাবে গেয়েছেন, তা শুনে মনে হয়েছে—এই তরুণী কণ্ঠস্বরটি যেন বহন করে চলেছে নজরুলের বিপ্লব ও প্রেম, ধ্বংস আর সৃষ্টি, বিরহ ও বেদনার সুরমাধুর্য।নজরুলসংগীত গাইতে সাহস লাগে। কারণ নজরুলের গান শুধু গলা দিয়ে গাওয়া যায় না, তাকে ধারণ করতে হয় হৃদয়ে, বুঝতে হয় তার ভাষা, সময়, দর্শন। মাহিয়া তেমনভাবেই গানকে আত্মস্থ করেছেন। তাঁর কণ্ঠে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ যেমন গর্জে ওঠে, তেমনি ‘ভালোবাসার মুক্তিতে’ ভেসে আসে কোমলতা।শিল্পীসত্তার অনুসরণে-
মাহিয়া নিজেকে গড়ে তুলেছেন সংগীতের বড় বড় নামগুলোর আদর্শ অনুসরণ করে। সুবীর নন্দী, রুনা লায়লা এবং শামিনা ইয়াসমিন—এই কিংবদন্তিদের গান তাঁর হৃদয়ের পথপ্রদর্শক। তবে শুধুই অনুসরণ নয়, মাহিয়া নিজেই হয়ে উঠছেন একটি স্বতন্ত্র ধারা, একটি নব সংগীতবোধের প্রতিনিধি। শিল্পী হতে হলে গানের পেছনের গল্প জানতে হয়, প্রতিটি সুরের মানে উপলব্ধি করতে হয়। আর সে উপলব্ধির চর্চা মাহিয়া করছেন ছোটবেলা থেকেই। ক্লাসিক সংগীতের তালিম তাঁর কণ্ঠে পরিণত হয়েছে পরিশীলিত, পরিপক্ব, এবং পূর্ণাঙ্গ এক রূপে। আজকের এই মোবাইল আর ইউটিউব যুগে যেখানে ‘শর্টকাট’ প্রতিভার ছড়াছড়ি, সেখানে মাহিয়া এক নিবেদিতপ্রাণ সাধকের মতোই গানে নিজেকে প্রতিনিয়ত তিলে তিলে গড়ছেন।
পাঠচর্চা ও আত্মশুদ্ধি-আশ্চর্যের বিষয় হলো, গানের পাশাপাশি মাহিয়া পড়াশোনাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর জন্য সংগীত কেবল ক্যারিয়ার নয়, এটি এক আত্মশুদ্ধির পথ, এবং জ্ঞানের সঙ্গে তার চিরন্তন মিলনের চেষ্টা। আধুনিক তরুণদের জন্য এ যেন এক অনন্য উদাহরণ—কীভাবে শিল্প আর শিক্ষার যুগলবন্দি মানুষকে আরও পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে।আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া-
মাহিয়া কেবল আধুনিক সংগীতেই সীমাবদ্ধ নন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে বহু মরমি ও আধ্যাত্মিক গান, যেগুলোর স্রষ্টা হলেন হযরত শাহ সুফি এম কে আহমেদ নকশাবন্দী (রহঃ)। তাঁর গানে থাকে দেহতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, এবং আত্মার মুক্তির আকুতি। মাহিয়া যখন এসব গান করেন, মনে হয়—এক নির্জন ভক্ত মনের সমস্ত অর্ঘ্য সুরের পুষ্পে সাজিয়ে প্রিয়তমের চরণে নিবেদন করছেন।
এই আধ্যাত্মিকতা তাঁর কণ্ঠে এক গোপন আলো ছড়ায়। গানের মধ্যে থাকে না কোনো বাহুল্য, থাকে নিখাদ অনুভব। আর এই অনুভবই তাঁকে আলাদা করে তোলে, দেয় এক অনন্য উচ্চতা।
একটি সম্ভাবনার নাম-আজ মাহিয়া যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে তাঁর উড়াল কেবল সময়ের ব্যাপার। তাঁর কণ্ঠে আমরা শুনি অতীতের ঐতিহ্য, বর্তমানের পরিশীলন, আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। তিনি কেবল বোয়ালখালীর গর্ব নন, তিনি বাংলাদেশের গর্ব হয়ে উঠবেন—এই বিশ্বাস আজ আমাদের সকলের।
তাঁর গান শুধু সুর নয়, তা এক ধ্যান, এক আরাধনা। তাঁকে ঘিরে সংগীতজগত যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি নতুন প্রজন্ম পাবে এক আদর্শ। যে কণ্ঠ মানুষকে ভাবায়, আবেগে ভাসায়, স্মৃতির স্রোতে গা ভাসাতে শেখায়—সে কণ্ঠ কখনও বিস্মৃত হয় না। মাহিয়া তেমনই এক কণ্ঠস্বর—যা ধীরে ধীরে আমাদের সংস্কৃতির বাতিঘরে পরিণত হবে।
আজকের এই লেখাটি শুধুই এক সংগীত সন্ধ্যার স্মৃতিচারণ নয়। এটি এক সম্ভাবনার দলিল, এক নবতর আগমনের প্রত্যাশা, এক শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ক্ষুদ্র প্রয়াস। নূরে ইফতে খাইরুন ন্নেসা মাহিয়ার মতো শিল্পীরা সংগীতজগতের এক অলিখিত ইতিহাস হয়ে থাকেন—যাঁরা আত্মপ্রচারের পেছনে না ছুটে, সুরকে ভালোবেসে, সাধনার জলে হৃদয় ধুয়ে, আমাদের মনোজগতে গাঁথেন এক অসামান্য রূপকথা। তাঁর পথ হোক দীপ্তিময়, তাঁর কণ্ঠ হোক শাশ্বত আর তাঁর শিল্প হোক চিরজাগরুক।

