শিরোনাম
➤চট্টগ্রামের স্বার্থে একজন চেয়ারম্যানকে কাজ করতে দিন | নগর পরিকল্পনার কঠিন পথে বাধা নয়, চাই সত্য, প্রমাণ ও আইনের শাসন➤উৎপাদন বাড়লে হাতের নাগালে আসতে পারে ইলিশের দাম➤মিছিল থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মী আটক, ছাড়িয়ে নিলেন পথচারীরা➤ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদন প্রক্রিয়া জেনে নিন➤বিশ্ববাজারে কমেছে তেলের দাম➤গুলশানে গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু: ৯ লাখ টাকায় আপস➤“ঝড়, বিতর্ক ও প্রত্যাবর্তন: কোতোয়ালী পেরিয়ে গুলশানে আবু জায়েদ নাজমুন নূর-একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নের সবচেয়ে শক্ত জবাব -নতুন দায়িত্ব, নতুন আস্থা, নতুন অধ্যায়””➤ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ, বাতিল ১০৩ অনাপত্তি সনদ➤রাষ্ট্রীয় পুলিশ পদকের স্বীকৃতি পাচ্ছেন বাবুল আজাদ কঠিন সময়ে পাহাড়তলী থেকে ডবলমুরিং, চকবাজার হয়ে ডিবিতে; সাহস, মেধা ও পেশাদারিত্বে উজ্জ্বল এক পুলিশ কর্মকর্তার পথচলা-➤জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপণ্যের বাজারে বড় প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী

― Advertisement ―

চট্টগ্রামের স্বার্থে একজন চেয়ারম্যানকে কাজ করতে দিন | নগর পরিকল্পনার কঠিন পথে বাধা নয়, চাই সত্য, প্রমাণ ও আইনের শাসন

মো. কামাল উদ্দিন:চট্টগ্রামকে ভালোবাসি বললেই চট্টগ্রামের জন্য কাজ করা হয় না। চট্টগ্রামের জন্য কাজ করতে হলে অনেক সময় জনপ্রিয়তার পথ ছেড়ে কঠিন সিদ্ধান্তের পথে...

হলুদ সাংবাদিকতা কোনো ভুয়া সাংবাদিকতার নাম নয়—একটি বিকৃত উপস্থাপনার ইতিহাস, ভুল বোঝাবুঝির সংস্কৃতি এবং সাংবাদিকতার দায় ও বাস্তবতা”

Homeসম্পাদকীয়হলুদ সাংবাদিকতা কোনো ভুয়া সাংবাদিকতার নাম নয়—একটি বিকৃত উপস্থাপনার ইতিহাস, ভুল বোঝাবুঝির...

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
গণমাধ্যমের জগতে “হলুদ সাংবাদিকতা” শব্দটি আজ প্রায় নিন্দাসূচক এক তীক্ষ্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কারও লেখা, সংবাদ বা বিশ্লেষণ কারও পছন্দ না হলেই অনেক সময় সহজভাবে তাকে “হলুদ সাংবাদিক” বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—হলুদ সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তির পেশাগত পরিচয়ের নাম নয়, এটি কোনো “ভুয়া সাংবাদিকতার” সার্টিফিকেটও নয়। বরং এটি সাংবাদিকতার ভেতরে একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা, উপস্থাপনার বিকৃতি এবং বাণিজ্যিক চাপে সৃষ্ট এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
হলুদ সাংবাদিকতা কী—ভুল ধারণার বাইরে একটি সংজ্ঞা হলুদ সাংবাদিকতা বলতে বোঝায় এমন একটি সংবাদ পরিবেশনার ধারা, যেখানে তথ্যের চেয়ে চমক, সত্যের চেয়ে অতিরঞ্জন, এবং দায়িত্বের চেয়ে বাণিজ্যিক আকর্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে সংবাদ সত্য হতে পারে, আবার আংশিক সত্য বা অতিরঞ্জিতও হতে পারে। মূল সমস্যা হলো উপস্থাপনার ধরনে—যা পাঠকের অনুভূতি, রাগ, ভয় বা কৌতূহলকে উসকে দেয়। অর্থাৎ, হলুদ সাংবাদিকতা মানে “ভুয়া সাংবাদিকতা” নয়, বরং “বিকৃত বা পক্ষপাতদুষ্ট উপস্থাপনা”। এটি সাংবাদিকতার ভেতরের একটি নৈতিক বিচ্যুতি, কোনো আলাদা পেশা নয়। ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা: কীভাবে জন্ম নেয় এই ধারণা উনিশ শতকের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদপত্র শিল্পে এক ভয়াবহ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই সময় দুটি বড় সংবাদ সাম্রাজ্য ছিল—জোসেফ পুলিৎজারের “New York World” এবং উইলিয়াম র‍্যান্ডলফ হার্স্টের “New York Journal”। এই প্রতিযোগিতায় পাঠক টানার জন্য শুরু হয় চমকপ্রদ শিরোনাম, আবেগঘন গল্প, নাটকীয় উপস্থাপনা এবং অনেক ক্ষেত্রে অর্ধসত্য তথ্য প্রকাশ। সংবাদ হয়ে ওঠে একধরনের “বাণিজ্যিক পণ্য”, আর পাঠক হয়ে ওঠে “ভোক্তা”।
এই সময় জনপ্রিয় একটি কার্টুন চরিত্র “Yellow Kid” দুই সংবাদপত্রেই ব্যবহৃত হতে থাকে। এই চরিত্রের নাম থেকেই পরবর্তীতে “Yellow Journalism” বা “হলুদ সাংবাদিকতা” শব্দটির জন্ম হয়। তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই দুই ব্যক্তিই পরবর্তীতে আধুনিক সাংবাদিকতার উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে পুলিৎজারের নামেই আজ বিশ্বখ্যাত “Pulitzer Prize” সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ সম্মাননা হিসেবে বিবেচিত। হলুদ সাংবাদিকতা কেন তৈরি হয়? হলুদ সাংবাদিকতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি কয়েকটি বাস্তব চাপে তৈরি হয়—১. বাণিজ্যিক চাপ:
সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে টিকে থাকতে হলে পাঠক ও বিজ্ঞাপন দরকার। এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় চটকদার সংবাদ তৈরিতে উৎসাহ দেয়।
২. প্রতিযোগিতা:
একটি সংবাদ আগে প্রকাশ করার প্রতিযোগিতায় অনেক সময় যাচাই-বাছাই উপেক্ষিত হয়।
৩. পাঠকের চাহিদা:
অনেক পাঠকই চমকপ্রদ, আবেগময় বা নাটকীয় সংবাদে বেশি আকৃষ্ট হন।
৪. ডিজিটাল যুগের প্রভাব:
বর্তমানে ক্লিক, ভিউ ও শেয়ারের প্রতিযোগিতা অনেক সময় সংবাদকে “চমকনির্ভর” করে তোলে।
হলুদ সাংবাদিকতা বনাম ভুয়া সাংবাদিকতা—একটি পরিষ্কার পার্থক্য
এখানে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো—হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভুয়া সাংবাদিকতা।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—
ভুয়া সাংবাদিকতা: সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য তৈরি করে সংবাদ হিসেবে প্রচার করা
হলুদ সাংবাদিকতা: সত্য বা আংশিক সত্যকে চটকদার ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা
অর্থাৎ, হলুদ সাংবাদিকতা অনেক সময় সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু উপস্থাপনার ভঙ্গি তাকে বিকৃত করে তোলে। তাই এটিকে “ভুয়া সাংবাদিকতা” বলা সবসময় সঠিক নয়।
“হলুদ সাংবাদিক” শব্দের অপব্যবহার
বর্তমান সময়ে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যায়—যে কেউ সমালোচনামূলক সংবাদ লিখলেই তাকে “হলুদ সাংবাদিক” বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়।
এটি তিনটি সমস্যার জন্ম দেয়—
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়
সত্য অনুসন্ধানকে ভয় দেখানো হয়
দায়িত্বশীল সমালোচনাও সন্দেহের চোখে দেখা হয়
কিন্তু সাংবাদিকতা কখনোই একমুখী প্রশংসার জায়গা নয়। এটি প্রশ্ন করার, অনুসন্ধানের এবং সত্য তুলে ধরার একটি পেশা।
তাই অজ্ঞতা বা বিরোধিতার কারণে কাউকে “হলুদ সাংবাদিক” বলা অনেক সময় অন্যায় ব্যাখ্যার জন্ম দেয়।
হলুদ সাংবাদিকতা কি সব সাংবাদিকের সক্ষমতা?
না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হলুদ সাংবাদিকতা করার জন্য শুধু লিখতে জানলেই হয় না। এর জন্য প্রয়োজন—
পাঠকের মনস্তত্ত্ব বোঝা
শিরোনাম তৈরির দক্ষতা
আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও উত্তেজনা তৈরি করার কৌশল
বাজার ও মিডিয়া কাঠামোর গভীর ধারণা
অর্থাৎ, সবাই ইচ্ছা করলেই হলুদ সাংবাদিকতা করতে পারে না। এটি একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত সাংবাদিকতার ধারা।
আধুনিক যুগে হলুদ সাংবাদিকতার রূপ
আজকের ডিজিটাল যুগে হলুদ সাংবাদিকতা আরও সূক্ষ্ম ও পরিবর্তিত রূপ নিয়েছে—
ক্লিকবেইট শিরোনাম
ভিডিওর ভুল কনটেক্সট
সোশ্যাল মিডিয়ায় অর্ধসত্য তথ্য
ভাইরাল কনটেন্টের জন্য অতিরঞ্জন
এই নতুন রূপ অনেক সময় সরাসরি মিথ্যা না হলেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অবস্থান
দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা সবসময়—
তথ্য যাচাই করে
নিরপেক্ষতা বজায় রাখে
সমাজের কল্যাণে কাজ করে
আবেগ নয়, সত্যকে প্রাধান্য দেয়
এই সাংবাদিকতাই একটি সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
একটি গভীর বাস্তবতা: সাংবাদিকতার প্রতি অবিচার
আজ অনেক সময় দেখা যায়, কেউ কোনো সংবাদ পছন্দ না করলে সেটিকে সহজে “হলুদ সাংবাদিকতা” বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এটি সাংবাদিকতার জন্য এক ধরনের সামাজিক অবিচার।
কারণ—
সমালোচনা আর অপমান এক জিনিস নয়
ভুল আর ভিন্নমত এক জিনিস নয়
বিশ্লেষণ আর আক্রমণ এক জিনিস নয়
উপসংহার: একটি ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন
হলুদ সাংবাদিকতা সাংবাদিকতার একটি বাস্তব অংশ, কিন্তু এটি পুরো সাংবাদিকতার প্রতিচ্ছবি নয়। এটিকে বুঝতে হলে আবেগ নয়, প্রয়োজন বিশ্লেষণ।
সব সাংবাদিক হলুদ সাংবাদিক নয়, আবার সব ভুল সংবাদও হলুদ সাংবাদিকতা নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট উপস্থাপনার ধারা—যার ইতিহাস আছে, বাস্তবতা আছে, কিন্তু সীমারেখাও আছে।
সাংবাদিকতাকে রক্ষা করতে হলে আমাদের দরকার—
সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা
তথ্যের প্রতি সততা
এবং মতের প্রতি সহনশীলতা
সবশেষে বলা যায়—সাংবাদিকতা কোনো দোষারোপের খেলা নয়, এটি সত্যের অনুসন্ধান। আর “হলুদ সাংবাদিকতা” সেই অনুসন্ধানের ভেতরে জন্ম নেওয়া একটি বিকৃতি মাত্র, কোনো ব্যক্তির পরিচয় নয়।